সিলেট ০৩:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
News Title :
ঝড়ের তাণ্ডবে নবীগঞ্জে জনদুর্ভোগ, গাছ পড়ে সড়ক বন্ধ, বিদ্যুৎ নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‎সিলেট ওসমানী মেডিকেলে বানিয়াচংয়ের কুখ্যাত দালাল চক্রের মুলহোতা আটক। ‎বানিয়াচংয়ে জমি নিয়ে বিরোধ: ভাইদের আহত প্রবাসীর মৃত্যু, ভাই ও ভাবি গ্রেপ্তার‎ ‎বানিয়াচংয়ে অকাল বন্যায় ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন: ফসল রক্ষায় লড়ছেন দিশেহারা কৃষক ‎সিলেটে ও সুনামগঞ্জে র‍্যাব-বিআরটিএ’র যৌথ অভিযান: ১১ চালককে জরিমানা, ৭টি সিএনজি জব্দ‎ ‎বাডসের বৈশাখী উৎসবে ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হকঃ‎আলোকিত সমাজ গঠনে শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চা অপরিহার্য জামালপুরে গ্রিন বিজনেস মডেলে ভুট্টা চাষের ফসল চাষ প্রদর্শনী ও কৃষক মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত প্রতিটি উপজেলায় হবে ‘মাল্টিপারপাস পরীক্ষা কেন্দ্র’: শিক্ষামন্ত্রী ‎ছাতকে বিজ্ঞান মেলা উদ্বোধন,ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনে মুখর মেলা প্রাঙ্গণ।‎ সিলেটে অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে মুক্তিপণ আদায়কারী ‘হানিট্র্যাপ’ চক্রের সদস্য গ্রেফতার

মৌলভীবাজার মাইন বিস্ফোরণ ট্র্যাজেডি, ২০ ডিসেম্বর আজও কাঁদায় স্বজন ও সহযোদ্ধাদের

শহীদবেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মুক্তিযোদ্ধাগণ



‎মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দাঁড়ালে এখনো বাতাসে যেন একটা নীরব হুহু শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। স্কুলের মাঠ, পুরোনো গাছগুলো, আর স্মৃতিস্তম্ভ, সবকিছু যেন সাক্ষী সেই বেদনার দিনের।
‎আজ ২০ ডিসেম্বর, মৌলভীবাজারের মানুষ এই দিনটিকে স্মরণ করেন গভীর শোক আর শ্রদ্ধায়। কারণ ঠিক আজকের দিনেই ১৯৭১ সালে এক মর্মান্তিক মাইন বিস্ফোরণে মুহূর্তে ঝরে যায় অর্ধ-শতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ।

‎৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মুক্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর পুরো দেশ। যুদ্ধ শেষে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত, বিজয়োল্লাসে ভরা মুক্তিযোদ্ধারা এসে জমা হয়েছিলেন মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপন করা হেড কোয়ার্টারে।
‎তাদের মনে তখন প্রশান্তির নিঃশ্বাস,যুদ্ধ শেষ, শত্রুমুক্ত দেশ, এখন শুধু ঘরে ফেরার অপেক্ষা।
‎কেউ বাড়ি যাবে মাকে দেখতে, কেউ পরিবারের জন্য আনবে বিজয়ের খবর, আর কেউ আবার ভাবছিলেন যুদ্ধের পর নতুন দিনের স্বপ্ন কেমন হবে। কিন্তু ভাগ্য হয়তো অন্য কোনো গল্প লিখে রেখেছিল।
‎২০ ডিসেম্বর দুপুরে ক্যাম্পে তখন খাবার বিশ্রাম আর গল্প-আড্ডার স্বাভাবিক পরিবেশ ছিল।
‎এমন সময় আচমকা বজ্রপাতের মতো শব্দ—একটি নয়, টানা কয়েকটি বিস্ফোরণ।
‎মাইন বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবন কেঁপে ওঠে, ধুলা-ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারদিক। ‎সেইকথা মনে করে আজও চোখ ভেজে প্রত্যক্ষদর্শীদের। কেউ ছুটি বাঁচাতে দৌড়েছিলেন, কেউ সমানে ডাকছিলেন সঙ্গীদের নাম ধরে-ভাই কোথায় আছেন…? কিন্তু উত্তর আর পাওয়া যায়নি অনেকের।

