
দেশজুড়ে যখন ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান তখন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাই হয়ে উঠেছে আত্মকর্মসংস্থানের প্রধান হাতিয়ার। প্রথাগত তাত্ত্বিক শিক্ষার সীমা ছাড়িয়ে সরাসরি কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতায় তরুণদের দক্ষ করে তুলতে কাজ করছে রুরাল ডেভেলপমেন্ট সংস্থা (আরডিএস)।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় পরিচালিত আরডিএস- RAISE প্রকল্পের মাধ্যমে শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহ জেলার বেকার তরুণ-তরুণীদের দক্ষতা উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আমাদের দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে ‘উস্তাদ-সাগরেদ’ প্রথা অত্যন্ত সুপরিচিত। আরডিএস রেইজ প্রকল্প এই ঐতিহ্যবাহী দক্ষতা অর্জনের ধারণাকে আধুনিক ও কাঠামোগত রূপ দিয়েছে। এই মডেলের অধীনে অভিজ্ঞ কারিগর বা উস্তাদদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সাগরেদ হিসেবে তরুণ-তরুণীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

বাস্তব কর্ম-পরিবেশে প্রতিদিন কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় এই কৌশলের মাধ্যমে শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহ জেলার ৯০৫ জন তরুণ-তরুণী ইতিমধ্যে বিভিন্ন চাহিদাসম্পন্ন ট্রেডে সফলভাবে কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। প্রশিক্ষণ শেষেই বাস্তবভিত্তিক অভিজ্ঞতার সুবাদে তাদের সিংহভাগেরই দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন ও মেইনটেন্যান্স, মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, মোটরসাইকেল সার্ভিসিং, প্লাম্বিং অ্যান্ড পাইপ ফিটিংস, ফ্যাশন গার্মেন্টস, কার্পেন্ট্রি, রিফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং, ওয়েল্ডিং অ্যান্ড ফেব্রিকেশন, স্মল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেটাল ওয়ার্কস, ড্রাইভিং কাম অটো মেকানিক্স, বেকারী অ্যান্ড পেস্ট্রি প্রোডাকশন, বিউটিফিকেশন অ্যান্ড ওয়েলনেস, এমব্রয়ডারি অ্যান্ড হ্যান্ডিক্রাফটস প্রোডাকশন, সুইং অপারেশন, অ্যালুমিনিয়াম ফেব্রিকেশন, মেসনরি অ্যান্ড রড বাইন্ডিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ডিজিটাল মার্কেটিং সহ মোট ২৬ টি চাহিদাভিত্তিক ট্রেডে তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।
পিকেএসএফ-এর বিশ্বমানের কারিগরি নির্দেশিকা ও সহায়তার ফলেই রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণগুলো মানসম্মত ও যুগোপযোগী হচ্ছে। প্রশিক্ষণ প্রদান থেকে শুরু করে প্রশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানে যুক্ত করার জন্য আরডিএস স্থানীয় বাজার, কারখানা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাথে নিয়মিত সংযোগ বা লিংকেজ তৈরি করে দিচ্ছে। এর ফলে উস্তাদদের কাছ থেকে কাজ শেখার পর তরুণ-তরুণীরা তা সরাসরি বাজারভিত্তিক উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারছেন। কেবল সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষা না দিয়ে সরাসরি কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা তৈরি করায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা বিভিন্ন ট্রেডে আত্মবিশ্বাসের সাথে কাজ করছেন এবং অনেকেই নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন।
শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহের বিপুলসংখ্যক তরুণের কারিগরি দক্ষতা অর্জন ও কর্মসংস্থান লাভ প্রমাণ করে যে সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আমাদের তরুণ সমাজ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। পিকেএসএফ-এর চমৎকার কারিগরি সহায়তা এবং আরডিএস-এর মাঠপর্যায়ের কাজের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভরশীল করতে এক আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে।
উল্লেখ্য যে, আরডিএস রেইজ প্রকল্পটি ২০২২ সালে সফলভাবে শুরু হয়ে ২০২৬ সালের জুন মাসে প্রথম পর্যায়ের মেয়াদ শেষ করে। পরবর্তীতে সফলতার ধারাবাহিকতায় পুনরায় ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সাল মেয়াদে এর দ্বিতীয় পর্বের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা এই অঞ্চলের আরও বহু তরুণ-তরুণীর জীবনে স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন আলো ছড়িয়ে দেবে।
মোঃ খোরশেদ আলম, জামালপুর। 


















