আব্দুল হক মামুন

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা বরাবরই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানে মুসলমান, হিন্দুসহ সব ধর্মের মানুষ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে একে অপরের বাড়িতে অংশগ্রহণ এখানকার সম্পর্কের মূল ভিত্তি।
সম্প্রতি এই সম্প্রীতি বিনষ্ট করার একটি অপচেষ্টা করা হয়েছিল। পাপন চন্দ্র গোপ নামে এক কলেজ শিক্ষার্থীর ফেসবুক আইডি থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-কে নিয়ে কটূক্তি করে একটি উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়া হয়। এতে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনে গভীর আঘাত লাগে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই বানিয়াচংয়ের আলেম-উলামাগণ তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেন। তাদের দ্রুত পদক্ষেপের ফলে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন। তদন্তে দ্রুতই বেরিয়ে আসে যে, পাপনের নামে একটি ফেইক আইডি তৈরি করে এই বিদ্বেষপূর্ণ পোস্টটি করা হয়েছিল।
প্রশাসন এবং স্থানীয় লোকজন উভয়েই বুঝতে পারে যে এটি ছিল একটি চক্রান্ত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বানিয়াচং থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে পাপন এবং তার পরিবারকে হেফাজতে নেয়। পাপন গোপ নিজে তার মূল ফেসবুক আইডি থেকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং সবাইকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান। তিনি দ্রুত সেই ফেইক আইডির বিরুদ্ধে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে পুলিশ পাপনকে তার পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেয়।
এই ঘটনায় বানিয়াচংয়ের সাধারণ মানুষ পাপনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই পাপনকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এই ধরনের ষড়যন্ত্রের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, বানিয়াচংয়ের মানুষ কোনো ধরনের উস্কানি বা গুজবকে প্রশ্রয় না দিয়ে বরং সম্প্রীতি রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর।
এ ঘটনা নিয়ে বানিয়াচংয়ের বিভিন্ন শ্রেণি পেশায় মানুষ এই বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক পক্ষে বিপক্ষে মতামত তুলে ধরেন।
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে বদরুল সুমন লিখেন..
”গুজব থেকে নিজে বাঁচুন অন্যকেও রক্ষা করুন”
“আলহামদুলিল্লাহ“। বানিয়াচং পাপন চন্দ্র গোপ নামক আইডি থেকে সাম্প্রদায়িক উস্কানি পোস্ট করা হয়েছিল – তৌহিদি জনতা বুঝে গেছে এটা আসল আইডি নয়,জাগ্রত জনতা এখন জাগ্রত! আগের দিন বাঘে খাইছে। নাটক সাজিয়ে কোনো লাভ নেই।
আমাদের নবীজি অত্যান্ত ধৈয্যশীল ছিলেন। আমরা ধীরে ধীরে ধৈর্য্যধারণ ধরতে শিখে গেছি। ইনশাআল্লাহ- আমাদের আর দাবিয়ে রাখা যাবে না।
*সামাজিক ব্যক্তিত্ব কবি সৈয়দ মিজান পলাশ তার ফেসবুক আইডিতে লিখেন..
”সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চারণভূমি, আত্মার আত্মীয় আমাদের সকলের প্রিয় বানিয়াচংকে যে বা যারা ধর্মীয় উস্কানি দিয়ে কলংকিত করতে চায়, তাদের জেনে রাখা উচিত এটা বানিয়াচং। এখানে মাত্র একটি পরিখা যার নাম গড়ের খাল যেমন পুরো বানিয়াচংকে বেষ্টিত করে রেখেছে, তেমনি করে এ মহাগ্রামের সংখ্যাগুরু মুসলিম সম্প্রদায় ও এখানকার সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তার দুই হাত প্রসারিত করে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় রেখেছে আলহামদুলিল্লাহ। সুতরাং বড় বাজারের ব্যবসায়ী, সকলের পরিচিত মুখ পাপন চন্দ্র গোপের নামে ফেইক ফেসবুক আইডি খুলে যে ধর্মীয় উস্কানি দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে, তা বিপরীত বুমেরাং হবে ইনশাআল্লাহ! আশা করি বানিয়াচং থানা প্রশাসন খুব দ্রুতই প্রকৃত কালপ্রিটকে সনাক্ত করতে সক্ষম হবেন ইনশা”আল্লাহ!
