সিলেট ০৪:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
News Title :
চুনারুঘাটে মদ্যপান করে মাকে মারধর করার অভিযোগ যুবকের ৬ মাসের কারাদণ্ড ‎ড. মুমিনুল হক অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ প্রদান উপলক্ষে আলোচনা সভা‎ সিলেটে উদ্ধার হওয়া ৫২টি হারানো মোবাইল গ্রাহকদের বুঝিয়ে দিল এসএমপি ‎সাতছড়ি চাকলাপুঞ্জিতে সিএনজি দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল ব্যবসায়ীর ‎জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব কমিটির সভাপতি হলেন হবিগঞ্জ-১ আসনের এমপি ড.রেজা কিবরিয়া ‎অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে গোয়াইনঘাটে মানববন্ধন যুক্তরাজ্যে সিলেট বিভাগ গণদাবী পরিষদের প্রথম কমিটি ঘোষণা, সভাপতি শাহ মুনিম, সম্পাদক এম ইয়াওর উদ্দিন। ‎ময়মনসিংহ বিভাগেই কর্মরত থাকতে খাদ্যভবনে দৌড়, আটপাড়া উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ইমরান মাধবপুরে সাবেক মেয়র শাহ মো. মুসলিম গ্রেপ্তার‎ ‎মৃত্যুর সংবাদ শুনলেই ছুটে যান সরওয়ার আলম

‎মৃত্যুর সংবাদ শুনলেই ছুটে যান সরওয়ার আলম

মানবিক মানুষ সরওয়ার আলম।


‎পরপারের প্রথম স্টেশন হচ্ছে কবর। মৃত মানুষকে সেখানে চিরন্দ্রিায় দাফন করা হয়। এই কবরকে ঘিরে পরকালের অনেক অন্তর্নিহিত কথা ইসলামে প্রচলিত আছে। মৃত মানুষের দাফন কার্যের শেষ বিছানা এটি। এলাকার কারও মৃত্যুর খবর পেলেই তড়িঘড়ি করে খুন্তি-কোদাল, দা, চাকু, স্কেল আর করাতসহ কবর খোঁড়ার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে ছুটে যান সরওয়ার আলম। কবর খোঁড়ার পর মৃত ব্যক্তির পরিবারের কারও কাছ থেকে নেন না পারিশ্রমিক বা যাতায়াত খরচ। এলাকার সবার কাছে বিশেষ সম্মানের পাত্র সরওয়ার আলম। পরিচিতি পেয়েছেন শেষ ঠিকানার কারিগর হিসেবে। কবর খোঁড়ার নিখুঁত, সুদক্ষ এবং সুনিপুণ কারিগর হিসেবে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।

‎কবর খোঁড়ার এমন আত্মিক কাজে তৃপ্তি পান সরওয়ার। একক ভাবে প্রায় ৭ বছর কবর খোঁড়ার পর হঠাৎ একদিন একসাথে দুই জায়গায় কবর খোঁড়ার সংবাদ পান তিনি। একই সময় হওয়ার কারণে একটি করব খোঁড়তে পারতেও অন্যটি খোঁড়তে না পারার আক্ষেপ থেকে যায় তার। এক সাথে একাধিক কবর খোঁড়ার তাড়না থেকে নিজ উদ্যোগে  বিয়ানীবাজার পৌরশহরের কসবা-খাসা গ্রামে গড়ে তুলেছেন ‘শেষ ঠিকানা’ নামের একটি সংগঠন। সরওয়ার আলমের নেতৃত্বে বর্তমানে এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা প্রায় অর্ধশতাধিক।

