
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবার দুরবস্থা নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করেছেন সদ্য বদলিকৃত সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. সিনথিয়া তাসমিন। গত ২৫ অক্টোবর সিলেট সাইবার সিকিউরিটি আদালতে তিনি এ মামলা করেন।
মামলায় দৈনিক জনবাণীর মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি মনজু বিজয় চৌধুরীকে প্রধান আসামি এবং দৈনিক খোলা কাগজের মৌলভীবাজার জেলা স্টাফ রিপোর্টার ও শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের যুগ্ম সদস্য সচিব মো. এহসানুল হক (এহসান বিন মুজাহির)কে তৃতীয় আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস নেতা মোজাহিদুল ইসলাম, ‘জেন জেড শ্রীমঙ্গল’ এবং প্রবাসী আমির আলীকে মামলার অন্য আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে বিভিন্ন বেনামি ও মিথ্যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মানহানিকর প্রচারণা চালিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পোস্ট মুছে দেওয়ার কথা বলে অর্থ দাবি করেছেন বলেও অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগে সাইবার সুরক্ষা আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়।
তবে মামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সাংবাদিকরা। তাঁদের দাবি, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ এবং তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাওয়ার কারণেই তাঁদের বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়েছে।
সাংবাদিক এহসানুল হক জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবার মান, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছেন। তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেয়াদহীন পাউরুটি ও নিম্নমানের কলা সরবরাহ’, ‘সরকারি হাসপাতালে রাতেও ওড়ে জাতীয় পতাকা’, ‘শ্রীমঙ্গল সরকারি হাসপাতালে নানা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ, সচেতন মহলে ক্ষোভ’, ‘জেনারেটর-আইপিএস অচল, মোমবাতিই ভরসা শ্রীমঙ্গল সরকারি হাসপাতালে’, ‘তদন্ত দাবির মধ্যেই অভিযুক্ত ডা. সিনথিয়াকে বদলি’ এবং ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমএসআর সামগ্রী সরবরাহ নিয়ে বিতর্ক’।
তিনি আরও জানান, হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা যাচাই করতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় ১১টি বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ, প্যাথলজি ও ভর্তি রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা ফির সরকারি চালানের অনুলিপি, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও দরপত্র, জ্বালানি খরচ, রোগীর হিসাব, বাড়িভাড়া জমা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা এবং অতীতে আইপিএস ও ব্যাটারি চুরির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন।
এহসানুল হকের অভিযোগ, এসব তথ্য চেয়ে আবেদন এবং হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরেই তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তিনি বলেন,চাঁদা দাবি বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এর কোনো সত্যতা নেই। হামলা, মামলা কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে আমার বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বন্ধ করা যাবে না। আমি চাই, সিআইডি, পিবিআইসহ সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করুক।
মামলার প্রধান আসামি মনজু বিজয় চৌধুরী বলেন, হাসপাতালের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের কারণেই আমাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা নিজের প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতি আড়াল করতেই এ ধরনের হয়রানিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে আমরা মনে করি।
তিনি আরও বলেন, ডা. সিনথিয়া তাসমিনের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে সংঘটিত বলে উত্থাপিত বিভিন্ন অনিয়ম, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
এদিকে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সাংবাদিক নেতারা বলছেন, সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিক যেন হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মামলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা রক্ষার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক টিএইচও ডা. সিনথিয়া তাসমিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের দাবি, হাসপাতালের অনিয়মের অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা হোক।
আব্দুস সামাদ আজাদ, মৌলভীবাজার: 

















