
বিনিয়োগের মাত্র ১০ মিনিট পরেই ৫ হাজার টাকা হয়ে যাবে ১০ হাজার, আর ১ লাখ টাকা জমা দিলে মুহূর্তেই তা পরিণত হবে ২ লাখে! প্রথম শুনলে অবাস্তব মনে হলেও এই অবিশ্বাস্য ও চোখধাঁধানো অফার দিয়েই জামালপুরে সাধারণ মানুষের প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন আলাল উদ্দিন (আলাল মাস্টার) নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষক!
ধর্মীয় লেবাস এবং শিক্ষকতার সামাজিক মর্যাদাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিগত ছয় মাস ধরে অত্যন্ত সুকৌশলে তিনি এই ডিজিটাল প্রতারণার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। বর্তমানে ভুক্তভোগীদের কোটি টাকা নিয়ে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে জামালপুর সদর উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের বাগড়া গ্রামে। অভিযুক্ত আলাল উদ্দিন শ্রীপুর ইউনিয়নের কেশবপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আলাল উদ্দিন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক হওয়ায় এবং সবসময় ধর্মীয় পোশাক বা ‘হুজুর’ লেবাসে চলাফেরা করায় এলাকার সরল-সহজ, খেটে খাওয়া মানুষ তাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন। এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই তিনি মূলত একটি নিষিদ্ধ অনলাইন জুয়া অ্যাপের মাধ্যমে প্রতারণার জাল বোনেন। প্রথম দিকে তিনি দুই-একজনকে টাকা দ্বিগুণ করে দিয়ে এলাকায় নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেন। এরপরই শুরু হয় তার আসল খেলা। তিনি সাধারণ মানুষকে বোঝাতেন যে, এটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং একটি বিশেষ অনলাইন ব্যবসা। তার এই লোভনীয় ফাঁদে শুধু সাধারণ মানুষই নয়, পা দিয়েছিলেন তার নিজের মাদ্রাসার সহকর্মী শিক্ষকেরাও।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আলাল মাস্টারের প্রতারণার কৌশলটি ছিল অত্যন্ত চতুর। কোনো গ্রাহক তার হাতে নগদ টাকা তুলে দেওয়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর তার মোবাইলের একটি নির্দিষ্ট অ্যাপে সেই টাকা দ্বিগুণ বা তিনগুণ হিসেবে প্রদর্শিত হতো। কিন্তু পর্দার পেছনের মূল নিয়ন্ত্রণ বা ‘অ্যাডমিন এক্সেস’ ছিল খোদ আলাল মাস্টারের হাতে। তার বিশেষ হস্তক্ষেপ বা অনুমোদন ছাড়া গ্রাহকরা নিজেদের স্ক্রিনে টাকা দেখলেও তা কোনোভাবেই মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ) বা ব্যাংকের মাধ্যমে উত্তোলন (উইথড্র) করতে পারতেন না। ফলে ভার্চুয়াল ওয়ালেটে টাকার অঙ্ক দেখে সাধারণ মানুষ খুশি হলেও বাস্তবে তাদের পকেট ফাঁকা করে নগদ টাকা চলে যাচ্ছিল আলাল মাস্টারের ঝুলিতে।
এই মহাপ্রতারণার শিকার হয়ে এখন শত শত পরিবার পথে বসার উপক্রম হয়েছে। মাত্র ৫ দিন আগে সিঙ্গাপুর থেকে ছুটিতে দেশে ফেরা বাগড়া গ্রামের প্রবাসী হানিফ উদ্দিনের ছেলে মাসুদ মিয়া জানান, দেশে ফেরার পর পরই তার ওপর নজর পড়ে আলাল মাস্টারের। তাকে ফুসলিয়ে এবং নানা লোভ দেখিয়ে নগদ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন ওই শিক্ষক। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল ১০ মিনিট পরেই তা ১ লাখ টাকা হবে। কিন্তু ১০ মিনিট পর বলা হয় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। মাসুদ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২৪ ঘণ্টা পর আমার মোবাইলে ঠিকই ১ লাখ টাকা দেখাচ্ছিল, কিন্তু আমি তুলতে পারছিলাম না। ওটা ছিল আমার আবার সিঙ্গাপুরে ফিরে যাওয়ার টিকিটের টাকা। এখন আমি সম্পূর্ণ নিঃস্ব। আমি এই প্রতারকের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

একই গ্রামের এক অসহায় তালাকপ্রাপ্তা নারী বুক চাপড়ে কান্না করতে করতে বলেন, আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। একটা ছোট সন্তান নিয়ে অন্যের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করে, খেয়ে না খেয়ে ৫ হাজার টাকা জমিয়েছিলাম। আলাল হুজুর সেই টাকা ডাবল করে দেওয়ার কথা বলে নিয়ে এখন পালিয়ে গেছে। আমি এখন বাচ্চার মুখে কী তুলে দেব?