‎একদিনে একাধিক কবর খোঁড়ার প্রয়োজন হলে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে সবগুলো করব খোঁড়েন সরওয়ার আলমের এই সংগঠনের সদস্যরা। মৃত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে বাঁশ কাটা থেকে শুরু করে কবর খোঁড়া শেষ করে দাফন পর্যন্ত সেখানে থাকেন সরওয়ার আলম নিজে। সরওয়ার আলমের ডায়রীতে লেখা তথ্য অনুযায়ী, তিনি এ পর্যন্ত ৫ হাজারের উপর কবর খোঁড়েছেন। শুধু দুই গ্রামেই নয়, বিয়ানীবাজার পৌরশহরের বিভিন্ন এলাকায় মৃত্যুর খবর শুনলে ছুটে যাওয়া তার নেশা হয়ে গেছে। মৃত ব্যাক্তির সংবাদ প্রচারের জন্য মাইকসেট ক্রয় করেছে সরওয়ার আলম।

‎বিয়ানীবাজার পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ড কসবা গ্রামে জন্ম নেওয়া সরওয়ার আলমের ব্যাক্তিগত জীবনে কোন পিছুটান নেই। পরিবারে চাকুরিজীবী স্ত্রী থাকার পাশাপাশি এক পুত্র সন্তান ও একজন কন্যা রয়েছে। পুত্র বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন।
‎কসবা গ্রামের বাসিন্দা মিলাদ মুহাম্মদ জয়নুল ইসলাম জানান, সরওয়ার আলম ইতিমধ্যে এতদঞ্চলের মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। তিনি তার দৈনন্দিন কাজ ফেলে মৃত মানুষকে চিরশয্যায় শায়িত করার কাজ করছেন। তার এমন মহৎ কাজ মুগ্ধ করে এলাকার সবাইকে। প্রায় ১০ বছর থেকে তিনি এলাকায় কবর খোঁড়ার কাজ করছে। রাত-দিন যে কোন সময় তিনি কবর খুঁড়তে বের হয়ে পড়েন। আবহাওয়া যেমনই থাকুক সামাজিক এই দায়িত্বের দায় নিয়ে তার কর্ম চলে বিরামহীন।

পৌরসভার কাউন্সিলর সায়ফুল ইসলাম ঝুনু বলেন, সরওয়ার আলমের  টাকা-পয়সার প্রতি কোনো লোভ নেই। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্বাবলম্বী।  কবর খুঁড়ে কারো কাছ থেকে হাদিয়া বা টাকা পয়সা নেন না তিনি। এমনকি মৃত্যুর পর মৃত মানুষের বাড়িতে কুলখানি অনুষ্ঠানেও খেতে যান না সরওয়ার। মৃত ব্যক্তির কবর খোঁড়া তার নেশা হয়ে গেছে। বর্তমান যুগে নির্লোভ থেকে সমাজের মানুষের জন্য কাজ করা মানুষের যেখানে অভাব সেখানে সরওয়ার আলম তার কাজ দিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পরিবারের কেউ সরওয়ার আলমের কাজে বাধা দেয়া না। আমি চাই সরওয়ার আলমের মতো মানুষ এমন সামাজিক কাজে এগিয়ে আসলে সমাজের চিত্র বদলে যাবে।

‎খাসা গ্রামের বাসিন্দা আবুল হাসান বলেন, সরওয়ার ভাই মৃত্যুর সংবাদ শুনলেই ছুটে যান কবর খোঁড়ার জন্য। আমাদের গ্রামসহ আশপাশের গ্রাম গুলোতে কেউ মারা গেলে আর কেউ সংবাদ না পেলেও সরওয়ার ভাই ঠিকই সংবাদ পেয়ে যান। তিনি খবর শুনা মাত্রই উনার কাছে থাকা কবর খোঁড়ার সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে ছুটে যান।

