
আমাদের সমাজে মাঝে মাঝে শোনা যায়—“সে এক রাতেই ছেলে থেকে মেয়ে হয়ে গেছে!” কিংবা “মেয়ে থেকে ছেলেতে রূপান্তরিত হয়েছে।” এসব শিরোনাম বা মন্তব্য দেখে অনেকেই চমকে ওঠেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব বক্তব্য কতটা বৈজ্ঞানিক?
“এক রাতে ছেলে থেকে মেয়ে হয়ে গেল”—এ ধরনের শিরোনাম মূলত বিভ্রান্তিকর এবং প্রায়শই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার কৌশল মাত্র। বাস্তবে, একজন মানুষ হঠাৎ করে তার লিঙ্গ পরিচয় পরিবর্তন করেন না। এমন দাবিও বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে—লিঙ্গ পরিচয় বা নিজেকে উপস্থাপনের ধরন কারও খেয়ালখুশির বিষয় নয়, কিংবা কারও প্রভাবে সহজে বদলে যাওয়ার মতোও নয়। এটি একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা গঠিত হয় জৈবিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত বিভিন্ন প্রভাবের সমন্বয়ে (APA, 2021; WPATH, 2022)।
মূলত, লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তি তৈরি হতে শুরু করে গর্ভাবস্থাতেই—যেখানে হরমোন, জিন এবং মস্তিষ্কের গঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনে পারিবারিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং আত্ম-অনুধাবনের মাধ্যমে ব্যক্তি ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শেখে—সে আসলে কে।
এই আত্ম-চেতনার বিকাশকালেই কখনও কখনও কেউ অনুভব করতে পারেন, তার অভ্যন্তরীণ লিঙ্গ পরিচয় তার বাহ্যিক শারীরিক গঠনের সঙ্গে মিলছে না। এ অবস্থায় মানসিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় Gender Dysphoria—যা একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, এ অবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আত্মহত্যার ঝুঁকি সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি।
লিঙ্গ নির্ধারণে মস্তিষ্ক ও হরমোনের ভূমিকা:
নিউরোবৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, লিঙ্গ পরিচয়ের বিকাশে মস্তিষ্কের ওপর গর্ভকালীন হরমোনের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় অ্যান্ড্রোজেন ও এস্ট্রোজেন হরমোন মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে প্রভাব ফেলে, যা শিশুর ভবিষ্যৎ লিঙ্গ পরিচয় ও আচরণে ভূমিকা রাখে (Bao & Swaab, 2011)।
এছাড়াও, যেসব ক্ষেত্রে বায়োলজিক্যাল লিঙ্গ ও লিঙ্গ পরিচয়ের মধ্যে অমিল দেখা যায়, সেখানে মস্তিষ্কের গঠন ও হরমোন-সংবেদনশীল অঞ্চলের কার্যকারিতায় স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ করা গেছে (Garcia-Falgueras & Swaab, 2008)।
জন্মগত ত্রুটি ও লিঙ্গ নির্ধারণের জটিলতা:
কখনও কখনও শিশুরা ইউরোজেনিটাল সিস্টেমের জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্ম নেয়। যেমন—হার্মাফ্রোডাইট (উভয় লিঙ্গের অঙ্গের উপস্থিতি) বা সিউডোহার্মাফ্রোডাইট (বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ যৌনাঙ্গে ভিন্নতা)। এসব অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় Disorders of Sex Development (DSD)। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এসব অবস্থার সফল ও মানবিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব (Lee et al., 2006; Witchel, 2022)।
ইসলামের দৃষ্টিতে লিঙ্গ বৈচিত্র্য:
ইসলাম আল্লাহর সৃষ্টির বৈচিত্র্য ও ফিতরাতকে সম্মান করার শিক্ষা দেয় (সূরা আর-রুম, আয়াত ৩০)। নবী করিম (সা.)–এর যুগেও লিঙ্গ বৈচিত্র্যসম্পন্ন মানুষ সমাজে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁদের প্রতি অবমাননাকর আচরণকে উৎসাহ দেওয়া হয়নি (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪০৬৭)। ইসলাম মানবিকতা ও ন্যায়বিচারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৫৮)।
উপসংহার:
গবেষণায় দেখা গেছে, লিঙ্গ বৈচিত্র্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি (Haas et al., 2014)। যদি আমরা বিষয়গুলোকে বিজ্ঞানের আলোয় দেখি, তাহলে সমাজে বিভ্রান্তি, বৈষম্য ও বিদ্বেষ কমবে। বাড়বে পারস্পরিক সম্মান ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা।
তাই বিভ্রান্তিকর সংবাদ, কুসংস্কার বা বিদ্বেষমূলক আচরণের পরিবর্তে আমাদের উচিত বৈজ্ঞানিক, মানবিক ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা।
সহযোগী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি, সিলেট মেডিকেল কলেজ।
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েট মেম্বার, রয়েল অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্ট
ডা. মোহাম্মদ সাঈদ এনাম 
















