সিলেট ০৫:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
News Title :
‎সিলেটে তরুণদের ফাঁদে ফেলে অশ্লীল ভিডিও ধারণ ও ব্ল্যাকমেইল করে চাঁদা আদায়ের সিলেটে পৈত্রিক সম্পত্তির জেরে ভাইকে হত্যার একমাত্র আসামি শরীয়তপুর থেকে গ্রেফতার টাঙ্গাইলের‎ ভূঞাপুর থানার বিশেষ অভিযানে ডাকাত দলের ৪ সদস্য গ্রেফতার ‎অধ্যাপক মো. ইকরামুল ওয়াদুদকে নদ-নদী ও পরিবেশ রক্ষায় অবদানের জন্য সম্মাননা প্রদান করেছে বাপা ‎মৌলভীবাজারে ২০ বছর পর ডাকাতি মামলার রায়: ১৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ‎মৌলভীবাজারে পুলিশ সুপারের পদে রদবদল, নতুন এসপি রিয়াজুল ইসলাম ‎চাঁনপুরে স্পার্ক ইউথ ফর চেঞ্জ-এর উদ্যোগে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ক্যাম্প অনুষ্ঠিত খেলাধুলা মানুষের মননশীল চিন্তার বিকাশ করে -এমপি লুনা‎ পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে টাঙ্গাইলে পুনর্মিলনীআইজিপর উপহার সামগ্রী বিতরণ‎ ‎পূর্ব শত্রুতার জেরে কিশোর খুন লালমনিরহাট থেকে ৪ আসামি গ্রেফতার

মদিনা থেকে মক্কা: ইমান ও প্রশান্তির পথে যাত্রা

আব্দুল হক মামুন ।

পবিত্র কাবা ঘরের সামনে হাজীগণ

পবিত্র মদিনা শরীফে অবস্থান শেষে আমরা সবাই আল্লাহ্‌র ঘর পবিত্র মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করার প্রস্তুতি নিই।
মসজিদে নববীতে দুপুরের নামাজ আদায় করে, খেয়ে মালপত্র গুছিয়ে ঠিক দুপুর ২টার পর আমাদের বাস আল্লাহর প্রিয় নগরী মক্কার দিকে যাত্রা শুরু করে। সৌদি আরবের বাসগুলো সত্যিই খুব আরামদায়ক। প্রতিটি গাড়িই মার্সিডিজ বেঞ্জ—সরাসরি জাপান ও জার্মানি থেকে আমদানিকৃত—যা দীর্ঘ যাত্রার জন্য আদর্শ।

মিকাত ও ইহরামের স্বর্গীয় অনুভূতি

মদিনা থেকে সামান্য এগিয়ে আসার পরই আমাদের ড্রাইভার ‘মিকাত’-এর জন্য বাস থামান। মদিনার পাশে এই মিকাতটি হলো যুল-হুলাইফা, যা আবইয়ারে আলী বা বীরে আলী নামেও পরিচিত। মদিনাবাসী এবং মদিনা হয়ে মক্কায় গমনকারী হজ ও ওমরার যাত্রীদের জন্য এটিই ইহরাম বাঁধার নির্ধারিত স্থান।

মসজিদে ইহরাম বাঁধার জন্য পার্কিং করার পর আমরা অনেকেই গোসল করে ইহরাম বেঁধে পবিত্র ওমরাহ করার নিয়ত করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করি। ইহরাম বাঁধার সময় আমার মনে এক অন্যরকম অনুভূতি হয়। জীবনে প্রথম সাদা কাপড়ে পবিত্র অবস্থায় পবিত্র মক্কা শরীফে রওয়ানা করব। আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা শরিফ তওয়াফ করব। মনে মনে এক স্বর্গীয় সুখ ও চরম প্রশান্তি অনুভব করি।

তাকবীরের ধ্বনি ও মক্কার পথে দৃশ্য

আমাদের সাথীরা ।

মিকাত থেকে নফল নামাজ পড়ে গাড়ীর দিকে রওয়ানা হয়ে সবাই নিজ নিজ আসনে বসি। তখন স্থানীয় সময় প্রায় ৪টা। গাড়িতে শুরু হলো আমাদের সম্মিলিত তাকবির—”লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক…” এই মধুর ধ্বনি আমাদের সবার পবিত্র জবান থেকে উচ্চারিত হতে থাকে এবং আমরা সম্মিলিতভাবে পুরো রাস্তা তাকবির দিয়ে আসি।
সন্ধ্যা হওয়ার আগ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য খেজুরের বাগান এবং উট চলতে দেখি। সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত সবকিছু দৃশ্যমান ছিল।
রাস্তার দুই পাশে ছোট ছোট বাড়িগুলো চোখে পড়লো, যেগুলো তেমন উচ্চ ভবন নয়, একতলা বা মাটির ঘরের মতো। খবর নিয়ে জানলাম, এগুলোতে মদিনার আদিবাসীগণ বসবাস করেন। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) মদিনায় যেভাবে সাধারণ জীবন যাপন করতেন, এই অধিবাসীরা এখনও নাকি নবীজীর পথ অনুসরণ করে সাদামাটা জীবন যাপন করে থাকেন।
মক্কা বা মদিনা শহরে চোখ ধাঁধানো অট্টালিকা উঠলেও নবীপ্রেমিকেরা সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে আছেন।

৬০০ কিলোমিটারের আরামদায়ক জার্নি
আমাদের বাস হাওয়ার বেগে ছুটছিল। গাড়ির গতি আন্দাজ করতে না পারলেও লিটন বস জানালেন, বাস ১০০ কিলোমিটার বা তার চেয়েও বেশি গতিতে ছুটে চলছে। ওয়ানওয়ে রাস্তা হওয়ায় গতি সহজে বোঝা যায় না, শুধু স্পীড ব্রেকারে হালকা ঝাঁকুনি অনুভূত হয়।
মদিনা থেকে মক্কার দূরত্ব প্রায় ৬০০ কিলোমিটার। মুয়াল্লিম জানিয়েছিলেন, রাস্তায় দুইবার বাস বিরতি দিবে। বিলাসবহুল মার্সিডিজ বাসের আরামদায়ক জার্নিতে ক্লান্তি আসার সুযোগ কম ছিল। প্রতিটি বাসে টয়লেটও ছিল। আমরা তাকবির দিচ্ছিলাম, পাশাপাশি হালকা খোশগল্পও চলছিল।
সন্ধ্যার পর বাইরের দৃশ্য আর তেমন দেখা যায়নি। যতটুকু গাড়ির হেডলাইটের আলোয় দেখা যায়, ততটুকুই দেখলাম। আমরা মাগরিবের নামাজ বাসে আদায় করে নিলাম।

পানির চেয়ে কম দামে তেল! ⛽

সৌদি আরবে একটি কথার প্রচলন আছে—পানির দামে তেল বিক্রি হয়। এর প্রমাণ নিজ চোখেই পেলাম। তেল নেওয়ার জন্য বাস বিরতি দিলে দেখলাম, তাদের তেলের পাম্পগুলো বিশাল জায়গাজুড়ে তৈরি। গাড়িতে তেল নেওয়ার সময় মিটারে দেখলাম, প্রতি লিটার তেলের দাম মাত্র ১.৬৬ পয়সা! অথচ মদিনায় আমরা ৫০০ মিলি পানির দাম দিয়েছিলাম ১ রিয়াল। এতে বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, সৌদি আরবে সত্যিই পানির চেয়ে তেলের দাম কম।