সরেজমিনে আলাল মাস্টারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সারাদিন ধরে প্রায় অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগী নারী-পুরুষ তাদের খোয়ানো টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে শিক্ষকের বাড়ির উঠানে অনশন করছেন। তাদের অনেকের হাতেই রয়েছে টাকা দেওয়ার হিসাবের খাতা। ডায়েরির পাতা থেকে উদ্ধার হওয়া এমন কিছু প্রাথমিক ভুক্তভোগীর তালিকা নিচে দেওয়া হলো,মোঃ মাসুদ (পিতা: মোঃ হানিফ) ৫০,০০০ টাকা,মোঃ নয়ন মিয়া (পিতা: মোঃ সুলতান) ৪,৫০০ টাকা, আশরাফুল (পিতা: হামেদ) ১২,০০০ টাকা,রুবেল (পিতা: জামাল) ১৩,০০০ টাকা, আবু জাহাঙ্গীর (পিতা: আব্দুল হোসেন) ১৬,০০০ টাকা, মনি (পিতা: হানিফ) ৪,৫০০ টাকা মনি (পিতা: হালিম) ৬০,০০০ টাকা,রুবেল শাপলা (পিতা: এনায়েত) ৫,৫০০ টাকা,সুলাইমান (পিতা: মাইনুল হক) — ১০,০০০ টাকা,শাহানা (স্বামী: মকবুল) ২,৫০,০০০ টাকা, হাদিছা (ভাই: পারভেজ) ১০,০০০ টাকা, শান্ত (পিতা: মঈনুল হক) ৪,৫০০ টাকা। এছাড়াও অন্যান্য এলাকার রয়েছে এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও বহু ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, লোকলজ্জার ভয়ে তারা তালিকায় নাম তোলেননি, তবে তাদের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত আলাল মাস্টারের মুঠোফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে এবং তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। তবে তার বাড়িতে অবস্থানরত তার স্ত্রীর সাথে কথা বললে তিনি সাংবাদিকদের কাছে এক বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেন,আমার স্বামী বিগত কয়েক মাস ধরে এই অনলাইনের কাজ করছেন। প্রথম প্রথম অনেকেই টাকা লাভসহ ফেরত পেয়েছে। এখন যারা বাড়িতে এসে চিল্লাচিল্লি করছে, তারা হয়তো শেষ সময়ে এসে আটকে গেছে। আমার স্বামী তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন এটা সত্যি, এবং তাদের মোবাইলে ও টাকা দেখাচ্ছে। কিন্তু ওপরের মহলের বা অ্যাপ কর্তৃপক্ষের সাথে আমার স্বামী যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তারা এখন আর সাড়া দিচ্ছে না। তিতি নিজ মুখে বলেন আমার স্বামী প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ জন মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেছেন। তবে বর্তমানে তার স্বামী কোথায় আত্মগোপন করে আছেন, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।
এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, বছরখানেক আগেও আলাল মাস্টার স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও এনজিওর কাছে প্রায় ২৭ থেকে ২৮ লক্ষ টাকা ঋণগ্রস্ত ছিলেন। দেনার দায়ে তিনি সবসময় কোণঠাসা থাকতেন। কিন্তু এই অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদ খোলার পর মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তিনি তার সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে দেন। শুধু তাই নয়, নিজ গ্রামে প্রায় অর্ধ-কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বহুতল ফাউন্ডেশনের আলিশান বাড়িও নির্মাণ করেছেন। রাতারাতি একজন সাধারণ মাদ্রাসা শিক্ষকের এই আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া দেখে স্থানীয়দের মনে সন্দেহ দানা বাঁধলেও, তার হুজুর লেবাসের কারণে কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি।
বর্তমানে এলাকা জুড়ে এই ঘটনা তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। রাস্তাঘাট, হাটবাজার থেকে শুরু করে সর্বত্রই এখন আলাল মাস্টারের এই অভিনব প্রতারণা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। সচেতন মহলের মতে, এটি একটি সুসংগঠিত সাইবার অপরাধ এবং নিষিদ্ধ অনলাইন জুয়া, যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে।
এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন, যেন দ্রুত এই প্রতারক শিক্ষককে আইনের আওতায় এনে গ্রেফতার করা হয় এবং সাধারণ ও দরিদ্র মানুষদের রক্ত জল করা টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়।
ফারুক আহমেদ ভূঁইয়া জামালপুর থেকে। 


















