ডা. সাঈদ এনাম।

ক্লিনিক্যাল চিত্র: মুডের দুই বিপরীত চিত্র
বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার (Bipolar Mood Disorder) এমন একটি মানসিক রোগ, যেখানে মানুষের মুড, শক্তি, চিন্তা ও আচরণ অস্বাভাবিকভাবে দুই বিপরীত মেরুর মধ্যে ওঠানামা করে। একদিকে ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়া, অন্যদিকে বিষণ্নতা (Depression)। এই দুই অবস্থার মাঝখানে অনেক সময় রোগী দীর্ঘদিন প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপনও করতে পারেন।
ম্যানিয়া পর্বে রোগীর মধ্যে অস্বাভাবিক উচ্ছ্বাস, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, হাসিখুশি ও কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়। ঘুমের প্রয়োজন অনেক কমে যায়, কথা বলার গতি বেড়ে যায়, চিন্তা দ্রুত এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে ছুটে চলে এবং মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়। কেউ কেউ নিজেকে অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন মনে করেন (Grandiosity) , অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেন (Manic Spending) কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন (Risky Behaviour) । গুরুতর অবস্থায় ভ্রান্ত বিশ্বাস, আমি মহান কেউ (Delusion) বা হ্যালুসিনেশন (Hallucination), আমি গায়েবী দেখতে পারি, গায়েবী জানি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে বিষণ্নতা পর্বে রোগী গভীর দুঃখ, হতাশা, আগ্রহহীনতা, ক্লান্তি, অপরাধবোধ ও আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগেন। ঘুম ও ক্ষুধার পরিবর্তন ঘটে, চিন্তা ও কাজের গতি কমে যায় এবং গুরুতর ক্ষেত্রে আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
বাইপোলার ডিসঅর্ডার সাধারণত এপিসোডিক (Episodic) প্রকৃতির। অর্থাৎ, রোগের উপসর্গ একটানা সারা বছর থাকে না ম্যানিয়া বা বিষণ্নতার পর্ব কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে। এরপর রোগী আবার সম্পূর্ণ বা প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন।
অনেক সময় রোগীর স্বজনরা গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্লু দিয়ে বলেন, ‘প্রতি শীতেই রোগটি ফিরে আসে’ কিংবা ‘প্রতিবছর গরমের সময় রোগীর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়।’ এ ধরনের পর্যবেক্ষণ রোগের সিজোনাল পুনরাবৃত্তির (Seasonal Pattern) সম্ভাবনার দিকেও ইঙ্গিত করতে পারে। তবে ঋতুভিত্তিক সিজোনাল পুনরাবৃত্তি সবার ক্ষেত্রে দেখা যায় না।
চিকিৎসায় লিথিয়াম: এক অনন্য আবিষ্কার!
বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় লিথিয়াম (Lithium) আজও এক অনন্য ওষুধ। এটি একটি মুড স্টেবিলাইজার (Mood Stabilizer), যা ম্যানিয়া নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ম্যানিয়া ও বিষণ্নতার পর্ব ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা সুপ্রতিষ্ঠিত।
লিথিয়ামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি আত্মহত্যার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। এ কারণে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় ওষুধটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
তবে লিথিয়ামের চিকিৎসায় সতর্কতা অপরিহার্য। এর চিকিৎসাগত কার্যকর মাত্রা ও বিষক্রিয়ার মাত্রার ব্যবধান খুবই কম (Narrow Therapeutic Index)। তাই রক্তে লিথিয়ামের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হয়। পাশাপাশি কিডনি ও থাইরয়েডের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ জরুরি।
অর্থাৎ, লিথিয়াম অত্যন্ত কার্যকর হলেও এটি অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করতে হয়।
লিথিয়াম আবিষ্কারের গল্প: একটি অনুমান থেকে যুগান্তকারী সাফল্য!