মক্কা পৌঁছানো ও হোটেল নিয়ে বিড়ম্বনা


আমাদের গাড়ী চলতে লাগলো। তাকবিরের পাশাপাশি অনেকেই ঘুমিয়ে নিচ্ছিলেন। প্রায় রাত ১১টার মধ্যে আমাদের বাস পবিত্র নগরী মক্কার হোটেলের সামনে এসে থামলো।
ব্যাগপত্র নামানোর সময় কিছু লোক ট্রলি নিয়ে এগিয়ে আসে। পরে বুঝলাম, এরা ভাড়ায় মাল হোটেলে তুলে দেয়। লোকগুলো ছিল বাঙালি। তারা মাল তুলতে ২০০ রিয়াল চাইলো, যা শুনে আমরা সরাসরি না করে দিলাম। আমরা নিজেরাই হাতে হাতে মালপত্র হোটেলের রিসিপশনের সামনে রাখলাম।
কিন্তু হোটেলে পৌঁছেই একরাশ হতাশা। ট্রাভেলস এজেন্সি ‘৩ তারকা মানের হোটেল’-এর কথা বললেও হোটেল দেখে মনে হলো এটি খুবই সাধারণ মানের, যা আমাদের সিলেটের লাল বাজারের আল মিনার বা আল ফয়েজ মানের হোটেলের চেয়েও নিম্নমানের। ৫ ও ৬ তলায় রুমে প্রবেশ করে সবার রাগ উঠে গেল। ২ জনের রুমে ৪টি সিট বসানো।এসিগুলো ছিল মান্ধাতার আমলের। কোনো কোনো রুমে ৫টা খাট ছিল—মনে হলো যেন আমরা কোথাও ফ্রি থাকতে এসেছি!
দলনেতা লিটন বস হোটেলের রুম দেখে প্রচণ্ড রাগান্বিত হয়ে মুয়াল্লিমকে নানান কথা শোনালেন। পরবর্তীতে অনেকের অনুরোধে চরম কষ্ট স্বীকার করে এই হোটেলেই থাকতে বাধ্য হলাম।
ট্রাভেল এজেন্সির কথার সাথে কাজের কোনো মিল পেলাম না। এটি ছিল মক্কার নিম্নমানের হোটেল, যেখানে আমাদের মতো আরও অনেক হাজীসাব প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

কাবা শরিফ তওয়াফের শিহরণ 🕋

পবিত্র কাবা শরীফের সামনে লেখক।

হোটেলে পর্ব শেষ করতে প্রায় ১টা বেজে যায়। মুয়াল্লিম বারবার বলছিলেন, রাত ১টার পর হেরেম শরীফের নিচে তওয়াফ করতে নাও দিতে পারে, কারণ রাতে মানুষ বেশি হয় এবং তখন দ্বিতীয় তলায় উপর দিয়ে তওয়াফ করতে হয়, যা সময় ও কষ্টের।
রাত প্রায় ২টার দিকে আমরা হোটেল থেকে হেরেম শরীফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম। মুয়াল্লিম সাহেব যেতে যেতে ওমরাহর নিয়ম কানুন বলে দিচ্ছিলেন এবং সবাইকে একসাথে থাকার জন্য বলছিলেন।
তিনি ছাতা হাতে নিয়ে হাঁটছিলেন এবং বলেছিলেন, ভিড়ের মাঝে তিনি ছাতা উঁচিয়ে রাখবেন, যাতে সবাই তাঁকে অনুসরণ করতে পারে।
প্রায় ১৫ মিনিট হেঁটে হেঁটে পবিত্র কাবা ঘরের দিকে এগিয়ে যাই।
ইহরাম বাঁধা যাদের আছে, তারা মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করতে পারে—ইহরাম ছাড়া কেউই এই গেটে প্রবেশ করতে পারে না। আমরা মেইন গেটে প্রবেশ করলাম, আবারও তাকবীর: “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…”।
মসজিদে প্রবেশের সাথে সাথে সামনের দিকে তাকিয়ে যখন পবিত্র কাবা আল্লাহর ঘর দেখা গেল, তখন মনের ভেতরের শিথিলতা অনুভব করলাম। চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে লাগলো। কান্না কোনো রকমেই সংবরণ করতে পারছিলাম না। সাথে সাথে আল্লাহর পাক দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া আদায় করে নিলাম। শ্রদ্ধেয় লিটন বসের বদৌলতে আমরা ১৩ জন মানুষ আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা শরিফ তওয়াফ ও বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর রওজামুবারক জিয়ারতের সুযোগ পেয়েছি।

ওমরাহ পালন ও পরামর্শ

আমরা মুয়াল্লিম সাহেবের নির্দেশে তওয়াফ শুরু করলাম। তখন রাত প্রায় ৩টা/৪টা। মানুষ আর মানুষ। বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে মানুষজন এসেছেন। ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার হাজীগণ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিলেন, কারণ ইন্দোনেশিয়া সরকার তাদের দেশের লোকজনের ৫০ ভাগ খরচ রাষ্ট্রীয়ভাবে বহন করে।
আমরা সবাই একসাথে তওয়াফ শেষ করে মুয়াল্লিম সাহেবের কথামতো দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলাম।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ: কম বয়সে ওমরাহ ও হজ
কাবা শরিফে যে পরিমাণ মানুষ তওয়াফ করেন, তা হিসাব করা খুব কষ্টসাধ্য। আমাদের দেশের মানুষ বয়স্ক সময়ে হজ বা ওমরাহ করতে যান, অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষ শিশুসহ কম বয়সে এখানে আসেন।
হজ বা ওমরাহ করতে অনেক পরিশ্রম হয়ে থাকে। শক্তি সামর্থ্য নিয়ে তা পালন করতে হয়। কাবা তওয়াফ করার সময় যে পরিমাণ ধাক্কাধাক্কি হয়, তাতে এক ধাক্কায় ১০/২০ হাত দূরে চলে যাওয়া লাগে।
আমাদের মতো এই বয়সের লোকজন এই ধাক্কায় টিকে থাকা খুবই কষ্টসাধ্য হয়েছিল।
ওমরাহতে তওয়াফের পাশাপাশি সাফা-মারওয়া পর্যন্ত আসা যাওয়ার করতে হয়। তাই আমার পরামর্শ হলো, নিয়ত থাকলে কম বয়সে হজ বা ওমরাহ পালন করা খুবই ভালো। হজের আনুষ্ঠানিকতা অনেক বেশি, অনেক শ্রম ও সময় লাগে। হেরেম শরীফ থেকে আরাফাতের ময়দানে মিনাতে অবস্থান, শয়তান কে পাথর মারা, কোরবানি করা সহ নানান কাজ থাকে। তাই কম বয়সে হজ বা ওমরাহর পালন করা উচিৎ।
আল্লাহর কাছে চান, তিনি যেন সবাইকে হজ এবং ওমরাহ করার তাওফিক দান করেন। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে রাখি, এই গরমে পায়ের গোরালী ফেটে যায়, মোজা সাথে নিবেন, ওলিভ ওয়েল বা ভ্যাজেলিন সাথে রাখবেন। ছাতা নিবেন নীল বা বাদামি। সাদা ছাতা নিবেন না। আগেই বলেছিলাম মক্কা মদিনার পানি কিনে খাবার প্রয়োজন পরে না। মসজিদে ভেতরে ২৪ ঘন্টা জমজমের পানি মজুদ থাকে। ছোট বোতলে সাথে আনা যায়। বাহিরে লাইন থেকে বড় বোতলে জমজম পানি আনা যায়।
হেরেম শরীফে যাওয়ার সয়ম রাস্তার পাশে দাড়িয়ে ফি পানি বিলিয়ে দিচ্ছে কর্মীরা। মসজিদে আসার যাওয়ার সময় এখান থেকে ইচ্ছে মাফিক পানির বোতল নেয়া যায়। তাই পানি কেনার কোন প্রয়োজন নেই।

হোটেলে প্রত্যাবর্তন ও খাবারের ব্যবস্থা

পবিত্র ওমরাহ পালন শেষে ফজরের নামাজ পড়ে এসে হোটেলে পৌঁছে নাস্তা শেষে হালকা ঘুম দিলাম। যদিও হোটেলের রুমগুলো ছোট, তারপরও বিকল্প ব্যবস্থা ছিল না।
আমাদের দলনেতা লিটন বস খাবারের খুব ভালো ব্যবস্থা করেছিলেন। আমাদের একজন বাঙালি ভাই বাসা থেকে খাবার রান্না করে তিন বেলা হোটেলে পৌঁছে দিত। এটি আমাদের জন্য খুব ভালো সুবিধা হয়েছিল।
প্রতিদিন তিন বেলা ২০ রিয়ালে ভালো মানের ঘরোয়া খাবার পাওয়া যেতো। এতে খরচ কম হয় এবং ভালো মানের খাবার পাওয়া যায়। বেশি মানুষের গ্রুপ হলে পার্সেলের ব্যবস্থা করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
আমরা যতদিন ছিলাম, তৃপ্তি সহকারে পার্সেল খাবার খেয়েছিলাম।