‎দেখা যায় ছিন্নভিন্ন দেহ, ছড়িয়ে থাকা পোশাক, ভাঙা অস্ত্র—স্বাধীনতার ঠিক পরেই এমন নির্মম মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো শহর।
‎ঘটনার পর স্বাধীনতার আনন্দে মেতে থাকা এ শহর ডুবে যায় শোকে। নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেহাবশেষ সংগ্রহ করে সমাহিত করা হয় স্কুল মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে।
‎সেই জায়গাটিতে এখন স্মৃতিস্তম্ভ—ঝরে পড়া একেকটি প্রাণ যেন পাথরের উপর খোদাই হয়ে আছে চিরদিনের মতো। যাদের নাম পাওয়া গেছে,সুলেমান মিয়া, রহিম বক্স খোকা, ইয়ানূর আলী, আছকর আলী, জহির মিয়া, ইব্রাহিম আলী, আব্দুল আজিজ, প্রদীপ চন্দ্র দাস, শিশির রঞ্জন দেব, সত্যেন্দ্র দাস, অরুণ দত্ত, দিলীপ দেব, সনাতন সিংহ, নন্দলাল বাউরী, সমীর চন্দ্র সোম, কাজল পাল, হিমাংশু কর, জিতেশ চন্দ্র দেব, আব্দুল আলী, নূরুল ইসলাম, মোস্তফা কামাল, আশুতোষ দেব, তরণী দেব ও নরেশ চন্দ্র ধর। কিন্তু ইতিহাস বলে,নিহত হয়েছিলেন অর্ধ-শতাধিক। বাকিদের নাম হয়তো মুক্তিযুদ্ধের অস্থিরতার ভিড়ে হারিয়ে গেছে চিরতরে।


‎তারপর থেকে মৌলভীবাজারবাসী ২০ ডিসেম্বরকে স্থানীয় শহীদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন।
‎প্রতিবছর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্যরা এবং সাধারণ মানুষ স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দেন।
‎তরুণদের চোখে দেখা যায় বিস্ময়, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও এমন বিপর্যয় কেন ঘটেছিল?
‎প্রবীণদের চোখে দেখা যায় দীর্ঘশ্বাস, একদল বিজয়ী বীর ঘরে ফিরতে পারেননি আর কোনোদিন।
‎স্মৃতিস্তম্ভে ভাসে এক অমোঘ বার্তা স্কুল মাঠের সেই প্রান্তে দাঁড়ালে মনে হয়,স্বাধীনতা শুধু ডিসেম্বরের উৎসব নয়, তা বহন করে অপূর্ণ স্বপ্নের কান্না, ত্যাগ আর রক্তের গল্পও। যে গল্পের এক অংশ রচিত হয়েছিল।
‎আজ ২০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারে ৫৩ বছর পরও, সেই বিস্ফোরণের শব্দ যেন নীরবে বলে যায়, স্বাধীনতার দাম শুধু নয় এর দায়িত্বও আমাদের।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝড়ের তাণ্ডবে নবীগঞ্জে জনদুর্ভোগ, গাছ পড়ে সড়ক বন্ধ, বিদ্যুৎ নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা

মৌলভীবাজার মাইন বিস্ফোরণ ট্র্যাজেডি, ২০ ডিসেম্বর আজও কাঁদায় স্বজন ও সহযোদ্ধাদের

সময় ০২:১৭:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫

শহীদবেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মুক্তিযোদ্ধাগণ



‎মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দাঁড়ালে এখনো বাতাসে যেন একটা নীরব হুহু শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। স্কুলের মাঠ, পুরোনো গাছগুলো, আর স্মৃতিস্তম্ভ, সবকিছু যেন সাক্ষী সেই বেদনার দিনের।
‎আজ ২০ ডিসেম্বর, মৌলভীবাজারের মানুষ এই দিনটিকে স্মরণ করেন গভীর শোক আর শ্রদ্ধায়। কারণ ঠিক আজকের দিনেই ১৯৭১ সালে এক মর্মান্তিক মাইন বিস্ফোরণে মুহূর্তে ঝরে যায় অর্ধ-শতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ।

