
পূর্ণিমার আলো যেন সাদা শালুচাদর বিছিয়ে দিয়েছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে।
পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে দূর থেকে ভেসে আসছে মণিপুরি মৃদঙ্গ, বাঁশি আর কণ্ঠসুরের তান।
শত বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে আবারও শুরু হয়েছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব-শ্রীকৃষ্ণের মহারাসলীলা।
এই জনপদে একবার পা রাখলেই বোঝা যায়, উৎসব কাকে বলে। মানুষের মুখে হাসি, চোখে উচ্ছ্বাস, আর চারপাশে রঙিন পোশাকের ঢেউ-সব মিলিয়ে কমলগঞ্জ যেন এক ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক আবেশে নিমজ্জিত।
মাধবপুরে প্রথম মহারাস উৎসব হয়েছিল ১৮৪২ সালে। তারপর থেকে প্রতিবছর কার্তিকের পূর্ণিমা রাত এলেই মণিপুরি সমাজ মাতোয়ারা হয়ে ওঠে শ্রীকৃষ্ণের প্রেমলীলা স্মরণে।
একসময় বাঁশের আলো, ডিমের প্রদীপ আর কাঁসার পাত্রে ভেসে উঠত নীলাভ আলো। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু মণিপুরিদের হৃদয়ে এই রাসোৎসব আজও একই ভক্তি আর নিষ্ঠায় ধরে রেখেছে পুরোনো দিনের রুপ।
বুধবার(৫ নভেম্বর) সকাল থেকেই মাধবপুর শিববাজারের জোড়া মন্দির আর আদমপুর মণিপুরি কালচারাল কমপ্লেক্সে মানুষের ঢল নামে। দুপুরে শুরু হওয়া গোষ্ঠলীলা বা রাখালনৃত্য যেন দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় কৃষ্ণের শৈশব স্মৃতির বৃন্দাবনে।
রাত নামতেই শুরু হয় রাসনৃত্য—যেখানে লাল-সবুজ-সাদা পোশাকে সজ্জিত মণিপুরি নারীরা নৃত্যে তুলে ধরেন রাধা-কৃষ্ণের দোলায়িত প্রেমকাহিনি।চাঁদের আলোয় ভেসে ওঠা সেই নৃত্যমঞ্চে যখন শুরু হয় মহারাস, তখন দর্শক-ভক্তরা নীরব হয়ে তাকিয়ে থাকে এক অনন্ত মুগ্ধতায়।
প্রায় ৫০ জন গোপী, রাধা আর শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকা পালনকারীরা এক ছন্দে, এক আবেগে নেচে ওঠেন রাতভর।এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয় না—এটি শুধুই একটি উৎসব। মনে হয় যেন ভক্তিময় কোনো আধ্যাত্মিক অভিসারে অংশ নিচ্ছে সমগ্র জনপদ।
উৎসব উপলক্ষে মাধবপুর ও আদমপুর—দুই স্থানেই বসেছে রঙিন মেলা। হরেক রকম মণিপুরি পোশাক, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার আর শিশুদের খেলনা—সব মিলিয়ে এই মেলাগুলো যেন উৎসবের প্রাণ। দেশি-বিদেশি পর্যটক, গবেষক, চিত্রশিল্পী, লেখক-যে যার মতো করে খুঁজে নিচ্ছেন মণিপুরি ঐতিহ্যের রং।
উৎসব কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্যামা কান্ত সিংহ বললেন—তিন স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব—সবাই মাঠে আছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাখন চন্দ্র সূত্রধর মনে করিয়ে দেন উৎসবের মূল দর্শন-ভক্তি, সৌন্দর্য আর সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে মহারাস এখন আর কেবল মণিপুরিদের নয়—সবার উৎসব।
চাঁদের আলো, বাঁশির সুর, গোপীদের নৃত্যভঙ্গি, দর্শকের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে পূর্ণিমার রাতটি যেন এক শিল্পময় অধ্যায়। যে কেউ এই রাত দেখলে বুঝবে-ঐতিহ্য শুধু ইতিহাসের পাতায় থাকে না, মানুষের হৃদয়ে থেকেও বেঁচে থাকে। আর সেই বেঁচে থাকার সবচেয়ে মোহময় উদাহরণ—কমলগঞ্জের শ্রীকৃষ্ণের মহারাসলীলা।
আব্দুস সামাদ আজাদ,মৌলভীবাজার 


