জোহরের নামাজ ও বিশ্রাম

সকালের ঘুম ভেঙে গেল যোহরের আজানের আগেই। শরীরে ক্লান্তিতে বিছানা থেকে উঠতে চাইছিল না। বাধ্য হয়ে গোসল করে নামাজে যাবার প্রস্তুতি নিলাম।
মক্কা-মদিনায় জোহরের আজান হয় ১২:১৮ মিনিটে এবং নামাজ ১২:২৫ মিনিটে শুরু হয়।
আমরা জোহরের নামাজ হেরেম শরীফের মসজিদে পড়লাম। আগে আগে মসজিদে না গেলে ভেতরে গেলেও উপরে গিয়ে নামাজ আদায় করতে হয়।
তবে নামাজের সময় হলে রাস্তা সহ যেকোনো জায়গায় বসে নামাজ আদায় করা যায়।
আমরা সবাই জোহরের নামাজ আদায় করে হোটেলে এসে বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের পার্সেল খাবার খেয়ে নিলাম। 🍽

মক্কায় দিনযাপন ও ইবাদতের প্রশান্তি 🕋

পবিত্র মক্কা নগরীতে এভাবেই আমাদের দিন অতিবাহিত হতে থাকল। হোটেলের কক্ষ থেকে মসজিদুল হারাম পর্যন্ত আমাদের নিত্যদিনের আনাগোনা।
সময়-সুযোগ পেলে হালকা কেনাকাটার দিকেও নজর দেওয়া হলো। তবে একটি বিষয় মনে রাখা ভালো, এবং এটা একটি পরামর্শও বটে—সৌদি আরবে জিনিসের মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি। যদিও তাদের নিজস্ব মুদ্রায় (রিয়াল) দাম কম মনে হতে পারে, কিন্তু আমাদের বাংলাদেশি টাকায় কনভার্ট করলে তা অনেক বেশি হয়ে যায় (১ রিয়াল প্রায় ৩৩ টাকার সমান)। তাই অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা না করাই শ্রেয়। (তবে আমি হালকা গরীব মানুষ তো, তাই হামছা-আশারা রিয়ালের মধ্যে ছিলাম)।
আমার মদিনা পর্বে যেমনটা বলেছিলাম, মদিনা থেকে খেজুর কেনা ভালো, আর মক্কা থেকে জায়নামাজ, আতর, তসবিহ বা বোরকা কিনতে পারেন। দামের সামান্য হেরফের থাকলেও অনেকেই মক্কা থেকে কেনাকাটা করেন।

ইবাদতে কাটানো দিন 🤲

আমরা হাতে পাওয়া সময়টুকু অযথা নষ্ট না করে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ইবাদতে কাটিয়েছি। চেষ্টা করেছি সবসময় ওজু অবস্থায় থাকতে।
আমাদের ব্যাগে সবসময় জায়নামাজ থাকত; নামাজের সময় হলে মসজিদে যেতে না পারলে রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে যেতাম। তবে পরামর্শ হলো, ৪০/৪২ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাস্তা আগুনের মতো গরম হয়ে থাকে, তাই জায়নামাজ ছাড়া রাস্তায় দাঁড়ানো খুবই কষ্টসাধ্য।
সবার প্রতি অনুরোধ, যাঁরা পবিত্র ভূমি যাবেন, তাঁরা সময় নষ্ট না করে ইবাদতে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করবেন। আল্লাহ সবাইকে পবিত্র মক্কা-মদিনা যাওয়ার তৌফিক দিন, আমিন।
আমরা তাহাজ্জুদ সহ প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাজ মসজিদে আদায় করার চেষ্টা করেছি। মদিনার মতো মক্কাতেও আমল করার ঐকান্তিক চেষ্টা ছিল। জানিনা মহান আল্লাহ কবুল করেছেন কি না।
তবে পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ ধরে আমি চারবার আল্লাহ্‌র দরবারে ওয়াদা করেছি যে, জীবনে আর কোনো অন্যায়-অবিচার করব না, ভুল পথে যাব না। সকল প্রকার গুনাহ থেকে বাঁচতে আল্লাহ্‌র দয়া চেয়েছি।
এভাবে আমাদের দিনগুলো ইবাদত-বন্দেগীর মাঝে অতিবাহিত হতে থাকল।

জেয়ারা পর্ব ও ট্রাভেল এজেন্সির অভিজ্ঞতা 🚌

ইবাদত-বন্দেগীর মাঝে আমাদের ট্রাভেল এজেন্সির সাথে কথা ছিল তারা আমাদের জেয়ারা (দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন) করাবে।
কিন্তু এজেন্সি এখানেও আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। ১৩ জনের জন্য আলাদা গাড়ির কথা বললেও, শেষ পর্যন্ত অন্যান্যদের সাথে মিশিয়ে বড় বাসে চড়ে জেয়ারা করতে হলো।
আমাদের জেয়ারা পর্ব শুরু হলো। মুয়াল্লিম সাহেব সামনে বসে মাইকে দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেলেন।
জাবালে সূর (সাওর পর্বত): যেখানে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং মাকড়সা জাল বুনে তাঁকে আগলে রেখেছিল। এর উচ্চতা অনেক বেশি, পাহাড় বেয়ে উঠতে প্রায় ২ ঘণ্টা সময় লাগে।
জাবালে নূর (হেরা গুহা): নবী করীম (সাঃ) এখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করতেন এবং এখানেই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছিল। এটিও অনেক উঁচুতে অবস্থিত, উঠতে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। আশ্চর্যের বিষয়, তখন হযরত খাদিজা (রাঃ) প্রতিদিন খাবার নিয়ে সেখানে যেতেন—সুবহানাল্লাহ!
আমাদের গাড়ি থেকে এসব জায়গা দেখানো হলো। শুধু আরাফাতের ময়দানে নামানো হয়েছিল।
হজের সময় হাজীরা যেসব স্থানে অবস্থান করেন—যেমন মিনা, মুজদালিফা, শয়তানকে পাথর মারার স্থান, এবং হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর পুত্র ইসমাইল (আঃ)-কে কোরবানি দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই স্থান—সবকিছুই গাড়ি থেকে দেখানো হয়েছে।

আমি মনে করি, এমন পাইকারিভাবে জেয়ারা না দেখাই ভালো। ট্রাভেল এজেন্সির উপর নির্ভর না করে নিজেরা কিছু টাকা বেশি খরচ করে আলাদা গাড়ি ভাড়া করে এসব ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থান পরিদর্শন করা শ্রেয়। কারণ সামান্য সময়ে এসব স্থান ভালোভাবে দেখা সম্ভব হয় না।
জেয়ারা শেষে গাড়ি আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিল। সামান্য সময়ের মধ্যে জেয়ারা শেষ হওয়ায় আমরা মসজিদে গিয়ে যোহরের নামাজ আদায় করে নিলাম।

মক্কা বনাম মদিনা: এক তুলনামূলক চিত্র 🌡

আমাদের ১৪ দিনের প্যাকেজ ছিল, কিন্তু আমরা ১২ দিনের প্যাকেজ নিয়েছিলাম। মদিনায় ৪ দিন থেকে দুপুরে রওয়ানা দেওয়ায় সেটাকে ৫ দিন ধরা যায়। বাকি দিনগুলো পবিত্র মক্কায় কাটালাম।
যদিও মদিনায় সময় কম ছিল, তবুও আমাদের কাছে মক্কা থেকে মদিনা বেশি আরামদায়ক মনে হয়েছে। মদিনা সত্যিই ‘সোনার মদিনা’। সেখানে উত্তপ্ত গরম থাকলেও শরীরে ঘাম হয়নি। অথচ মক্কায় ৩৫/৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় শরীর প্রতিনিয়ত ঘামে ভিজে যেত।
মদিনা: কোলাহল কম, খোলামেলা বেশি, এবং শান্তিময় পরিবেশ।
মক্কা: আমার কাছে কিছুটা ঝামেলাপূর্ণ মনে হয়েছে। হেরেম শরিফের চারপাশে বড় বড় অট্টালিকা, এবং সেগুলোর এসির গরম বাতাসে পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

