
বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে যুক্তরাজ্যের ব্যস্ত নগরী লন্ডন। বহুজাতিক সংস্কৃতি,কঠিন প্রতিযোগিতা আর বৈচিত্র্যময় রাজনীতির শহরটিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা সহজ নয়। অথচ সেই কঠিন বাস্তবতাকে জয় করে একের পর এক সাফল্যের ইতিহাস লিখে চলেছেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মেয়ে সাবিনা আক্তার। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল নির্বাচনে স্টেপনি গ্রিন ওয়ার্ড থেকে টানা চতুর্থবারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি।
গত শনিবার (৯ মে) ঘোষিত নির্বাচনের ফলাফলে অ্যাসপায়ার পার্টির প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয় পান সাবিনা আক্তার। তার এ বিজয় শুধু একজন প্রার্থীর জয় নয়, বরং প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের সক্ষমতারও প্রতীক হয়ে উঠেছে।
মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নের ওসমানপুর গ্রামের সন্তান সাবিনা আক্তার ছোটবেলা থেকেই সামাজিক মূল্যবোধ ও জনসেবার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তার বাবা ফারুক উদ্দিন সুন্দর ছিলেন এলাকার পরিচিত সমাজসেবক। পরিবার থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেয়েছিলেন তিনি। সেই শিক্ষা পরবর্তীতে তাকে নিয়ে যায় ব্রিটিশ রাজনীতির মূলধারায়।
যুক্তরাজ্যে বসবাস শুরু করার পর ধীরে ধীরে স্থানীয় কমিউনিটি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন সাবিনা। বাংলাদেশি অভিবাসীদের নানা সমস্যা, বিশেষ করে প্রবীণদের একাকীত্ব, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করেন তিনি। স্থানীয় মানুষের সেই ভালোবাসাই তাকে রাজনীতির ময়দানে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সহায়তা করে।
প্রায় দুই দশক তিনি লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ ও সাংগঠনিক সক্ষমতার কারণে টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার গ্রুপের ডেপুটি লিডারের দায়িত্বও পালন করেন। পরে দলীয় মতপার্থক্যের কারণে তিনি অ্যাসপায়ার পার্টিতে যোগ দেন। রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করলেও মানুষের আস্থা থেকে একচুলও সরে যাননি তিনি। বরং নতুন দল থেকে নির্বাচন করেও বিজয়ী হয়ে প্রমাণ করেছেন—ব্যক্তির প্রতি মানুষের বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় শক্তি।
সাবিনা আক্তারের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় অর্জন আসে ২০১৭ সালে। সে সময় তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী স্পিকার নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ রাজনীতিতে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণের ইতিহাসে এটি ছিল এক মাইলফলক। বর্তমানে তিনি কাউন্সিলের স্বাস্থ্য, জনকল্যাণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক সেবাবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, বয়স্কদের সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে তার ভূমিকা প্রশংসিত।
তবে প্রবাসে সফল রাজনৈতিক পরিচয়ের মাঝেও নিজের শিকড় ভুলে যাননি সাবিনা আক্তার। কুলাউড়া ও বরমচালের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও মানবিক কার্যক্রমে নিয়মিত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। দেশে এলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশে যান। এলাকার মানুষও তাকে আপনজন হিসেবেই দেখেন।
তার এই টানা চতুর্থ বিজয় নতুন প্রজন্মের জন্যও এক অনুপ্রেরণার গল্প। প্রবাসে থেকেও সততা, পরিশ্রম ও জনসেবার মাধ্যমে যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করা যায়, সাবিনা আক্তার তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকেই মনে করছেন, সাবিনা আক্তারের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতারও প্রতিচ্ছবি। কুলাউড়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে লন্ডনের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করা এই নারীর গল্প তাই এখন অনেকের কাছেই গর্ব, অনুপ্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক।
আব্দুস সামাদ আজাদ, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি 