লিথিয়ামের আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে কৌতূহল, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং এক অসাধারণ গবেষকের গল্প।
১৯৪০-এর দশকে অস্ট্রেলীয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. জন কেড (Dr. John Cade) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি যুদ্ধবন্দি শিবিরে বন্দি ছিলেন। যুদ্ধের পর তিনি মানসিক রোগের জৈবিক কারণ অনুসন্ধানে আগ্রহী হন। তাঁর ধারণা হয়েছিল, ম্যানিয়ায় আক্রান্ত মানুষের শরীরে হয়তো কোনো বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হয়, যা তাদের অস্বাভাবিক আচরণের জন্য দায়ী।
এই ধারণা থেকেই শুরু হয় তাঁর গবেষণা। হাসপাতালের সুযোগ সুবিধার বাইরে, একটি ছোট গবেষণাগারে তিনি মানসিক রোগীদের প্রস্রাব সংগ্রহ করে গিনিপিগের শরীরে প্রয়োগ করতে থাকেন। বিস্ময়করভাবে, ম্যানিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের প্রস্রাব পাওয়া কিছু গিনিপিগ মারা যায়।
সাইকিয়াট্রিস্ট কেডের মনে প্রশ্ন জাগল ম্যানিয়া আক্রান্ত রোগীর ইউরিন এ থাকা কোন পদার্থটি গিনিপিগের এই বিষক্রিয়ার জন্য দায়ী? আসলে প্রত্যেক আবিষ্কার এর পিছনে সাইন্টিস্টদের অনুসন্ধিৎসু মন কার্যকরী ভুমিকা পালন করে।
তিনি লক্ষ্য করলেন, প্রস্রাবে থাকা ইউরিক অ্যাসিড (Uric Acid) পানিতে খুব সহজে দ্রবীভূত হয় না। তাই তিনি লিথিয়াম কার্বোনেটের সাহায্যে ইউরিক অ্যাসিডকে লিথিয়াম ইউরেটে রূপান্তরিত করলেন, যা পানিতে তুলনামূলক সহজে দ্রবীভূত হয়।
কিন্তু এরপর ঘটল আরও বিস্ময়কর ঘটনা!
এই দ্রবণ গিনিপিগের শরীরে প্রয়োগ করার পর দেখা গেল, প্রাণীগুলো মারা যাচ্ছে না বরং অস্বাভাবিকভাবে শান্ত ও নিস্তেজ হয়ে পড়ছে।
নিউরো বিজ্ঞানী কেডের মনে তখন নতুন প্রশ্ন এই শান্ত হয়ে যাওয়ার পেছনে কি ইউরিক অ্যাসিড, নাকি লিথিয়াম?
তিনি অনুমানের ওপর নির্ভর না করে পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিলেন। পৃথকভাবে ইউরিক অ্যাসিড ও লিথিয়াম প্রয়োগ করে তুলনামূলক পরীক্ষা করলেন।
ফলাফল তাঁকে চমকে দিল। দেখা গেল, প্রাণীদের শান্ত হয়ে যাওয়ার পেছনে ইউরিক অ্যাসিড নয়, বরং লিথিয়ামেরই ভূমিকা রয়েছে।
এবার কেডের গবেষণার দিক পরিবর্তিত হলো। তিনি বুঝতে পারলেন, লিথিয়ামের মধ্যে এমন একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ম্যানিয়ার চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।
এরপর তিনি এক বিষ্ময়কর মহানুভব কাজ করলেন। কোন রোগীকে নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করার পূর্বে নিজে লিথিয়াম গ্রহণ করে এর প্রভাব ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক বিরল ঘটনা।
পরবর্তীতে শুরু করেন গবেষণার চুড়ান্ত পর্ব। ম্যানিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় এটি প্রয়োগ করা।
১৯৪৯ সালে তিনি ১০ জন রোগীর ওপর লিথিয়াম ব্যবহারের ফলাফল প্রকাশ করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়। এভাবেই আধুনিক মনোরোগ চিকিৎসায় লিথিয়ামের যুগান্তকারী যাত্রা শুরু হয়।
একটি অনুমান, অনুসন্ধিৎসু মন, বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, এক মহানুভব কাহিনী এবং চুড়ান্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানের অদম্য প্রচেষ্টা এই সকল উদ্যোগের সমন্বয়ে আবিষ্কৃত হলো বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ যা কোটি কোটি বাইপোলার মুড ডিসওর্ডার এর রোগীকে সুস্থ রাখছে।
লিথিয়ামের আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিজ্ঞানে অনুসন্ধিৎসু মন, জানার তৃষ্ণাই এনে দিতে পারে অবিস্মরণীয় আবিষ্কার, উন্মোচিত করে দিতে পারে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত।
ডা. সাঈদ এনাম
এমবিবিএস (ডিএমসি) এমফিল (সাইকিয়াট্রি), বিসিএস (হেলথ)
সহযোগী অধ্যাপক সাইকিয়াট্রি, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ
International Fellow: American Psychiatric Association
স্বাস্থ্য সুরক্ষা 