হকার ও ব্যবসায়ীদের চিত্র

হেরেম শরিফ থেকে বের হলেই রাস্তার দু’পাশে হকারদের আনাগোনা খুব বেশি। এদের মাঝে বাঙালিদের সংখ্যাই বেশি। তারা পুলিশের তাড়া খেয়ে বারবার পালায়—যা বাঙালিদের জন্য খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত। পুলিশ এই কারণে বাঙালিদের ‘মিসকিন’ বলে থাকে। ব্যবসা করতে হলে দোকান নিয়ে করা উচিত। ফুটপাতে এভাবে করলে দেশেরও বদনাম হয়।
এসব হকারের অধিকাংশ চট্টগ্রাম ও তার আশপাশের জেলার মানুষ।
তবে মক্কায় অসংখ্য বাঙালি দোকানদারও আছেন, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সাথে হোটেল-রেস্তোরাঁ, আতর, টুপি ও অন্যান্য ব্যবসা করে আসছেন। এদের অধিকাংশই চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার ব্যবসায়ী।
ঢাকার গুলিস্তানের মতো এখানেও হকাররা হাঁকডাক দিয়ে পণ্য বেচাকেনা করে। ‘২ রিয়াল, ৫ রিয়াল, ১০ রিয়াল’ ডেকে ডেকে মাল বিক্রি হচ্ছে। আমরা মক্কা থেকে টুপি, আতর, তসবিহ,

জায়নামাজসহ নানান সামগ্রী কিনে নিলাম। কনভার্ট করলে আমাদের দেশে এসব জিনিসের দাম সস্তা হলেও, পবিত্র ভূমি থেকে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনের জন্য উপহার আনলে সবাই খুশি হন। আমিও দেশে ফিরে এর প্রমাণ পেয়েছি।
যারা দামি জিনিস কিনতে চান, তাদের জন্য ওয়াচ-টাওয়ারে বড় বড় শপিং মল আছে।
আমরা নামাজে আসা-যাওয়ার পথে জিনিসপত্র কেনার চেষ্টা করেছি। অযথা সময় নষ্ট না করে এই সময়টুকু ইবাদতে কাটানোই শ্রেয়।

তায়েফ সফর ও ওমরাহ পালন 🌳

তায়েফের একটি দৃষ্টিনন্দন মহাসড়ক

মক্কা নগরীতে আমাদের প্রায় আট দিন অতিবাহিত হয়েছিল। এই ফাঁকে আমরা সবাই মিলে সৌদি আরবের আরেক পরিচ্ছন্ন নগরী তায়েফ ঘুরে আসলাম। তায়েফ শহর ভূমি থেকে ৮ হাজার ফিট উপরে অবস্থিত। সেখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত ভালো, সবুজের সমারোহ এবং নিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়। আমাদের বাংলাদেশের মতো আবহাওয়া সেখানে।
তায়েফে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) প্রথমে মক্কার বাইরে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়েছিলেন। সেখানে কাফের-মুশরিকরা তাঁকে অনেক কষ্ট দিয়েছিল, কিন্তু তবুও নবীজী তাদের জন্য বদদোয়া করেননি।
তায়েফ বর্তমানে সৌদি আরবের মধ্যে খুবই উর্বর এলাকা। তায়েফের আঙুর ও আপেল খুবই সুস্বাদু এবং দামও সস্তা। আমরা ১০ রিয়াল দিয়ে ২ কেজি আঙুর কিনে খেয়েছি। তায়েফের মানুষও খুবই ভালো, নম্র-ভদ্র।
আমরা তায়েফে কথিত ‘বুড়ির বাড়ি’ দেখতে গিয়েছিলাম, যেখানে বুড়ি নবীজীকে কষ্ট দিতেন বলে বলা হয়। তবে আলাপকালে জানতে পারলাম এর কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই, তাই এর কোনো যত্নও নেই—এটি সামান্য পাথর দিয়ে সাজানো একটি ঘরের আকৃতি মাত্র।

তায়েফ শহরে কথিত বুড়ির বাড়ি।


বুড়ির বাড়ির পাশে কাঁটার গাছও দেখতে পেয়েছি। সবমিলিয়ে তায়েফ শহরটি খুবই সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন।
তায়েফ থেকে ফেরার সময় আমরা সেখানকার তায়েফের মিকাত মসজিদ “কারণুল মানাজিল” মিকাত। এটি তায়েফ, রিয়াদ, এবং উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে মক্কায় আগত যাত্রীদের ইহরাম বাঁধার স্থান। এই মিকাতটি মক্কা থেকে প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এটি “সাইলুল কাবীর” নামেও পরিচিত। সেখান থেকে আমরা সবাই গোসল করে ইহরাম পরে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।
এক ঘণ্টার জার্নিতে মক্কায় পৌঁছে, হোটেলে খেয়ে বিকেলে সবাই মিলে নফল ওমরাহ পালন করলাম।
আমরা সবাই মোট তিনবার ওমরাহ করেছি এবং কয়েকবার নফল তাওয়াফও করেছি।

সহজ ইসলাম ও বিদায়ের প্রস্তুতি 😭

পবিত্র মক্কা-মদিনায় গিয়ে আমার জীবনে অনেক কিছু পাল্টে গেছে। অনেক কিছু শেখার আছে, জানার আছে। ইসলাম যে খুবই সহজ, তা এই পবিত্র ভূমিতে গেলে বোঝা যায়। আমরা কিছু মানুষ একে কঠিন করে রেখেছি।
মক্কা-মদিনাতে প্রতি ওয়াক্তে আমরা জানাজার নামাজ আদায় করার পরম সৌভাগ্য লাভ করেছি। এখানে নামাজ শেষে কোনো অতিরিক্ত দোয়া বা কোলাহল নেই।
নামাজ শেষ, যে যার মতো বেরিয়ে যাচ্ছে। আজান হলে আবার সবাই দলে দলে মসজিদে আসছে। আজানের সাথে সাথে দোকানীরা দোকান বন্ধ করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন—যা আমাদের দেশে চোখে পড়ে না।
অনেকেই নামাজ শেষে মসজিদে ভেতরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কেউ কোরআন তেলাওয়াত করছেন, নফল নামাজ আদায় করছেন—এগুলো নিয়ে সবাই ব্যস্ত।
কোনো শব্দ, কোনো আওয়াজ নেই। কত সুন্দর এই ব্যবস্থা! আমার কাছে মনে হলো এটাই সহজ ইসলামের জীবন ব্যবস্থা।
পবিত্র মক্কা নগরীতে আমাদের সময় একেবারে শেষ হয়ে এল। ফিরতি ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। মনে মনে আপসোস থেকেই যাচ্ছে—আর ক’টা দিন থেকে গেলেই ভালো হতো। তবে নিয়ত আছে, ইনশাআল্লাহ আবার যাওয়ার চেষ্টা আছে। আল্লাহর কাছে ওয়াদা করে এসেছি, আগামীতে যতবার যাব পরিবারকে নিয়ে যেন যেতে পারি।
তাই অনুরোধ, সবাই নিয়ত করে ফেলুন। কবুলের মালিক মহান রব। কম বয়সে নিয়ত করুন, বয়স্ক অবস্থায় যাওয়া অনেক পরিশ্রমের।

শেষ যাত্রা

আমাদের সময় একেবারে শেষ। ২২ তারিখ রাতে জেদ্দা থেকে আমাদের ফ্লাইট। আমরা রাতে লাগেজ গুছিয়ে রাখলাম। মুয়াল্লিম বললেন, ৫টার সময় গাড়ি আসবে, তবে হোটেলের চেক-আউট করতে হবে আগেই। আমরা যোহরের নামাজের আগে কিছু লাগেজ নিচে নামিয়ে রাখলাম।


