সিলেট ০৫:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
News Title :
‎টাঙ্গাইলে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস–২০২৬’ প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত ‎জুড়ীতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু ‎গোয়াইনঘাটে ৭১ বোতল বিদেশি মদসহ বাবা-ছেলে গ্রেফতার হবিগঞ্জে ভুল প্রশ্নে দাখিল পরীক্ষা, পরে ধরা পড়ল ১০০ খাতা জব্দ, দায়িত্ব হারালেন ৩ কর্মকর্তা ‎মাধবপুরে ডিবি পুলিশের অভিযানে ১২৯ কেজি গাঁজা উদ্ধার, নারী গ্রেপ্তার ‎শেরপুর সেতুতে ৩৬ ঘণ্টা যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ভোগান্তির আশঙ্কা ‎বিয়ানীবাজার থেকে ৩ এসএসসি-দাখিল পরীক্ষার্থী ছাত্রী উধাও টাঙ্গাইলে র‍্যাবের অভিযানে ৯৬৫ পিস ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার এতিমখানার নামে চাঁদাবাজি: বানিয়াচংয়ে জনতার হাতে ধরা ‘টিকটকার’ ভণ্ড প্রতারক! বানিয়াচংয়ে ভাতিজার হাতে চাচা খুন: মামলায় স্বচ্ছতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন

‎মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির বর্ষ বিদায়,‎নতুন বছরের বরণের প্রস্তুতি।‎

বর্ণিল সাজে খাসিয়া জনগোষ্ঠী শিল্পীরা





‎ভোরের প্রথম আলোটা যখন মাগুরছড়া পুঞ্জির মাথায় নরমভাবে পড়ছিল, তখনও পুরো এলাকা ছিল শান্ত; হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা।
‎কিন্তু একটু একটু করে যখন পাহাড়ি বাতাসে ঢোলের তাল ভেসে আসতে শুরু করল, মনে হলো—জেগে উঠছে খাসিয়া পুঞ্জি।
‎পাহাড়, গাছ, পথ—সবকিছু যেন বুঝতে পারছিল, আজ বিশেষ কিছু ঘটতে যাচ্ছে।

‎আজ বর্ষ বিদায়। খাসিয়া সম্প্রদায়ের ১২৫ বছরের পুরোনো এক বাঁক—আর নতুন বছরের প্রথম আলোকে বরণের প্রস্তুতি।

‎পুঞ্জির সরু, বাঁকানো পথগুলোয় দেখা গেল শিশুদের খিলখিল হাসি। তাদের হাতে রঙিন কাপড়, কাগজে মোড়ানো ছোট সাজসজ্জা। নারীরা নদীর ধারে বসে চুল বেঁধে নিচ্ছেন, ঐতিহ্যবাহী গয়নাগুলো একে একে সাজাচ্ছেন শরীরে। তাঁদের পোশাকের লাল–হলুদ–সবুজ রঙ যেন সকালবেলার আলোকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছিল।



‎একদম ভিতরে, পাহাড়ের ঢালঘেঁষা উঠোনে শুরু হলো তরুণীদের নাচের মহড়া। তাদের পায়ের মৃদু নড়াচড়া, হাতে ফিতে বাঁধা চুড়ির টুংটাং শব্দ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুর বাজছিল।

‎মঞ্চ নয়, কোনো বিশেষ সাজানো অডিটোরিয়াম নয়—খোলা মাঠ, সামনে গাছের সারি, আর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। এখানেই শুরু হলো খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী নাচ। পুরুষরা ঢোল বাজাচ্ছেন দুই পাশে দাঁড়িয়ে। নাচের গতিতে কখনো ঝিরিঝিরি বাতাসের মতো মৃদু দোলা, কখনো পাহাড়ি ঝর্নার মতো প্রবাহমান ছন্দ।

‎এই নাচ শুধু আনন্দের নয়; এটি ইতিহাস।
‎নাচে ফুটে উঠছে জুম চাষের পরিশ্রম—কখন পাহাড় কেটে জমি তৈরি, কখন ফসলের অপেক্ষা, কখন রোদ-বৃষ্টি সামলে কাটানো দিনগুলো। নৃত্যশিল্পীদের পদভঙ্গিতে যেন চেনা যায় প্রতিটি ঋতুর রঙ।