‎এ বিষয়ে সরওয়ার আলম বলেন, শখের বশে কবর খুঁড়তে খুঁড়তে এখন এটা নেশা হয়ে গেছে। কোথাও মানুষ মারা যাওয়ার খবর পেলেই মনটা ছটফট করে। দ্রুত খুন্তি-কোদাল, দা, চাকু, স্কেল আর করাতসহ কবর খোঁড়ার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে ছুটে যাই। এখন এই জিনিস অভ্যাসে পরিণত হয়েছে চাইলেও মৃত্যুর সংবাদ শুনলে ঘরে বসে থাকতে পারবো না। আমি চাই আমি না থাকলেও কবর খোঁড়ার জন্য যাতে কেউ বিপদে না পড়ে সেজন্য আমি একটি সংগঠন তৈরি করেছি আমার সংগঠনের সদস্যরা বিনা পয়সায় মৃত মানুষের খবর খুঁড়ে দিয়ে আসবে। আমার সংগঠনের প্রতিটি সদস্য আমার মতো কবর খোঁড়ার কাজ করে আনন্দ পায়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চুনারুঘাটে মদ্যপান করে মাকে মারধর করার অভিযোগ যুবকের ৬ মাসের কারাদণ্ড

‎মৃত্যুর সংবাদ শুনলেই ছুটে যান সরওয়ার আলম

সময় ০৯:৪৩:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানবিক মানুষ সরওয়ার আলম।


‎পরপারের প্রথম স্টেশন হচ্ছে কবর। মৃত মানুষকে সেখানে চিরন্দ্রিায় দাফন করা হয়। এই কবরকে ঘিরে পরকালের অনেক অন্তর্নিহিত কথা ইসলামে প্রচলিত আছে। মৃত মানুষের দাফন কার্যের শেষ বিছানা এটি। এলাকার কারও মৃত্যুর খবর পেলেই তড়িঘড়ি করে খুন্তি-কোদাল, দা, চাকু, স্কেল আর করাতসহ কবর খোঁড়ার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে ছুটে যান সরওয়ার আলম। কবর খোঁড়ার পর মৃত ব্যক্তির পরিবারের কারও কাছ থেকে নেন না পারিশ্রমিক বা যাতায়াত খরচ। এলাকার সবার কাছে বিশেষ সম্মানের পাত্র সরওয়ার আলম। পরিচিতি পেয়েছেন শেষ ঠিকানার কারিগর হিসেবে। কবর খোঁড়ার নিখুঁত, সুদক্ষ এবং সুনিপুণ কারিগর হিসেবে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।

‎কবর খোঁড়ার এমন আত্মিক কাজে তৃপ্তি পান সরওয়ার। একক ভাবে প্রায় ৭ বছর কবর খোঁড়ার পর হঠাৎ একদিন একসাথে দুই জায়গায় কবর খোঁড়ার সংবাদ পান তিনি। একই সময় হওয়ার কারণে একটি করব খোঁড়তে পারতেও অন্যটি খোঁড়তে না পারার আক্ষেপ থেকে যায় তার। এক সাথে একাধিক কবর খোঁড়ার তাড়না থেকে নিজ উদ্যোগে  বিয়ানীবাজার পৌরশহরের কসবা-খাসা গ্রামে গড়ে তুলেছেন ‘শেষ ঠিকানা’ নামের একটি সংগঠন। সরওয়ার আলমের নেতৃত্বে বর্তমানে এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা প্রায় অর্ধশতাধিক।

‎একদিনে একাধিক কবর খোঁড়ার প্রয়োজন হলে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে সবগুলো করব খোঁড়েন সরওয়ার আলমের এই সংগঠনের সদস্যরা। মৃত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে বাঁশ কাটা থেকে শুরু করে কবর খোঁড়া শেষ করে দাফন পর্যন্ত সেখানে থাকেন সরওয়ার আলম নিজে। সরওয়ার আলমের ডায়রীতে লেখা তথ্য অনুযায়ী, তিনি এ পর্যন্ত ৫ হাজারের উপর কবর খোঁড়েছেন। শুধু দুই গ্রামেই নয়, বিয়ানীবাজার পৌরশহরের বিভিন্ন এলাকায় মৃত্যুর খবর শুনলে ছুটে যাওয়া তার নেশা হয়ে গেছে। মৃত ব্যাক্তির সংবাদ প্রচারের জন্য মাইকসেট ক্রয় করেছে সরওয়ার আলম।

