
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সূর্য্যপাশা গ্রামে যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ অবশেষে সংঘর্ষ ও মামলায় গড়িয়েছে। তবে সংঘর্ষের ঘটনাকে ছাপিয়ে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে মামলার আসামিদের তালিকা।
কারণ, মামলায় ৮০ বছর বয়সী এক শয্যাশায়ী বৃদ্ধ এবং তার মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য, ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ কয়েক বছর শহরে বসবাসের পর লন্ডনপ্রবাসী মির্জা আলমগীর তার পরিবারের সদস্যদের গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পাঠান। পরিবারটি সেখানে বসবাস শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, তাদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার একমাত্র চলাচলের পথ পাকা খুঁটি পুঁতে, বেড়া নির্মাণ করে এবং সুপারি গাছ রোপণের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে পরিবারটির সদস্যরা চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী, বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। জরুরি প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হতেও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়।
পরিবারটির দাবি, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি,গণ্যমান্য ব্যক্তি ও গ্রাম্য পঞ্চায়েতের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করা হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
এলাকাবাসী জানান, রাস্তা নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে এ নিয়ে মতবিরোধ চলছিল। স্থানীয়ভাবে কয়েক দফা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু কোনো পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে না আসায় পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হতে থাকে। গত ১৬ জুন রাস্তার ওপর সুপারি গাছ রোপণ ও পাকা খুঁটি বসানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে উভয় পক্ষ থানায় অভিযোগ দায়ের করে।
তবে মুমিন মিয়ার দায়ের করা মামলায় শয্যাশায়ী আব্দুল মিয়াকে ১ নম্বর আসামি এবং তার মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলে ইমরান মিয়াকে আসামি করা হলে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তীব্র আলোচনা শুরু হয়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, আব্দুল মিয়ার বয়স প্রায় ৮০ বছর।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ এবং অধিকাংশ সময় বিছানায় শুয়ে কাটান। স্বাভাবিকভাবে হাঁটা-চলাও তার পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যদিকে তার ছেলে ইমরান মিয়া দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এলাকার অধিকাংশ মানুষ তাকে মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবেই চেনেন। ফলে তাদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে অংশ নেওয়ার অভিযোগে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রায়না বেগম বলেন,আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই রাস্তা ব্যবহার হতে দেখেছি। রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই মূল সমস্যার শুরু। এখন মামলায় যাদের নাম দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে গ্রামের মানুষ প্রশ্ন তুলছেন। আরেক বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, রাস্তা বন্ধ না হলে হয়তো এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। প্রশাসনের উচিত পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।
স্থানীয় বাসিন্দা তোফায়েল মিয়া বলেন, সংঘর্ষের ঘটনা দুঃখজনক। কিন্তু শয্যাশায়ী একজন বৃদ্ধ ও মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নাম মামলায় থাকায় মানুষ বিস্মিত হয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য গোপাল রায় বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা একাধিকবার বসেছি। উভয় পক্ষকে সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছি। এমনকি ঘটনার পরও মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন,মারামারির ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে যা পাওয়া যাবে, সেই অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, শুধু সংঘর্ষের ঘটনাই নয়, এর পেছনের মূল কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের মতে, যদি সত্যিই কোনো পরিবারের একমাত্র যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। কারণ বিরোধের মূল কারণ নিরসন না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।
গ্রামবাসীর দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে হবে। একইসঙ্গে রাস্তা সংক্রান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষই হয়রানির শিকার না হন। তাদের মতে, একটি পরিবারের চলাচলের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন মামলার মাধ্যমে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে সূর্য্যপাশা গ্রামের এ ঘটনাটি শুধু একটি রাস্তা বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিয়ে জনমনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো এলাকা।
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি 


