‎পুঞ্জির কেন্দ্রীয় জায়গায় বসেছে এক ছোট্ট কিন্তু প্রাণবন্ত মেলা। বাঁশ-বেতের গন্ধ যেন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। কাছে গেলে দেখা যায়, রঙিন স্টলগুলোয় সাজানো রয়েছে খাসিয়াদের নিজস্ব পোশাক, পানের গুচ্ছ, হাতে বানানো তীর–ধনুক, আর নানা পাহাড়ি খাবার। এক বৃদ্ধা মাটির হাঁড়িতে গরম ঝাল ঝোল রান্না করছিলেন—তার গন্ধে থমকে দাঁড়াচ্ছে দর্শনার্থীরা।

‎বাঙালি পরিবার, বিদেশি পর্যটক, স্থানীয় তরুণ—সবার ভিড়ে পুঞ্জি যেন হয়ে উঠল এক দিনের জন্য সংস্কৃতির মিলনমেলা। এক পর্যটক বিস্ময়ে বললেন, এখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, সময়ের পাতা পিছনে ফিরে গেছে। সবই যেন প্রাচীন অথচ জীবন্ত।

‎সন্ধ্যার আগমুহূর্তে যখন সূর্যের শেষ আলো পাহাড়ের গায়ে পড়ে সোনালি আভা ছড়াচ্ছিল, তখন মান্ত্রী জিডিশন প্রধান সুছিয়াং দাঁড়িয়ে ছিলেন মঞ্চের পাশে। তাঁর চোখে ঝিলিক খুশির, গলায় এক ধরনের স্নিগ্ধ সন্তুষ্টি।
‎তিনি বললেন,বছরের এই দিনটি আমাদের জন্য শুধু উৎসব নয়। এটি আমাদের শিকড়, আমাদের গর্ব। আজ বাঙালি, বিদেশি সবাই এসে আমাদের সঙ্গে নাচছে—এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে?

‎দিনের শেষে যখন ঢোলের শেষ তালে নাচ থামল, তখনও মানুষের ভিড় কমেনি। চারদিকে আলো ঝলমল করছে, কেউ খাবার খাচ্ছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ আবার আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। ধীরে ধীরে রাত নেমে এলো। কিন্তু সেই রাত কোনো সাধারণ রাত নয়—এটি এক বছরের বিদায় আর নতুন বছরের দুয়ার। মনে হচ্ছিল, পাহাড়ের নিস্তব্ধতা মাঝে মাঝে ঢোলের প্রতিধ্বনিতে সাড়া দিচ্ছে,বিদায় পুরোনো বছর, এসো নতুন আলো।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‎টাঙ্গাইলে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস–২০২৬’ প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত

‎মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির বর্ষ বিদায়,‎নতুন বছরের বরণের প্রস্তুতি।‎

সময় ০৭:৩৩:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫

বর্ণিল সাজে খাসিয়া জনগোষ্ঠী শিল্পীরা





‎ভোরের প্রথম আলোটা যখন মাগুরছড়া পুঞ্জির মাথায় নরমভাবে পড়ছিল, তখনও পুরো এলাকা ছিল শান্ত; হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা।
‎কিন্তু একটু একটু করে যখন পাহাড়ি বাতাসে ঢোলের তাল ভেসে আসতে শুরু করল, মনে হলো—জেগে উঠছে খাসিয়া পুঞ্জি।
‎পাহাড়, গাছ, পথ—সবকিছু যেন বুঝতে পারছিল, আজ বিশেষ কিছু ঘটতে যাচ্ছে।

‎আজ বর্ষ বিদায়। খাসিয়া সম্প্রদায়ের ১২৫ বছরের পুরোনো এক বাঁক—আর নতুন বছরের প্রথম আলোকে বরণের প্রস্তুতি।

‎পুঞ্জির সরু, বাঁকানো পথগুলোয় দেখা গেল শিশুদের খিলখিল হাসি। তাদের হাতে রঙিন কাপড়, কাগজে মোড়ানো ছোট সাজসজ্জা। নারীরা নদীর ধারে বসে চুল বেঁধে নিচ্ছেন, ঐতিহ্যবাহী গয়নাগুলো একে একে সাজাচ্ছেন শরীরে। তাঁদের পোশাকের লাল–হলুদ–সবুজ রঙ যেন সকালবেলার আলোকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছিল।