গাড়ি ৫টার পর আসলো। আমরা মালপত্র তুলে জেদ্দা এয়ারপোর্টের দিকে রওয়ানা দিলাম। আমাদের ফ্লাইট সৌদি সময় রাত ১টায়। এয়ারপোর্টে নেমে ট্রলি আনতে গিয়ে ৩ রিয়াল দিতে হলো—যা মদিনায় লাগেনি।
আগে জমজমের পানি বিনামূল্যে আনা যেত, এখন সৌদি সরকার জেদ্দা এয়ারপোর্ট থেকে সাড়ে ১২ রিয়াল দিয়ে ৫ লিটার পানি আনতে দেয়। এর বেশি আনা যায় না। তবে ছোট ছোট বোতলে কয়েক বোতল আনা সম্ভব।
ইমিগ্রেশন শেষে বিমানের অপেক্ষায় থাকলাম। যথাসময়ে বিমানে আসন গ্রহণ করলাম। বিদায় পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা। আল্লাহ যদি কবুল করেন, তবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আবারও আসব।
জেদ্দা থেকে বাংলাদেশ বিমানের ১০ ঘণ্টার দীর্ঘ জার্নি শেষে নিজ ঘরে ফিরলাম।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‎সিলেটে তরুণদের ফাঁদে ফেলে অশ্লীল ভিডিও ধারণ ও ব্ল্যাকমেইল করে চাঁদা আদায়ের

মদিনা থেকে মক্কা: ইমান ও প্রশান্তির পথে যাত্রা

সময় ০৪:৫৭:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫

আব্দুল হক মামুন ।

পবিত্র কাবা ঘরের সামনে হাজীগণ

পবিত্র মদিনা শরীফে অবস্থান শেষে আমরা সবাই আল্লাহ্‌র ঘর পবিত্র মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করার প্রস্তুতি নিই।
মসজিদে নববীতে দুপুরের নামাজ আদায় করে, খেয়ে মালপত্র গুছিয়ে ঠিক দুপুর ২টার পর আমাদের বাস আল্লাহর প্রিয় নগরী মক্কার দিকে যাত্রা শুরু করে। সৌদি আরবের বাসগুলো সত্যিই খুব আরামদায়ক। প্রতিটি গাড়িই মার্সিডিজ বেঞ্জ—সরাসরি জাপান ও জার্মানি থেকে আমদানিকৃত—যা দীর্ঘ যাত্রার জন্য আদর্শ।

মিকাত ও ইহরামের স্বর্গীয় অনুভূতি

মদিনা থেকে সামান্য এগিয়ে আসার পরই আমাদের ড্রাইভার ‘মিকাত’-এর জন্য বাস থামান। মদিনার পাশে এই মিকাতটি হলো যুল-হুলাইফা, যা আবইয়ারে আলী বা বীরে আলী নামেও পরিচিত। মদিনাবাসী এবং মদিনা হয়ে মক্কায় গমনকারী হজ ও ওমরার যাত্রীদের জন্য এটিই ইহরাম বাঁধার নির্ধারিত স্থান।

মসজিদে ইহরাম বাঁধার জন্য পার্কিং করার পর আমরা অনেকেই গোসল করে ইহরাম বেঁধে পবিত্র ওমরাহ করার নিয়ত করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করি। ইহরাম বাঁধার সময় আমার মনে এক অন্যরকম অনুভূতি হয়। জীবনে প্রথম সাদা কাপড়ে পবিত্র অবস্থায় পবিত্র মক্কা শরীফে রওয়ানা করব। আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা শরিফ তওয়াফ করব। মনে মনে এক স্বর্গীয় সুখ ও চরম প্রশান্তি অনুভব করি।

তাকবীরের ধ্বনি ও মক্কার পথে দৃশ্য

আমাদের সাথীরা ।

মিকাত থেকে নফল নামাজ পড়ে গাড়ীর দিকে রওয়ানা হয়ে সবাই নিজ নিজ আসনে বসি। তখন স্থানীয় সময় প্রায় ৪টা। গাড়িতে শুরু হলো আমাদের সম্মিলিত তাকবির—”লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক…” এই মধুর ধ্বনি আমাদের সবার পবিত্র জবান থেকে উচ্চারিত হতে থাকে এবং আমরা সম্মিলিতভাবে পুরো রাস্তা তাকবির দিয়ে আসি।
সন্ধ্যা হওয়ার আগ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য খেজুরের বাগান এবং উট চলতে দেখি। সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত সবকিছু দৃশ্যমান ছিল।
রাস্তার দুই পাশে ছোট ছোট বাড়িগুলো চোখে পড়লো, যেগুলো তেমন উচ্চ ভবন নয়, একতলা বা মাটির ঘরের মতো। খবর নিয়ে জানলাম, এগুলোতে মদিনার আদিবাসীগণ বসবাস করেন। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) মদিনায় যেভাবে সাধারণ জীবন যাপন করতেন, এই অধিবাসীরা এখনও নাকি নবীজীর পথ অনুসরণ করে সাদামাটা জীবন যাপন করে থাকেন।
মক্কা বা মদিনা শহরে চোখ ধাঁধানো অট্টালিকা উঠলেও নবীপ্রেমিকেরা সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে আছেন।

৬০০ কিলোমিটারের আরামদায়ক জার্নি
আমাদের বাস হাওয়ার বেগে ছুটছিল। গাড়ির গতি আন্দাজ করতে না পারলেও লিটন বস জানালেন, বাস ১০০ কিলোমিটার বা তার চেয়েও বেশি গতিতে ছুটে চলছে। ওয়ানওয়ে রাস্তা হওয়ায় গতি সহজে বোঝা যায় না, শুধু স্পীড ব্রেকারে হালকা ঝাঁকুনি অনুভূত হয়।
মদিনা থেকে মক্কার দূরত্ব প্রায় ৬০০ কিলোমিটার। মুয়াল্লিম জানিয়েছিলেন, রাস্তায় দুইবার বাস বিরতি দিবে। বিলাসবহুল মার্সিডিজ বাসের আরামদায়ক জার্নিতে ক্লান্তি আসার সুযোগ কম ছিল। প্রতিটি বাসে টয়লেটও ছিল। আমরা তাকবির দিচ্ছিলাম, পাশাপাশি হালকা খোশগল্পও চলছিল।
সন্ধ্যার পর বাইরের দৃশ্য আর তেমন দেখা যায়নি। যতটুকু গাড়ির হেডলাইটের আলোয় দেখা যায়, ততটুকুই দেখলাম। আমরা মাগরিবের নামাজ বাসে আদায় করে নিলাম।

পানির চেয়ে কম দামে তেল! ⛽

সৌদি আরবে একটি কথার প্রচলন আছে—পানির দামে তেল বিক্রি হয়। এর প্রমাণ নিজ চোখেই পেলাম। তেল নেওয়ার জন্য বাস বিরতি দিলে দেখলাম, তাদের তেলের পাম্পগুলো বিশাল জায়গাজুড়ে তৈরি। গাড়িতে তেল নেওয়ার সময় মিটারে দেখলাম, প্রতি লিটার তেলের দাম মাত্র ১.৬৬ পয়সা! অথচ মদিনায় আমরা ৫০০ মিলি পানির দাম দিয়েছিলাম ১ রিয়াল। এতে বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, সৌদি আরবে সত্যিই পানির চেয়ে তেলের দাম কম।

মক্কা পৌঁছানো ও হোটেল নিয়ে বিড়ম্বনা


আমাদের গাড়ী চলতে লাগলো। তাকবিরের পাশাপাশি অনেকেই ঘুমিয়ে নিচ্ছিলেন। প্রায় রাত ১১টার মধ্যে আমাদের বাস পবিত্র নগরী মক্কার হোটেলের সামনে এসে থামলো।
ব্যাগপত্র নামানোর সময় কিছু লোক ট্রলি নিয়ে এগিয়ে আসে। পরে বুঝলাম, এরা ভাড়ায় মাল হোটেলে তুলে দেয়। লোকগুলো ছিল বাঙালি। তারা মাল তুলতে ২০০ রিয়াল চাইলো, যা শুনে আমরা সরাসরি না করে দিলাম। আমরা নিজেরাই হাতে হাতে মালপত্র হোটেলের রিসিপশনের সামনে রাখলাম।
কিন্তু হোটেলে পৌঁছেই একরাশ হতাশা। ট্রাভেলস এজেন্সি ‘৩ তারকা মানের হোটেল’-এর কথা বললেও হোটেল দেখে মনে হলো এটি খুবই সাধারণ মানের, যা আমাদের সিলেটের লাল বাজারের আল মিনার বা আল ফয়েজ মানের হোটেলের চেয়েও নিম্নমানের। ৫ ও ৬ তলায় রুমে প্রবেশ করে সবার রাগ উঠে গেল। ২ জনের রুমে ৪টি সিট বসানো।এসিগুলো ছিল মান্ধাতার আমলের। কোনো কোনো রুমে ৫টা খাট ছিল—মনে হলো যেন আমরা কোথাও ফ্রি থাকতে এসেছি!
দলনেতা লিটন বস হোটেলের রুম দেখে প্রচণ্ড রাগান্বিত হয়ে মুয়াল্লিমকে নানান কথা শোনালেন। পরবর্তীতে অনেকের অনুরোধে চরম কষ্ট স্বীকার করে এই হোটেলেই থাকতে বাধ্য হলাম।
ট্রাভেল এজেন্সির কথার সাথে কাজের কোনো মিল পেলাম না। এটি ছিল মক্কার নিম্নমানের হোটেল, যেখানে আমাদের মতো আরও অনেক হাজীসাব প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

