
সিলেট নগরীর পনিটুলা এলাকার একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘর। চালের ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে ঘরের মেঝে থিকথিকে হয়ে আছে। সেই ভেজা বিছানায় খেলা করছে দুটি শিশু, আর পাশে বসে জীবন সংগ্রামের করুণ গল্প শোনাচ্ছেন তাদের মা নাছিমা। পেশায় গৃহপরিচারিকা এই নারীর জীবনে ঈদ আসে, কিন্তু আনন্দ আসে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাছিমা বললেন,আরেক কোরবানির ঈদ আইল; কিন্তু গরুর মাংস আর রানবার ভাগ্য আমরার হয় নাই।
নাছিমার চার সন্তান—দুই মেয়ে ও দুই ছেলে। বড় মেয়ে সুরাইয়ার বয়স ১৮। দুই ছেলে রাহিম ও আলী স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়ছে। সবার ছোট সুমাইয়ার বয়স মাত্র ৪ বছর। স্বামী থেকেও নেই; দ্বিতীয় সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকা সেই মানুষটি সন্তানদের কোনো ভরণপোষণ দেন না। ফলে চার সন্তানকে নিয়ে নাছিমার দিন কাটছে চরম অভাব আর টানাপোড়েনে।
বিভিন্ন বাসায় কাজ করে মাসে ৮-৯ হাজার টাকা আয় করেন নাছিমা। এর মধ্যে ঘর ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল দিতেই চলে যায় ৩ হাজার টাকা। বাকি ৫-৬ হাজার টাকায় ৫ জনের খাবার জোটে না। চাল-ডালের আকাশছোঁয়া দামের বাজারে আলুভর্তা আর আলুভাজিই তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। নাছিমা জানান, মাসে এক হাজার টাকা সুদে ৬ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন এবং দোকানে বকেয়া পড়েছে আরও ৭ হাজার টাকা।
টাকার অভাবে রান্ধাও বন্ধ থাকে অনেক সময়। বাচ্চারা মাছ খাওয়ার বায়না ধরেছিল, ১৫-২০ দিন আগে একবার মিরকা মাছ রানছিলাম। গত কোরবানির ঈদে মানুষের কাছে চেয়ে কিছু মাংস পাইছিলাম, এবার তাও কপালে জুটব কি না জানি না!
ছেলেদের মাদ্রাসায় ভর্তি করালেও হাতে টাকা না থাকায় তাদের পোশাক (ইউনিফর্ম) তৈরি করে দিতে পারছেন না নাছিমা। দুই ছেলের পোশাক বানাতে ২ হাজার ২০০ টাকা এবং পরিচয়পত্রের জন্য আরও ১৬০ টাকা প্রয়োজন, যা জোগাড় করা এখন তাঁর কাছে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।
নাছিমার বয়স এখন ৩৮। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। হাত-পা ও ঘাড়ের ব্যথায় ভুগছেন। গত বুধবার জ্বর আসায় কাজে যেতে পারেননি, পরিবর্তে বড় মেয়েকে পাঠিয়েছেন। টাকার অভাবে ওষুধ কেনাও সম্ভব হচ্ছে না।
শৈশব থেকেই অভাবের সাথে লড়াই করছেন নাছিমা। সুনামগঞ্জের দিরাই থেকে সুখের আশায় সিলেটে এলেও জীবনযুদ্ধে হার মানেননি তিনি। তবে বর্তমান বাজারদর আর অভাবের বাস্তবতায় সন্তানদের মুখে এক টুকরো মাংস বা একটু ভালো খাবার তুলে দিতে না পারার আক্ষেপ তাঁকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে। নাছিমার মতো অসংখ্য সংগ্রামী মায়ের কাছে ঈদ মানে কেবলই ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ, যেখানে আনন্দ বিলাসিতা মাত্র।
আবদুল হক মামুন। 
















