
স্বাধীনতার ছয় দশক পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গত দুই দশকে দেশের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হলেও এখনো ভাগ্য বদলায়নি ছিন্নমূল ও ভাসমান মানুষগুলোর। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে হাজার হাজার শিশু ও বয়স্ক মানুষের।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, সারা দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত ছিন্নমূল বা ভাসমান মানুষের সংখ্যা ২২ হাজার ১৮৫ জন। তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দাবি, গত চার বছরে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা অনুযায়ী, শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ৫০ হাজার ছিন্নমূল মানুষ বসবাস করে। যার একটি বড় অংশ কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন জনবহুল স্থানে রাত কাটায়। এই ভাসমান মানুষগুলো প্রধানত রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, ফুটপাত, ওভারব্রিজের নিচে এবং মাজারের আশপাশে খোলা আকাশের নিচে বা অস্থায়ী ঠিকানায় বসবাস করে।
সরেজমিনে গত ২৪ আগস্ট ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের পাশেই অস্থায়ী পলিথিনের চালা ও জীর্ণ কাপড়ের বেষ্টনী দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে একটি পরিবার। রোদ, বৃষ্টি ও ঝড়—সবকিছুই তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। খাদ্য নিরাপত্তা তো দূরের কথা, মৌলিক অধিকার সম্পর্কেও কোনো ধারণাই নেই তাদের। জীবনে ভালো খাবার, বাসস্থান কিংবা বস্ত্রের বালাই নেই; শিক্ষা ও চিকিৎসা তো তাদের কাছে বিলাসিতা মাত্র।
পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা বিভিন্ন সময় স্টেশনে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনযাপন করেন। বিশেষ করে ৬ থেকে ৭ বছরের শিশুরা রেল গাড়িতে বাদাম, পানি, জুস কিংবা চানাচুর বিক্রি করে থাকে। সরকারি বা বেসরকারি অনুদান তাদের কাছে পৌঁছাতে যেন সময় লাগবে কাল কেয়ামত পর্যন্ত!
অথচ, বিগত সরকারের আমলে আশ্রয়ণ প্রকল্প ও অন্যান্য গৃহায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ৭ লাখ ৭১ হাজার ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ঘর ও পুনর্বাসন সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ইতিপূর্বে উঠে এসেছে যে, এসব প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের স্বজনপ্রীতির কারণে সচ্ছল পরিবার গুলোও সরকারি ঘর পেয়েছে। সরকারের কাছ থেকে ঘর বরাদ্দ পেলেও অনেকে সেখানে বসবাস করছেন না।
অন্যদিকে, প্রকৃত গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষগুলো এখনো রাত কাটাচ্ছে রাস্তা কিংবা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। কবে উন্নয়ন হবে এই মানুষগুলোর? বর্তমান সরকার কি পারবে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে? এমন প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ থাকলেও প্রত্যক্ষভাবে দেখা যায়, কমলাপুর থেকে জামালপুর পর্যন্ত আসার পথে শত শত শিশু হকারি করে চানাচুর, বাদাম, সিঙ্গারা, পানি ও জুস বিক্রি করছে। সারারাত হকারির কাজ চালিয়ে সামান্য বিরতি দিয়ে আবার শুরু হয় তাদের জীবনযুদ্ধ।
৫ থেকে ৬ বছরের এই কোমলমতি শিশুরা বাস, লঞ্চ ও ট্রেনে হকারি করছে। কবে বন্ধ হবে এই শিশুশ্রম? কবে বদলাবে তাদের ভাগ্য? পাশাপাশি প্রতিবছর পুষ্টিহীনতার কারণে নবজাতক মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে রয়ে গেছে। এই সংকট উত্তরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
ফারুক আহমেদ ভূঁইয়া, জামালপুর 


