কাবা শরিফ তওয়াফের শিহরণ 🕋

পবিত্র কাবা শরীফের সামনে লেখক।

হোটেলে পর্ব শেষ করতে প্রায় ১টা বেজে যায়। মুয়াল্লিম বারবার বলছিলেন, রাত ১টার পর হেরেম শরীফের নিচে তওয়াফ করতে নাও দিতে পারে, কারণ রাতে মানুষ বেশি হয় এবং তখন দ্বিতীয় তলায় উপর দিয়ে তওয়াফ করতে হয়, যা সময় ও কষ্টের।
রাত প্রায় ২টার দিকে আমরা হোটেল থেকে হেরেম শরীফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম। মুয়াল্লিম সাহেব যেতে যেতে ওমরাহর নিয়ম কানুন বলে দিচ্ছিলেন এবং সবাইকে একসাথে থাকার জন্য বলছিলেন।
তিনি ছাতা হাতে নিয়ে হাঁটছিলেন এবং বলেছিলেন, ভিড়ের মাঝে তিনি ছাতা উঁচিয়ে রাখবেন, যাতে সবাই তাঁকে অনুসরণ করতে পারে।
প্রায় ১৫ মিনিট হেঁটে হেঁটে পবিত্র কাবা ঘরের দিকে এগিয়ে যাই।
ইহরাম বাঁধা যাদের আছে, তারা মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করতে পারে—ইহরাম ছাড়া কেউই এই গেটে প্রবেশ করতে পারে না। আমরা মেইন গেটে প্রবেশ করলাম, আবারও তাকবীর: “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…”।
মসজিদে প্রবেশের সাথে সাথে সামনের দিকে তাকিয়ে যখন পবিত্র কাবা আল্লাহর ঘর দেখা গেল, তখন মনের ভেতরের শিথিলতা অনুভব করলাম। চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে লাগলো। কান্না কোনো রকমেই সংবরণ করতে পারছিলাম না। সাথে সাথে আল্লাহর পাক দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া আদায় করে নিলাম। শ্রদ্ধেয় লিটন বসের বদৌলতে আমরা ১৩ জন মানুষ আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা শরিফ তওয়াফ ও বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর রওজামুবারক জিয়ারতের সুযোগ পেয়েছি।

ওমরাহ পালন ও পরামর্শ

আমরা মুয়াল্লিম সাহেবের নির্দেশে তওয়াফ শুরু করলাম। তখন রাত প্রায় ৩টা/৪টা। মানুষ আর মানুষ। বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে মানুষজন এসেছেন। ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার হাজীগণ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিলেন, কারণ ইন্দোনেশিয়া সরকার তাদের দেশের লোকজনের ৫০ ভাগ খরচ রাষ্ট্রীয়ভাবে বহন করে।
আমরা সবাই একসাথে তওয়াফ শেষ করে মুয়াল্লিম সাহেবের কথামতো দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলাম।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ: কম বয়সে ওমরাহ ও হজ
কাবা শরিফে যে পরিমাণ মানুষ তওয়াফ করেন, তা হিসাব করা খুব কষ্টসাধ্য। আমাদের দেশের মানুষ বয়স্ক সময়ে হজ বা ওমরাহ করতে যান, অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষ শিশুসহ কম বয়সে এখানে আসেন।
হজ বা ওমরাহ করতে অনেক পরিশ্রম হয়ে থাকে। শক্তি সামর্থ্য নিয়ে তা পালন করতে হয়। কাবা তওয়াফ করার সময় যে পরিমাণ ধাক্কাধাক্কি হয়, তাতে এক ধাক্কায় ১০/২০ হাত দূরে চলে যাওয়া লাগে।
আমাদের মতো এই বয়সের লোকজন এই ধাক্কায় টিকে থাকা খুবই কষ্টসাধ্য হয়েছিল।
ওমরাহতে তওয়াফের পাশাপাশি সাফা-মারওয়া পর্যন্ত আসা যাওয়ার করতে হয়। তাই আমার পরামর্শ হলো, নিয়ত থাকলে কম বয়সে হজ বা ওমরাহ পালন করা খুবই ভালো। হজের আনুষ্ঠানিকতা অনেক বেশি, অনেক শ্রম ও সময় লাগে। হেরেম শরীফ থেকে আরাফাতের ময়দানে মিনাতে অবস্থান, শয়তান কে পাথর মারা, কোরবানি করা সহ নানান কাজ থাকে। তাই কম বয়সে হজ বা ওমরাহর পালন করা উচিৎ।
আল্লাহর কাছে চান, তিনি যেন সবাইকে হজ এবং ওমরাহ করার তাওফিক দান করেন। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে রাখি, এই গরমে পায়ের গোরালী ফেটে যায়, মোজা সাথে নিবেন, ওলিভ ওয়েল বা ভ্যাজেলিন সাথে রাখবেন। ছাতা নিবেন নীল বা বাদামি। সাদা ছাতা নিবেন না। আগেই বলেছিলাম মক্কা মদিনার পানি কিনে খাবার প্রয়োজন পরে না। মসজিদে ভেতরে ২৪ ঘন্টা জমজমের পানি মজুদ থাকে। ছোট বোতলে সাথে আনা যায়। বাহিরে লাইন থেকে বড় বোতলে জমজম পানি আনা যায়।
হেরেম শরীফে যাওয়ার সয়ম রাস্তার পাশে দাড়িয়ে ফি পানি বিলিয়ে দিচ্ছে কর্মীরা। মসজিদে আসার যাওয়ার সময় এখান থেকে ইচ্ছে মাফিক পানির বোতল নেয়া যায়। তাই পানি কেনার কোন প্রয়োজন নেই।

হোটেলে প্রত্যাবর্তন ও খাবারের ব্যবস্থা

পবিত্র ওমরাহ পালন শেষে ফজরের নামাজ পড়ে এসে হোটেলে পৌঁছে নাস্তা শেষে হালকা ঘুম দিলাম। যদিও হোটেলের রুমগুলো ছোট, তারপরও বিকল্প ব্যবস্থা ছিল না।
আমাদের দলনেতা লিটন বস খাবারের খুব ভালো ব্যবস্থা করেছিলেন। আমাদের একজন বাঙালি ভাই বাসা থেকে খাবার রান্না করে তিন বেলা হোটেলে পৌঁছে দিত। এটি আমাদের জন্য খুব ভালো সুবিধা হয়েছিল।
প্রতিদিন তিন বেলা ২০ রিয়ালে ভালো মানের ঘরোয়া খাবার পাওয়া যেতো। এতে খরচ কম হয় এবং ভালো মানের খাবার পাওয়া যায়। বেশি মানুষের গ্রুপ হলে পার্সেলের ব্যবস্থা করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
আমরা যতদিন ছিলাম, তৃপ্তি সহকারে পার্সেল খাবার খেয়েছিলাম।

জোহরের নামাজ ও বিশ্রাম

সকালের ঘুম ভেঙে গেল যোহরের আজানের আগেই। শরীরে ক্লান্তিতে বিছানা থেকে উঠতে চাইছিল না। বাধ্য হয়ে গোসল করে নামাজে যাবার প্রস্তুতি নিলাম।
মক্কা-মদিনায় জোহরের আজান হয় ১২:১৮ মিনিটে এবং নামাজ ১২:২৫ মিনিটে শুরু হয়।
আমরা জোহরের নামাজ হেরেম শরীফের মসজিদে পড়লাম। আগে আগে মসজিদে না গেলে ভেতরে গেলেও উপরে গিয়ে নামাজ আদায় করতে হয়।
তবে নামাজের সময় হলে রাস্তা সহ যেকোনো জায়গায় বসে নামাজ আদায় করা যায়।
আমরা সবাই জোহরের নামাজ আদায় করে হোটেলে এসে বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের পার্সেল খাবার খেয়ে নিলাম। 🍽

