ডা. সাঈদ এনাম।

ছোটবেলায় টমাস আলভা এডিসনকে তাঁর স্কুলের শিক্ষকরা খুব একটা মেধাবী ছাত্র হিসেবে দেখতেন না। বরং তাঁকে ধীর, অমনোযোগী বা কিছুটা বুদ্ধিতে পিছিয়ে এমন একজন শিশু হিসেবেই মনে করা হয়েছিল। তাঁকে স্কুল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তাঁর মা তাঁকে নিজেই পড়াশোনা করাতে শুরু করেন। পরবর্তী জীবনে এডিসন তাঁর মায়ের এই ভূমিকার কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছিলেন।
মাত্র ১২ বছর বয়সে এডিসন Grand Trunk Railroad এর ট্রেনে সংবাদপত্র ও মিষ্টি বিক্রি করতেন। কিন্তু অন্যদের চোখে যে ছেলেটি ছিল কেবল একজন কিশোর সংবাদপত্র বিক্রেতা, তার মাথার ভেতর তখন চলছিল অন্যরকম এক পৃথিবী। ট্রেনের একটি পরিত্যক্ত কামরা ছোট্ট অংশকে তিনি বানিয়ে ফেলেছিলেন নিজের স্বপ্নের রাসায়নিক পরীক্ষাগার। সেখানে চালাতেন নানা রকম অদ্ভুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এমনকি একটি ছোট ছাপাখানাও বসিয়ে দিলেন; আর সেখান থেকেই প্রকাশ করতেন নিজের পত্রিকা The Grand Trunk Herald আর সেটা বিক্রি করে দিন যাপন।
একদিন সেই পরীক্ষাগারে ছাইপাঁশ রাসায়নিক নিয়ে কাজ করার সময় ফসফরাসের একটি অংশ পড়ে গিয়ে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ক্ষুব্ধ ট্রেনের নিয়ন্ত্রক এডিসনের ওপর প্রচণ্ড রেগে গিয়ে তাঁর কানে আঘাত করেন এবং তাঁর পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম ও ছাপাখানাও ট্রেন থেকে নামিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেন। পরবর্তীকালে এই ঘটনাকে তাঁর শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইতিহাসের বিচারে এডিসনের শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার আরও কিছু সম্ভাব্য কারণের কথাও জানা যায়।
একবার ভাবুন তো, যে মানুষটি পরবর্তীকালে বৈদ্যুতিক আলো, ফোনোগ্রাফসহ অসংখ্য আবিষ্কার ও উন্নয়নের মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলে দিলেন, অন্ধকার রাতকে যিনি আজকের উজ্জ্বল আর ঝিকিমিকি আলোয় ভরিয়ে দিলেন, তাঁর শৈশব কৈশোর পরিচয় ছিল টোকাই হিসেবে জীবন যাপন আর একজন সংবাদপত্র বিক্রেতা!
তাঁর গবেষণাগার ছিল না কোনো আধুনিক, ঝকঝকে ল্যাবরেটরি। ছিল চলন্ত ট্রেনের একটি ছোট্ট পরিত্যক্ত কামরা। হাতে ছিল না আধুনিক যন্ত্রপাতি, ছিল না বড় কোনো প্রতিষ্ঠান বা গবেষণার সুযোগ। ছিল শুধু অদম্য কৌতূহল, বই পড়ার নেশা, পরীক্ষা করার সাহস এবং ব্যর্থ হলেও আবার চেষ্টা করার মানসিকতা।
তাই কাউকে “বোকা”, “অযোগ্য”, “পিছিয়ে” বলে ছোট করবেন না। কোনো মানুষকে তার বর্তমান অবস্থান দিয়ে বিচার করবেন না। কারণ আজ যে শিশুটি পড়াশোনায় পিছিয়ে আছে, যে ছেলেটি হয়তো আপনার চোখে অমনোযোগী, অগোছালো কিংবা ‘কিছুই হবে না’ আগামী দিনে সেই মানুষটিই হয়তো হবে এডিসন যে কিনা এমন কিছু করে বসবে, যা পৃথিবীকে নতুনভাবে ভাবতে শেখাবে।
মানুষকে আঘাত করে কথা বলা খুব সহজ কিন্তু একজন মানুষের সম্ভাবনাকে চিনতে পারা এটাই বড় মানবিকতা। কারণ, আপনি আজ একজন মানুষকে যে নামে ডাকছেন, ইতিহাস হয়তো একদিন তাকে সম্পূর্ণ অন্য নামে চিনবে।
লেখক- মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।
চিকিৎসা বিজ্ঞান 


















