
সকালের সূর্য ওঠার আগেই ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন তারা। কেউ বা ফিরছিলেন স্বজনদের টানে, কেউ জীবিকার তাগিদে। কিন্তু পিচঢালা সড়ক তাদের পৌঁছে দিল মৃত্যুর কোলঘেঁষে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক যেন এখন কেবল একটি সড়ক নয়, যাত্রী ও চালকদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক ও রক্তের উপত্যকা। একের পর এক দুর্ঘটনায় ছিন্নভিন্ন হচ্ছে একেকটি পরিবার, খালি হচ্ছে মায়ের কোল, নিভছে সম্ভাবনাময় সব জীবন।
শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ও গণমাধ্যমের পরিসংখ্যান বলছে এক শিউরে ওঠার মতো তথ্য। ২০২৬ সালের গত সাত-আট মাসে এই মহাসড়কের কেবল সিলেট অংশেই প্রাণ হারিয়েছেন ৫০ জনেরও বেশি মানুষ। আর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মহাসড়কটিতে নথিবদ্ধ ১৮৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১১৭ জনের, গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ১০৯ জন।
আগস্টের রক্তাক্ত ২২ দিন
চলতি আগস্ট মাসেই ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক রূপ নিয়েছে রক্তক্ষয়ী ধ্বংসস্তূপে। মাসের শুরু থেকেই নিয়মিত বিরতিতে ঘটেছে একাধিক বড় ধরনের দুর্ঘটনা। ২২ আগস্ট: ওসমানীনগরের ব্রাহ্মণগ্রামে তেলবাহী ট্যাংকার পিষে ফেলে একটি সিএনজি অটোরিকশাকে। মুহূর্তেই প্রাণ যায় একই পরিবারের ৩ জনসহ ৪ জনের। ১০ আগস্ট: নবীগঞ্জের রুকুনপুরে বাস ও পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঝরে যায় ৩টি প্রাণ।
৯ আগস্ট: মাধবপুরে তেলবাহী লরি ও ডাম্প ট্রাকের সংঘর্ষের পর তা আছড়ে পড়ে অটোরিকশার ওপর। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ২ জন। ৭ আগস্ট: ওসমানীনগরের কাশিকাপনে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি ভয়াবহ সংঘর্ষে শিশু ও নারীসহ ৯ জন নিহত হন, রক্তাক্ত হন অন্তত ২৫ জন যাত্রী।
এর আগে জুলাইয়ের টানা বৃষ্টিতে রাস্তার খানাখন্দ আর গত ডিসেম্বরের ঘন কুয়াশা—সব ঋতুতেই এই সড়ক কেড়ে নিয়েছে তাজা প্রাণ।
কেন এই মরণফাঁদ?
দুর্ঘটনা তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এই মহাসড়কে প্রাণহানির পেছনে কাজ করছে তিনটি মূল সংকট: ধীরগতির সংস্কার ও খানাখন্দ: চার ও ছয় লেনের উন্নীতকরণ কাজ ঢিমেতালে চলায় দীর্ঘ দিন ধরে সড়ক ভাঙাচোরা। বর্ষার পানিতে সেই গর্তগুলো এখন বড় বড় মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও অনুমোদনহীন ‘অবৈধ’ স্লিপার ও ডবলডেকার বাস: বিআরটিএ-এর আইনের তোয়াক্কা না করে সাধারণ এসি বাস কেটে অবৈধভাবে স্লিপার বাস বানানো হচ্ছে। এতে যানের মূল ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সিংহভাগ ডাবলডেকার বাসের নেই কোনো রুট পারমিট।
বেপরোয়া ওভারটেকিং ও চালকের ক্লান্তির কারনে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং একটানা গাড়ি চালানোর ক্লান্তি তৈরি করছে অনিয়ন্ত্রিত গতি। এসব ও কারন দুর্ঘটনায় প্রধান কারন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রশিক্ষণও জরুরি। তা হলে কিছুটা হলেও সড়কে শৃঙ্খলা আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
সড়ক দুর্ঘটনায় রোধে মাঝে মধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয় থাকে, সেগুলো পর্যাপ্ত নয়। মহাসড়কে আরো নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন সচেতন মহল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কে সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালনেরও পরামর্শ সড়কপথে যাতায়াতকারী সাধারণ জনতার।
সম্প্রতি সিলেটে বিআরটিএ ও প্রশাসনে যৌথভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে রুট পারমিটহীন বাসগুলোকে জরিমানা করছে ঠিকই, তবে এতে দুর্ঘটনার লাগাম টানা যাচ্ছে না। সচেতন মহলের মতে, কেবল অর্থদণ্ড দিয়ে রক্তপাত থামানো সম্ভব নয়।
সড়ক বিশেষজ্ঞদের দাবি—অবৈধ স্লিপার বাস ও পারমিটহীন ডাবলডেকার চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো এবং মহাসড়কের সংস্কার কাজ দ্রুত শেষ না করলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে মৃত্যুর এই মিছিল থামানো যাবে না।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবিষয়ে মতামত জানান, সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড.মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশে বিগত কয়েক সপ্তাহ যাবত দুর্ঘটনার প্রাণহানি যে কোন ধরনের মহামারিকেও হার মানিয়েছে। এসব দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়; বরং সামগ্রিক সড়ক ব্যবস্থাপনার দায় এখানে রয়েছে। বেশিরভাগ দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে সকালের দিকে ফাঁকা রাস্তায়। এতে প্রমাণিত হয় এখানে চালকের অদক্ষতা রয়েছে। পরিবহন কর্তৃপক্ষ তাদের চালকদের বিশ্রামের বিষয়টি আমলে নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রতিদিন এত বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যায়, কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু কোন একটি দুর্ঘটনার বিচার আজ পর্যন্ত হলো না। ফলে সড়ক আজ মৃত্যুফাদে পরিণত। এতে উন্নয়নের সুফল প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক মনে করেন, ছয় লেন সড়ক প্রকল্প শেষ হলে দুর্ঘটনা কমে আসবে। এটা কখন শেষ হবে কেউ বলতে পারেন না।
তবে এ মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর তদারকি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও অদক্ষ চালক চিহ্নিতকরণ, সড়কের ত্রুটিসমূহ দূর করন,গণ পরিবহনের ত্রুটিপূর্ণ নকশা বিশেষ করে ডাবল ডেকার স্লিপিং বাস এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ কিছুটা সমাধান নিয়ে আসতে পারে।
লেখক- সম্পাদক ও প্রকাশক “অনলাইন সিলেট”।
আবদুল হক মামুন। 


