‎বিয়ানীবাজার পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ড কসবা গ্রামে জন্ম নেওয়া সরওয়ার আলমের ব্যাক্তিগত জীবনে কোন পিছুটান নেই। পরিবারে চাকুরিজীবী স্ত্রী থাকার পাশাপাশি এক পুত্র সন্তান ও একজন কন্যা রয়েছে। পুত্র বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন।
‎কসবা গ্রামের বাসিন্দা মিলাদ মুহাম্মদ জয়নুল ইসলাম জানান, সরওয়ার আলম ইতিমধ্যে এতদঞ্চলের মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। তিনি তার দৈনন্দিন কাজ ফেলে মৃত মানুষকে চিরশয্যায় শায়িত করার কাজ করছেন। তার এমন মহৎ কাজ মুগ্ধ করে এলাকার সবাইকে। প্রায় ১০ বছর থেকে তিনি এলাকায় কবর খোঁড়ার কাজ করছে। রাত-দিন যে কোন সময় তিনি কবর খুঁড়তে বের হয়ে পড়েন। আবহাওয়া যেমনই থাকুক সামাজিক এই দায়িত্বের দায় নিয়ে তার কর্ম চলে বিরামহীন।

পৌরসভার কাউন্সিলর সায়ফুল ইসলাম ঝুনু বলেন, সরওয়ার আলমের  টাকা-পয়সার প্রতি কোনো লোভ নেই। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্বাবলম্বী।  কবর খুঁড়ে কারো কাছ থেকে হাদিয়া বা টাকা পয়সা নেন না তিনি। এমনকি মৃত্যুর পর মৃত মানুষের বাড়িতে কুলখানি অনুষ্ঠানেও খেতে যান না সরওয়ার। মৃত ব্যক্তির কবর খোঁড়া তার নেশা হয়ে গেছে। বর্তমান যুগে নির্লোভ থেকে সমাজের মানুষের জন্য কাজ করা মানুষের যেখানে অভাব সেখানে সরওয়ার আলম তার কাজ দিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পরিবারের কেউ সরওয়ার আলমের কাজে বাধা দেয়া না। আমি চাই সরওয়ার আলমের মতো মানুষ এমন সামাজিক কাজে এগিয়ে আসলে সমাজের চিত্র বদলে যাবে।

‎খাসা গ্রামের বাসিন্দা আবুল হাসান বলেন, সরওয়ার ভাই মৃত্যুর সংবাদ শুনলেই ছুটে যান কবর খোঁড়ার জন্য। আমাদের গ্রামসহ আশপাশের গ্রাম গুলোতে কেউ মারা গেলে আর কেউ সংবাদ না পেলেও সরওয়ার ভাই ঠিকই সংবাদ পেয়ে যান। তিনি খবর শুনা মাত্রই উনার কাছে থাকা কবর খোঁড়ার সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে ছুটে যান।

‎এ বিষয়ে সরওয়ার আলম বলেন, শখের বশে কবর খুঁড়তে খুঁড়তে এখন এটা নেশা হয়ে গেছে। কোথাও মানুষ মারা যাওয়ার খবর পেলেই মনটা ছটফট করে। দ্রুত খুন্তি-কোদাল, দা, চাকু, স্কেল আর করাতসহ কবর খোঁড়ার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে ছুটে যাই। এখন এই জিনিস অভ্যাসে পরিণত হয়েছে চাইলেও মৃত্যুর সংবাদ শুনলে ঘরে বসে থাকতে পারবো না। আমি চাই আমি না থাকলেও কবর খোঁড়ার জন্য যাতে কেউ বিপদে না পড়ে সেজন্য আমি একটি সংগঠন তৈরি করেছি আমার সংগঠনের সদস্যরা বিনা পয়সায় মৃত মানুষের খবর খুঁড়ে দিয়ে আসবে। আমার সংগঠনের প্রতিটি সদস্য আমার মতো কবর খোঁড়ার কাজ করে আনন্দ পায়।