‎৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মুক্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর পুরো দেশ। যুদ্ধ শেষে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত, বিজয়োল্লাসে ভরা মুক্তিযোদ্ধারা এসে জমা হয়েছিলেন মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপন করা হেড কোয়ার্টারে।
‎তাদের মনে তখন প্রশান্তির নিঃশ্বাস,যুদ্ধ শেষ, শত্রুমুক্ত দেশ, এখন শুধু ঘরে ফেরার অপেক্ষা।
‎কেউ বাড়ি যাবে মাকে দেখতে, কেউ পরিবারের জন্য আনবে বিজয়ের খবর, আর কেউ আবার ভাবছিলেন যুদ্ধের পর নতুন দিনের স্বপ্ন কেমন হবে। কিন্তু ভাগ্য হয়তো অন্য কোনো গল্প লিখে রেখেছিল।
‎২০ ডিসেম্বর দুপুরে ক্যাম্পে তখন খাবার বিশ্রাম আর গল্প-আড্ডার স্বাভাবিক পরিবেশ ছিল।
‎এমন সময় আচমকা বজ্রপাতের মতো শব্দ—একটি নয়, টানা কয়েকটি বিস্ফোরণ।
‎মাইন বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবন কেঁপে ওঠে, ধুলা-ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারদিক। ‎সেইকথা মনে করে আজও চোখ ভেজে প্রত্যক্ষদর্শীদের। কেউ ছুটি বাঁচাতে দৌড়েছিলেন, কেউ সমানে ডাকছিলেন সঙ্গীদের নাম ধরে-ভাই কোথায় আছেন…? কিন্তু উত্তর আর পাওয়া যায়নি অনেকের।

‎দেখা যায় ছিন্নভিন্ন দেহ, ছড়িয়ে থাকা পোশাক, ভাঙা অস্ত্র—স্বাধীনতার ঠিক পরেই এমন নির্মম মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো শহর।
‎ঘটনার পর স্বাধীনতার আনন্দে মেতে থাকা এ শহর ডুবে যায় শোকে। নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেহাবশেষ সংগ্রহ করে সমাহিত করা হয় স্কুল মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে।
‎সেই জায়গাটিতে এখন স্মৃতিস্তম্ভ—ঝরে পড়া একেকটি প্রাণ যেন পাথরের উপর খোদাই হয়ে আছে চিরদিনের মতো। যাদের নাম পাওয়া গেছে,সুলেমান মিয়া, রহিম বক্স খোকা, ইয়ানূর আলী, আছকর আলী, জহির মিয়া, ইব্রাহিম আলী, আব্দুল আজিজ, প্রদীপ চন্দ্র দাস, শিশির রঞ্জন দেব, সত্যেন্দ্র দাস, অরুণ দত্ত, দিলীপ দেব, সনাতন সিংহ, নন্দলাল বাউরী, সমীর চন্দ্র সোম, কাজল পাল, হিমাংশু কর, জিতেশ চন্দ্র দেব, আব্দুল আলী, নূরুল ইসলাম, মোস্তফা কামাল, আশুতোষ দেব, তরণী দেব ও নরেশ চন্দ্র ধর। কিন্তু ইতিহাস বলে,নিহত হয়েছিলেন অর্ধ-শতাধিক। বাকিদের নাম হয়তো মুক্তিযুদ্ধের অস্থিরতার ভিড়ে হারিয়ে গেছে চিরতরে।


‎তারপর থেকে মৌলভীবাজারবাসী ২০ ডিসেম্বরকে স্থানীয় শহীদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন।
‎প্রতিবছর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্যরা এবং সাধারণ মানুষ স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দেন।
‎তরুণদের চোখে দেখা যায় বিস্ময়, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও এমন বিপর্যয় কেন ঘটেছিল?
‎প্রবীণদের চোখে দেখা যায় দীর্ঘশ্বাস, একদল বিজয়ী বীর ঘরে ফিরতে পারেননি আর কোনোদিন।
‎স্মৃতিস্তম্ভে ভাসে এক অমোঘ বার্তা স্কুল মাঠের সেই প্রান্তে দাঁড়ালে মনে হয়,স্বাধীনতা শুধু ডিসেম্বরের উৎসব নয়, তা বহন করে অপূর্ণ স্বপ্নের কান্না, ত্যাগ আর রক্তের গল্পও। যে গল্পের এক অংশ রচিত হয়েছিল।
‎আজ ২০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারে ৫৩ বছর পরও, সেই বিস্ফোরণের শব্দ যেন নীরবে বলে যায়, স্বাধীনতার দাম শুধু নয় এর দায়িত্বও আমাদের।