আমি ধন্যবাদ জানাই আমাদের বানিয়াচং সহ আশপাশের সকল বিশ্বাসী ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনতাকে এবং বিশেষ করে উপজেলা তাবলীগ জামাতের আমীর ছোট ভাই মাওলানা মুনতাসির আলম সোহানকে যিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সহিত এ পর্যন্ত উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলা করে আসছেন।
আজকের মতো ভবিষ্যতে ও যেনো আমরা মুসলিম, হিন্দু উভয় পক্ষই এ ধরনের কোন ট্র্যাপে না পড়ে ঘটনার যথাযথ সত্যতা যাচাই করে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখি, সে প্রত্যাশা করছি।
এদেশ আমার, আপনার, সকলের। অবশ্যই আমরা একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং প্রত্যেকে প্রত্যেকের ধর্মের প্রতি যেমন শ্রদ্ধাশীল, তেমনি একে অন্যের ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধা ও সহানুভূতিশীল।
ভালো থাকুক বাংলাদেশ, ভালো থাকুক বানিয়াচং
*বানিয়াচং উপজেলার কৃতি সন্তান ও হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মেধাবী মুখ
নুরুল হুদা আফজল লিখেন…
দীর্ঘসময় ফেইসবুকে নজর দিতে না পারায় এখন দেখলাম বানিয়াচংয়ে আমাদের প্রিয়নবী বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ(সঃ)কে নিয়ে কুটুক্তি করে বানিয়াচং আইডিয়াল কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আমার ছাত্র পাপন চন্দ্র গোপ ( Papon Chandro Gope) এর নামে অন্য একটি ফেইসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট করা হয়েছিল। পাপন সাথে সাথেই বিষয়টি দেখে তাৎক্ষণিক তার বক্তব্য দিয়েছে যে, তার আইডি হ্যাক করে কিংবা তার নাম ব্যবহার করে কোন না কোন ষড়যন্ত্রকারী, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার হীন চিন্তায় এবং পাপনকে ফাঁসানোর জন্য এমনটা করেছে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে পাপনকে খুব ভালো করেই চিনি। আমার বিশ্বাস তীব্রভাবেই বলে পাপন এমনটা করার কথা না, তাকে ফাঁসানোর অপচেষ্টা করছে ষড়যন্ত্র কারীরা তবে বিষয়টি সকলের দৃষ্টি গোচর হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রতিবাদ। আলহামদুলিল্লাহ। বানিয়াচং উপজেলার সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাইয়েরা সবাই ধৈর্যের সাথে বিষয়টি মোকাবেলা করেছেন।
পরবর্তীতে থানা হেফাজতে রাখা হয় পাপন কে প্রশাসনের মাধ্যমে।এটাও খুবই ইতিবাচক দিক এবং তার নিরাপত্তার জন্য এটি খুবই প্রয়োজন ও ছিল।
সর্বশেষ বানিয়াচং উপজেলার বিশিষ্ট মুরব্বিয়ান,আলেম উলামাগণ বানিয়াচং থানার অফিসার ইনচার্জের সাথে আলোচনায় বসে প্রশাসনের মাধ্যমে আপাতত নিশ্চিত হন যে এটি পাপনের আইডি হ্যাক করে কেউ না কেউ এই কাজ টি করেছে।তাই পাপন কে তার পরিবারের হেফাজতে ফেরত দেয়া হয়েছে এবং প্রশাসনকে জোড় দাবি জানানো হয়েছে মূল অপরাধীকে যেকোন মূল্যে বের করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য। আলহামদুলিল্লাহ।এমনটাই হওয়া উচিৎ ছিল। তবে প্রশাসনের কাছে আমি এই আহবান রাখবো যে, যে কোন মূল্যে অতি দ্রুত মূল অপরাধীকে খুজে বের করুন-গ্রেফতার করুন।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা,আমাদের প্রিয় নবী বিশ্বনবী(সঃ)কে নিয়ে কুটুক্তি করার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধের চূড়ান্ত শাস্তি নিশ্চিত করনে ভূমিকা পালন করুন। অন্যথায় বানিয়াচং এর আপামর জনসাধারণ এর বিরুদ্ধে ফুসে উঠবে।
*স্বেচ্ছা সেবক দলের আহ্বায়ক ইয়াজ উদ্দিন রাসেল লিখেন…
বানিয়াচংয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও শান্ত পরিবেশ উত্তপ্ত করতে ফেইক আইডি ব্যবহার করে কোন এক কুলাঙ্গার আমাদের ধর্মীয় অনুভূতির সব চাইতে স্পর্শকাতর জায়গায় আঘাত করছে।
আমি প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ফেইক আইডির কুলাঙ্গারকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য।
আমি বানিয়াচং এর মুসলমান ভাইদেরকে অনুরোধ করছি হুজুগে নয় খুব ঠান্ডা মাথায় এগুলো মোকাবিলা করতে হবে,কোন মব সৃষ্টি করা যাবেনা বানিয়াচংয়ের মাটিতে।
এছাড়াও বানিয়াচংয়ের বিভিন্ন শ্রেণি পেশায় মানুষ এই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক পক্ষে বিপক্ষে মতামত তুলে ধরেন।
আহমেদ তাজ নামের একজন লিখেন…
প্রিয় বানিয়াচংবাসী আপনারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বানিয়াচংকে কোন ষড়যন্ত্রকারীর উস্কানিতে অস্থিতিশীল হতে দিবেন না দয়া করে,সঠিক তদন্তের মাধ্যমে অবশ্যই সত্যটা বেড়িয়ে আসবে।
পাপনকে আমি যতদূর জানি ও খুবই শান্ত এবং ভদ্র একটা ছেলে,ও যে হিন্দু এইটাই আমি আজকে জানলাম,কারণ দেখা হলে সব সময় সুন্দর করে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করতো ”ভাই কেমন আছেন”?
ঘটনার সঠিক তদন্ত হোক অতিদ্রুত। দোষীর শাস্তি অবশ্যই হওয়া দরকার।
মন্তব্য প্রতিবেদন । 