মক্কায় দিনযাপন ও ইবাদতের প্রশান্তি 🕋

পবিত্র মক্কা নগরীতে এভাবেই আমাদের দিন অতিবাহিত হতে থাকল। হোটেলের কক্ষ থেকে মসজিদুল হারাম পর্যন্ত আমাদের নিত্যদিনের আনাগোনা।
সময়-সুযোগ পেলে হালকা কেনাকাটার দিকেও নজর দেওয়া হলো। তবে একটি বিষয় মনে রাখা ভালো, এবং এটা একটি পরামর্শও বটে—সৌদি আরবে জিনিসের মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি। যদিও তাদের নিজস্ব মুদ্রায় (রিয়াল) দাম কম মনে হতে পারে, কিন্তু আমাদের বাংলাদেশি টাকায় কনভার্ট করলে তা অনেক বেশি হয়ে যায় (১ রিয়াল প্রায় ৩৩ টাকার সমান)। তাই অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা না করাই শ্রেয়। (তবে আমি হালকা গরীব মানুষ তো, তাই হামছা-আশারা রিয়ালের মধ্যে ছিলাম)।
আমার মদিনা পর্বে যেমনটা বলেছিলাম, মদিনা থেকে খেজুর কেনা ভালো, আর মক্কা থেকে জায়নামাজ, আতর, তসবিহ বা বোরকা কিনতে পারেন। দামের সামান্য হেরফের থাকলেও অনেকেই মক্কা থেকে কেনাকাটা করেন।

ইবাদতে কাটানো দিন 🤲

আমরা হাতে পাওয়া সময়টুকু অযথা নষ্ট না করে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ইবাদতে কাটিয়েছি। চেষ্টা করেছি সবসময় ওজু অবস্থায় থাকতে।
আমাদের ব্যাগে সবসময় জায়নামাজ থাকত; নামাজের সময় হলে মসজিদে যেতে না পারলে রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে যেতাম। তবে পরামর্শ হলো, ৪০/৪২ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাস্তা আগুনের মতো গরম হয়ে থাকে, তাই জায়নামাজ ছাড়া রাস্তায় দাঁড়ানো খুবই কষ্টসাধ্য।
সবার প্রতি অনুরোধ, যাঁরা পবিত্র ভূমি যাবেন, তাঁরা সময় নষ্ট না করে ইবাদতে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করবেন। আল্লাহ সবাইকে পবিত্র মক্কা-মদিনা যাওয়ার তৌফিক দিন, আমিন।
আমরা তাহাজ্জুদ সহ প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাজ মসজিদে আদায় করার চেষ্টা করেছি। মদিনার মতো মক্কাতেও আমল করার ঐকান্তিক চেষ্টা ছিল। জানিনা মহান আল্লাহ কবুল করেছেন কি না।
তবে পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ ধরে আমি চারবার আল্লাহ্‌র দরবারে ওয়াদা করেছি যে, জীবনে আর কোনো অন্যায়-অবিচার করব না, ভুল পথে যাব না। সকল প্রকার গুনাহ থেকে বাঁচতে আল্লাহ্‌র দয়া চেয়েছি।
এভাবে আমাদের দিনগুলো ইবাদত-বন্দেগীর মাঝে অতিবাহিত হতে থাকল।

জেয়ারা পর্ব ও ট্রাভেল এজেন্সির অভিজ্ঞতা 🚌

ইবাদত-বন্দেগীর মাঝে আমাদের ট্রাভেল এজেন্সির সাথে কথা ছিল তারা আমাদের জেয়ারা (দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন) করাবে।
কিন্তু এজেন্সি এখানেও আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। ১৩ জনের জন্য আলাদা গাড়ির কথা বললেও, শেষ পর্যন্ত অন্যান্যদের সাথে মিশিয়ে বড় বাসে চড়ে জেয়ারা করতে হলো।
আমাদের জেয়ারা পর্ব শুরু হলো। মুয়াল্লিম সাহেব সামনে বসে মাইকে দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেলেন।
জাবালে সূর (সাওর পর্বত): যেখানে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং মাকড়সা জাল বুনে তাঁকে আগলে রেখেছিল। এর উচ্চতা অনেক বেশি, পাহাড় বেয়ে উঠতে প্রায় ২ ঘণ্টা সময় লাগে।
জাবালে নূর (হেরা গুহা): নবী করীম (সাঃ) এখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করতেন এবং এখানেই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছিল। এটিও অনেক উঁচুতে অবস্থিত, উঠতে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। আশ্চর্যের বিষয়, তখন হযরত খাদিজা (রাঃ) প্রতিদিন খাবার নিয়ে সেখানে যেতেন—সুবহানাল্লাহ!
আমাদের গাড়ি থেকে এসব জায়গা দেখানো হলো। শুধু আরাফাতের ময়দানে নামানো হয়েছিল।
হজের সময় হাজীরা যেসব স্থানে অবস্থান করেন—যেমন মিনা, মুজদালিফা, শয়তানকে পাথর মারার স্থান, এবং হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর পুত্র ইসমাইল (আঃ)-কে কোরবানি দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই স্থান—সবকিছুই গাড়ি থেকে দেখানো হয়েছে।

আমি মনে করি, এমন পাইকারিভাবে জেয়ারা না দেখাই ভালো। ট্রাভেল এজেন্সির উপর নির্ভর না করে নিজেরা কিছু টাকা বেশি খরচ করে আলাদা গাড়ি ভাড়া করে এসব ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থান পরিদর্শন করা শ্রেয়। কারণ সামান্য সময়ে এসব স্থান ভালোভাবে দেখা সম্ভব হয় না।
জেয়ারা শেষে গাড়ি আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিল। সামান্য সময়ের মধ্যে জেয়ারা শেষ হওয়ায় আমরা মসজিদে গিয়ে যোহরের নামাজ আদায় করে নিলাম।

মক্কা বনাম মদিনা: এক তুলনামূলক চিত্র 🌡

আমাদের ১৪ দিনের প্যাকেজ ছিল, কিন্তু আমরা ১২ দিনের প্যাকেজ নিয়েছিলাম। মদিনায় ৪ দিন থেকে দুপুরে রওয়ানা দেওয়ায় সেটাকে ৫ দিন ধরা যায়। বাকি দিনগুলো পবিত্র মক্কায় কাটালাম।
যদিও মদিনায় সময় কম ছিল, তবুও আমাদের কাছে মক্কা থেকে মদিনা বেশি আরামদায়ক মনে হয়েছে। মদিনা সত্যিই ‘সোনার মদিনা’। সেখানে উত্তপ্ত গরম থাকলেও শরীরে ঘাম হয়নি। অথচ মক্কায় ৩৫/৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় শরীর প্রতিনিয়ত ঘামে ভিজে যেত।
মদিনা: কোলাহল কম, খোলামেলা বেশি, এবং শান্তিময় পরিবেশ।
মক্কা: আমার কাছে কিছুটা ঝামেলাপূর্ণ মনে হয়েছে। হেরেম শরিফের চারপাশে বড় বড় অট্টালিকা, এবং সেগুলোর এসির গরম বাতাসে পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

