
কোলাহলমুখর বাজার, মানুষের আনাগোনা, জীবনের ব্যস্ততা—সবকিছুর মাঝেই নীরবে লুকিয়ে ছিল এক বেদনাবিধুর ইতিহাস। মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ভবানীগঞ্জ বাজারের সেই গণকবর, যেখানে ১৯৭১ সালের শহীদদের নিঃশব্দ উপস্থিতি, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর অবশেষে পাচ্ছে সম্মানজনক সংরক্ষণ।
ভবানীগঞ্জ বাজারে গেলে প্রথমে চোখে পড়ে সাধারণ একটি জনপদ—দোকানপাট, ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়, প্রতিদিনের জীবনের চেনা ছন্দ। কিন্তু এই চেনা দৃশ্যের আড়ালেই রয়েছে এক অচেনা অতীত, যা রক্ত,কান্না আর আত্মত্যাগে ভরা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই এলাকাটি ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্মমতার এক ভয়ংকর সাক্ষী। স্থানীয়দের বর্ণনায় উঠে আসে—মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের স্বজনদের ধরে এনে নির্যাতন চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। পরে লাশগুলো ফেলে রাখা হতো কিংবা তড়িঘড়ি করে মাটিচাপা দেওয়া হতো এই স্থানেই স্বাধীনতার পর বহু বছর কেটে গেছে। প্রজন্ম বদলেছে,সময় বদলেছে। কিন্তু এই গণকবরটি রয়ে গেছে অবহেলায়, যেন ইতিহাসের এক নীরব অধ্যায়। মাঝেমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা এখানে এসে দাঁড়াতেন—কেউ খুঁজতেন হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের স্মৃতি, কেউ শুধু নিঃশব্দে প্রার্থনা করতেন।
একজন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, যুদ্ধ শেষে যখন তারা এলাকায় ফিরে আসেন, তখন এই স্থানে গিয়ে দেখেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মানুষের দেহাবশেষ, পোশাক আর অলংকারের চিহ্ন। সেই দৃশ্য আজও তাদের তাড়া করে বেড়ায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে সেই নীরবতার অবসান ঘটছে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হয়েছে গণকবর সংরক্ষণের কাজ। স্থানটি ঘিরে সীমানা নির্ধারণ, পরিচ্ছন্নতা এবং স্মৃতিচিহ্ন স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরিদর্শনে এসে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠু বলেন,এই গণকবর শুধু একটি স্থান নয়, এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে সত্য ইতিহাস জানতে পারে, সেজন্য এসব স্থান সংরক্ষণ জরুরি।
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, এটি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়—এটি শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধতা, ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা।
জুড়ী মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের এই স্থানটি এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে একটি স্মৃতিস্তম্ভে। যেখানে মানুষ শুধু দেখতেই আসবে না, অনুভব করতেও আসবে—একটি সময়, একটি সংগ্রাম, একটি ত্যাগের গল্প।
বুধবার (২৫ মার্চ) গণহত্যা দিবসে এই গণকবরের সংরক্ষণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে। দিনটি হয়ে উঠবে স্মরণ, উপলব্ধি আর প্রতিজ্ঞার দিন।
কারণ, একটি জাতির ইতিহাস শুধু বইয়ে লেখা থাকে না—তা লুকিয়ে থাকে মাটির গভীরে, মানুষের স্মৃতিতে, আর এমন নীরব গণকবরগুলোর মাঝে। সেই ইতিহাসকে তুলে ধরা, সংরক্ষণ করা—এটাই একটি জাতির প্রতি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
আব্দুস সামাদ আজাদ,মৌলভীবাজার থেকে। 


