‎একদম ভিতরে, পাহাড়ের ঢালঘেঁষা উঠোনে শুরু হলো তরুণীদের নাচের মহড়া। তাদের পায়ের মৃদু নড়াচড়া, হাতে ফিতে বাঁধা চুড়ির টুংটাং শব্দ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুর বাজছিল।

‎মঞ্চ নয়, কোনো বিশেষ সাজানো অডিটোরিয়াম নয়—খোলা মাঠ, সামনে গাছের সারি, আর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। এখানেই শুরু হলো খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী নাচ। পুরুষরা ঢোল বাজাচ্ছেন দুই পাশে দাঁড়িয়ে। নাচের গতিতে কখনো ঝিরিঝিরি বাতাসের মতো মৃদু দোলা, কখনো পাহাড়ি ঝর্নার মতো প্রবাহমান ছন্দ।

‎এই নাচ শুধু আনন্দের নয়; এটি ইতিহাস।
‎নাচে ফুটে উঠছে জুম চাষের পরিশ্রম—কখন পাহাড় কেটে জমি তৈরি, কখন ফসলের অপেক্ষা, কখন রোদ-বৃষ্টি সামলে কাটানো দিনগুলো। নৃত্যশিল্পীদের পদভঙ্গিতে যেন চেনা যায় প্রতিটি ঋতুর রঙ।

‎পুঞ্জির কেন্দ্রীয় জায়গায় বসেছে এক ছোট্ট কিন্তু প্রাণবন্ত মেলা। বাঁশ-বেতের গন্ধ যেন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। কাছে গেলে দেখা যায়, রঙিন স্টলগুলোয় সাজানো রয়েছে খাসিয়াদের নিজস্ব পোশাক, পানের গুচ্ছ, হাতে বানানো তীর–ধনুক, আর নানা পাহাড়ি খাবার। এক বৃদ্ধা মাটির হাঁড়িতে গরম ঝাল ঝোল রান্না করছিলেন—তার গন্ধে থমকে দাঁড়াচ্ছে দর্শনার্থীরা।

‎বাঙালি পরিবার, বিদেশি পর্যটক, স্থানীয় তরুণ—সবার ভিড়ে পুঞ্জি যেন হয়ে উঠল এক দিনের জন্য সংস্কৃতির মিলনমেলা। এক পর্যটক বিস্ময়ে বললেন, এখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, সময়ের পাতা পিছনে ফিরে গেছে। সবই যেন প্রাচীন অথচ জীবন্ত।

‎সন্ধ্যার আগমুহূর্তে যখন সূর্যের শেষ আলো পাহাড়ের গায়ে পড়ে সোনালি আভা ছড়াচ্ছিল, তখন মান্ত্রী জিডিশন প্রধান সুছিয়াং দাঁড়িয়ে ছিলেন মঞ্চের পাশে। তাঁর চোখে ঝিলিক খুশির, গলায় এক ধরনের স্নিগ্ধ সন্তুষ্টি।
‎তিনি বললেন,বছরের এই দিনটি আমাদের জন্য শুধু উৎসব নয়। এটি আমাদের শিকড়, আমাদের গর্ব। আজ বাঙালি, বিদেশি সবাই এসে আমাদের সঙ্গে নাচছে—এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে?

‎দিনের শেষে যখন ঢোলের শেষ তালে নাচ থামল, তখনও মানুষের ভিড় কমেনি। চারদিকে আলো ঝলমল করছে, কেউ খাবার খাচ্ছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ আবার আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। ধীরে ধীরে রাত নেমে এলো। কিন্তু সেই রাত কোনো সাধারণ রাত নয়—এটি এক বছরের বিদায় আর নতুন বছরের দুয়ার। মনে হচ্ছিল, পাহাড়ের নিস্তব্ধতা মাঝে মাঝে ঢোলের প্রতিধ্বনিতে সাড়া দিচ্ছে,বিদায় পুরোনো বছর, এসো নতুন আলো।