হকার ও ব্যবসায়ীদের চিত্র

হেরেম শরিফ থেকে বের হলেই রাস্তার দু’পাশে হকারদের আনাগোনা খুব বেশি। এদের মাঝে বাঙালিদের সংখ্যাই বেশি। তারা পুলিশের তাড়া খেয়ে বারবার পালায়—যা বাঙালিদের জন্য খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত। পুলিশ এই কারণে বাঙালিদের ‘মিসকিন’ বলে থাকে। ব্যবসা করতে হলে দোকান নিয়ে করা উচিত। ফুটপাতে এভাবে করলে দেশেরও বদনাম হয়।
এসব হকারের অধিকাংশ চট্টগ্রাম ও তার আশপাশের জেলার মানুষ।
তবে মক্কায় অসংখ্য বাঙালি দোকানদারও আছেন, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সাথে হোটেল-রেস্তোরাঁ, আতর, টুপি ও অন্যান্য ব্যবসা করে আসছেন। এদের অধিকাংশই চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার ব্যবসায়ী।
ঢাকার গুলিস্তানের মতো এখানেও হকাররা হাঁকডাক দিয়ে পণ্য বেচাকেনা করে। ‘২ রিয়াল, ৫ রিয়াল, ১০ রিয়াল’ ডেকে ডেকে মাল বিক্রি হচ্ছে। আমরা মক্কা থেকে টুপি, আতর, তসবিহ,

জায়নামাজসহ নানান সামগ্রী কিনে নিলাম। কনভার্ট করলে আমাদের দেশে এসব জিনিসের দাম সস্তা হলেও, পবিত্র ভূমি থেকে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনের জন্য উপহার আনলে সবাই খুশি হন। আমিও দেশে ফিরে এর প্রমাণ পেয়েছি।
যারা দামি জিনিস কিনতে চান, তাদের জন্য ওয়াচ-টাওয়ারে বড় বড় শপিং মল আছে।
আমরা নামাজে আসা-যাওয়ার পথে জিনিসপত্র কেনার চেষ্টা করেছি। অযথা সময় নষ্ট না করে এই সময়টুকু ইবাদতে কাটানোই শ্রেয়।

তায়েফ সফর ও ওমরাহ পালন 🌳

তায়েফের একটি দৃষ্টিনন্দন মহাসড়ক

মক্কা নগরীতে আমাদের প্রায় আট দিন অতিবাহিত হয়েছিল। এই ফাঁকে আমরা সবাই মিলে সৌদি আরবের আরেক পরিচ্ছন্ন নগরী তায়েফ ঘুরে আসলাম। তায়েফ শহর ভূমি থেকে ৮ হাজার ফিট উপরে অবস্থিত। সেখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত ভালো, সবুজের সমারোহ এবং নিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়। আমাদের বাংলাদেশের মতো আবহাওয়া সেখানে।
তায়েফে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) প্রথমে মক্কার বাইরে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়েছিলেন। সেখানে কাফের-মুশরিকরা তাঁকে অনেক কষ্ট দিয়েছিল, কিন্তু তবুও নবীজী তাদের জন্য বদদোয়া করেননি।
তায়েফ বর্তমানে সৌদি আরবের মধ্যে খুবই উর্বর এলাকা। তায়েফের আঙুর ও আপেল খুবই সুস্বাদু এবং দামও সস্তা। আমরা ১০ রিয়াল দিয়ে ২ কেজি আঙুর কিনে খেয়েছি। তায়েফের মানুষও খুবই ভালো, নম্র-ভদ্র।
আমরা তায়েফে কথিত ‘বুড়ির বাড়ি’ দেখতে গিয়েছিলাম, যেখানে বুড়ি নবীজীকে কষ্ট দিতেন বলে বলা হয়। তবে আলাপকালে জানতে পারলাম এর কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই, তাই এর কোনো যত্নও নেই—এটি সামান্য পাথর দিয়ে সাজানো একটি ঘরের আকৃতি মাত্র।

তায়েফ শহরে কথিত বুড়ির বাড়ি।


বুড়ির বাড়ির পাশে কাঁটার গাছও দেখতে পেয়েছি। সবমিলিয়ে তায়েফ শহরটি খুবই সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন।
তায়েফ থেকে ফেরার সময় আমরা সেখানকার তায়েফের মিকাত মসজিদ “কারণুল মানাজিল” মিকাত। এটি তায়েফ, রিয়াদ, এবং উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে মক্কায় আগত যাত্রীদের ইহরাম বাঁধার স্থান। এই মিকাতটি মক্কা থেকে প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এটি “সাইলুল কাবীর” নামেও পরিচিত। সেখান থেকে আমরা সবাই গোসল করে ইহরাম পরে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।
এক ঘণ্টার জার্নিতে মক্কায় পৌঁছে, হোটেলে খেয়ে বিকেলে সবাই মিলে নফল ওমরাহ পালন করলাম।
আমরা সবাই মোট তিনবার ওমরাহ করেছি এবং কয়েকবার নফল তাওয়াফও করেছি।

সহজ ইসলাম ও বিদায়ের প্রস্তুতি 😭

পবিত্র মক্কা-মদিনায় গিয়ে আমার জীবনে অনেক কিছু পাল্টে গেছে। অনেক কিছু শেখার আছে, জানার আছে। ইসলাম যে খুবই সহজ, তা এই পবিত্র ভূমিতে গেলে বোঝা যায়। আমরা কিছু মানুষ একে কঠিন করে রেখেছি।
মক্কা-মদিনাতে প্রতি ওয়াক্তে আমরা জানাজার নামাজ আদায় করার পরম সৌভাগ্য লাভ করেছি। এখানে নামাজ শেষে কোনো অতিরিক্ত দোয়া বা কোলাহল নেই।
নামাজ শেষ, যে যার মতো বেরিয়ে যাচ্ছে। আজান হলে আবার সবাই দলে দলে মসজিদে আসছে। আজানের সাথে সাথে দোকানীরা দোকান বন্ধ করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন—যা আমাদের দেশে চোখে পড়ে না।
অনেকেই নামাজ শেষে মসজিদে ভেতরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কেউ কোরআন তেলাওয়াত করছেন, নফল নামাজ আদায় করছেন—এগুলো নিয়ে সবাই ব্যস্ত।
কোনো শব্দ, কোনো আওয়াজ নেই। কত সুন্দর এই ব্যবস্থা! আমার কাছে মনে হলো এটাই সহজ ইসলামের জীবন ব্যবস্থা।
পবিত্র মক্কা নগরীতে আমাদের সময় একেবারে শেষ হয়ে এল। ফিরতি ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। মনে মনে আপসোস থেকেই যাচ্ছে—আর ক’টা দিন থেকে গেলেই ভালো হতো। তবে নিয়ত আছে, ইনশাআল্লাহ আবার যাওয়ার চেষ্টা আছে। আল্লাহর কাছে ওয়াদা করে এসেছি, আগামীতে যতবার যাব পরিবারকে নিয়ে যেন যেতে পারি।
তাই অনুরোধ, সবাই নিয়ত করে ফেলুন। কবুলের মালিক মহান রব। কম বয়সে নিয়ত করুন, বয়স্ক অবস্থায় যাওয়া অনেক পরিশ্রমের।

শেষ যাত্রা

আমাদের সময় একেবারে শেষ। ২২ তারিখ রাতে জেদ্দা থেকে আমাদের ফ্লাইট। আমরা রাতে লাগেজ গুছিয়ে রাখলাম। মুয়াল্লিম বললেন, ৫টার সময় গাড়ি আসবে, তবে হোটেলের চেক-আউট করতে হবে আগেই। আমরা যোহরের নামাজের আগে কিছু লাগেজ নিচে নামিয়ে রাখলাম।


গাড়ি ৫টার পর আসলো। আমরা মালপত্র তুলে জেদ্দা এয়ারপোর্টের দিকে রওয়ানা দিলাম। আমাদের ফ্লাইট সৌদি সময় রাত ১টায়। এয়ারপোর্টে নেমে ট্রলি আনতে গিয়ে ৩ রিয়াল দিতে হলো—যা মদিনায় লাগেনি।
আগে জমজমের পানি বিনামূল্যে আনা যেত, এখন সৌদি সরকার জেদ্দা এয়ারপোর্ট থেকে সাড়ে ১২ রিয়াল দিয়ে ৫ লিটার পানি আনতে দেয়। এর বেশি আনা যায় না। তবে ছোট ছোট বোতলে কয়েক বোতল আনা সম্ভব।
ইমিগ্রেশন শেষে বিমানের অপেক্ষায় থাকলাম। যথাসময়ে বিমানে আসন গ্রহণ করলাম। বিদায় পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা। আল্লাহ যদি কবুল করেন, তবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আবারও আসব।
জেদ্দা থেকে বাংলাদেশ বিমানের ১০ ঘণ্টার দীর্ঘ জার্নি শেষে নিজ ঘরে ফিরলাম।