
সকাল হওয়ার আগেই ভিড় জমে মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালের গেটে। কেউ হাতে স্যালাইনের বোতল ধরে দাঁড়িয়ে, কেউ স্ট্রেচারে শুয়ে, আবার কেউবা স্বজনের কাঁধে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন। সবার চোখে একটাই প্রশ্ন—আজ কি একটি বেড মিলবে? ভেতরে ঢুকলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাস্তবতা। ওয়ার্ডে জায়গা নেই, বেড নেই—তবুও রোগী আসা থেমে নেই। অনেকেই মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়ে আছেন, কেউ করিডোরে, কেউবা বারান্দায়। হাসপাতালের দেয়াল যেন প্রতিদিন শুনছে অসংখ্য মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
একজন বৃদ্ধ রোগীর ছেলে করিডোরে বসে বলেন,ডাক্তার দেখিয়েছি, ওষুধও দিয়েছে। কিন্তু বেড নেই। বাবাকে মেঝেতেই রাখতে হচ্ছে।
এই দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়—এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসক ও নার্সদের জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। সীমিত জনবল নিয়ে তাদের সামলাতে হচ্ছে অগণিত রোগী। একজন চিকিৎসকের কক্ষে একের পর এক রোগীর লাইন—সময় যেন এখানে সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য জিনিস।
একজন নার্সের কথায় ক্লান্তি স্পষ্ট,আমরা চেষ্টা করি সবাইকে সেবা দিতে, কিন্তু রোগী এত বেশি যে অনেক সময় ঠিকমতো সময় দেওয়া যায় না।
এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমান চাপ সামাল দিতে এটি আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি।
এর আগে হাসপাতালটিকে মেডিকেল কলেজে রূপান্তরের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান। পাশাপাশি ৪০০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রীর সঙ্গে সচিবালয়ে সাক্ষাৎ করে একটি ডিও লেটারও প্রদান করেন তিনি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগীর চাপ আরও বাড়ায় এখন সরাসরি ৫০০ শয্যার দাবি সামনে এসেছে।
সোমবার (৪ মে) দুপুরে এমপি নাসের রহমান হাসপাতালটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। হাসপাতালের প্রতিটি অংশ ঘুরে তিনি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসা সেবার ওপর বাড়তি চাপের বাস্তব চিত্র নিজ চোখে দেখেন।
পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। আলোচনায় উঠে আসে হাসপাতালটিকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতে মেডিকেল কলেজে রূপান্তরের পরিকল্পনাও। হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে এমপি নাসের রহমান বলেন, ইনশাআল্লাহ সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হবে।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মুজিবুর রহমান মজনু জানান, ২৫০ শয্যা থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পর্যালোচনা করা হয়েছে। পরিকল্পনায় রয়েছে পুরোনো তিনতলা ভবন ভেঙে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ১০ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাশ বলেন, ৪০০ শয্যার পরিবর্তে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা গেলে রোগীদের সেবা আরও কার্যকরভাবে দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, ২০২১ সালে হাসপাতালের এমআরআই মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সেটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সিটিস্ক্যান ও ডায়ালাইসিস সেবা চালু থাকলেও, ভবিষ্যতে সিসিইউ ও আইসিইউ স্থাপন এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও জেলা মহিলা দলের সভানেত্রী ডা. দিলশাদ পারভীন, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মুজিবুর রহমান মজনু, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার আহমেদ রহমানসহ অন্যান্যরা।
স্থানীয়দের ভাষায়, এই হাসপাতাল শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়—এটি পুরো জেলার স্বাস্থ্যসেবার প্রাণকেন্দ্র। তাই শয্যা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বদলে যেতে পারে পুরো অঞ্চলের চিকিৎসা সেবার চিত্র।
কিন্তু সেই পরিবর্তনের অপেক্ষায় এখনো করিডোরে বসে আছেন অসংখ্য মানুষ—একটি বেডের আশায়, আর একটু স্বস্তির প্রত্যাশায়।
আব্দুস সামাদ আজাদ, মৌলভীবাজার থেকে। 
















