সিলেট ০৪:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
News Title :
হবিগঞ্জে বিয়ের প্রলোভনে কিশোরীকে ধর্ষণ: পলাতক আসামি সিলেট থেকে গ্রেফতার করল র‍্যাব। হবিগঞ্জে এনসিপির গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ, সারজিসসহ আহত কয়েকজন নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত দলিল নেই, তবুও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূমিদাতা পাতন বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্যোগে কৃতি শিক্ষার্থী সম্মাননা ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ সম্পন্ন ‎সিলেটে হাইড্রোলিক হর্ন ও পরিবেশ আইন লঙ্ঘনে ১০ গাড়ির মালিককে জরিমানা নবীগঞ্জে আম গাছে থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় যুবকের মরদেহ উদ্ধার‎ ‘নেলসন ম্যান্ডেলা পিস অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ পেলেন কাজী মোহাম্মদ জমিরুল ইসলাম মমতাজ‎ ‎৪৫০ শিক্ষার্থীর একমাত্র ভরসা গুচ্ছগ্রাম বিদ্যালয়; পরিদর্শনে প্রতিমন্ত্রীর সহযোগিতার আশ্বাস গ্রাম পুলিশের বেতন বৃদ্ধি ও চাকরি জাতীয়করণের দাবি
‎বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে..

‎৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের লাল-সবুজের পুনর্জন্ম‎





‎৮ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মৌলভীবাজারবাসীর কাছে দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, বরং মুক্তির শ্বাস, বিজয়ের চিৎকার, আর বেদনামাখা গৌরবের আরেক নাম। ১৯৭১ সালের এই দিনের ভোর আলো ফুটতেই মৌলভীবাজারের আকাশে উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। হানাদার বাহিনীর পতনের সঙ্গে সঙ্গে শহর যেমন ফিরে পেয়েছিল স্বাধীন ভূমি, তেমনি মানুষের হৃদয়ে জেগেছিল দীর্ঘদিনের দমিয়ে রাখা উল্লাস।

‎৪ ডিসেম্বর কমলগঞ্জের শত্রুমুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় মানুষের মনে জেগে ওঠে নতুন জেদ। পরদিন ৫ ডিসেম্বর ভোর থেকে মৌলভীবাজারের চারদিকেই শুরু হয় আক্রমণের পর আক্রমণ। রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, মুন্সীবাজার একটির পর একটি এলাকা মুক্ত হতে থাকলে শহরের দিকে অগ্রসর হয় মুক্তিবাহিনীর দল।

‎তখনকার মহকুমা সদর হওয়ায় মৌলভীবাজার ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার। নিরাপত্তা বলয়, পাহারাদার, মাইন সব মিলিয়ে শহরটি ছিল কঠিন দুর্গ। কিন্তু সেই দুর্গ ভাঙার অদম্য সাহস ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে।

‎জেড ফোর্সের ১৭টি ইউনিটের মধ্যে দুইটি কুলাউড়ার দিকে মোতায়েন থাকলেও বাকি ১৫টি ইউনিট শহরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরে।
‎৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় রণক্ষেত্রের মতো যুদ্ধ। গর্জে ওঠে কামানের গোলা, চারদিকে ধোঁয়া আর আগুনের আস্তরণ। মাঝরাতের অন্ধকারে বহু মুক্তিযোদ্ধা শহরে ঢোকার রাস্তায় পড়ে থাকেন আহত অবস্থায়। তবুও তাদের লক্ষ্য একটাই মৌলভীবাজারকে মুক্ত করা।

‎৭ ডিসেম্বরের ভোর নাগাদ যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। শহরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তখন শুধু অপেক্ষা করছেন শেষ সিগন্যালটির।

‎মাইন ও পুঁতে রাখা বিস্ফোরকে ভরা রাস্তাগুলো নিষ্ক্রিয় করতে সময় লাগে। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে তখনও লেগে আছে রাতভর যুদ্ধের ধুলো, আর হৃদয়ে জমে আছে শোকের দাগ। কিন্তু বিজয়ের আবহ ছুঁয়ে যেতেই শহরের মানুষ ছুটে আসে রাস্তায়।

‎কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে। মুহূর্তেই সে চিৎকার ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে গলিঘুপচিতে। মা-বোনেরা দরজা খুলে দৌড়ে আসে, শিশুদের চোখেও লাফাতে থাকে অজানা আনন্দ। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও সেটা ছিল মুক্তির সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।

‎সব ঝুঁকি কাটিয়ে ৮ ডিসেম্বর সকালে মহকুমা হাকিমের কার্যালয় (বর্তমান জর্জ কোর্ট ভবন) প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। নেতৃত্বে ছিলেন গণপরিষদের সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আজিজুর রহমান।

‎সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে যে জল ছিল—তা ছিল বিজয়ের, তৃপ্তির, আর হারানো সাথিদের স্মরণে বেদনার জল।

‎মৌলভীবাজার প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট,যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ছিল, আজও মাটির নিচে লুকিয়ে রাখে রক্তাক্ত বাংকারের স্মৃতি। অনেক গণকবর, বধ্যভূমি, যুদ্ধক্ষেত্র আজও পুরোপুরি সংরক্ষণ পায়নি,এ আক্ষেপ মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে আজও সুর তোলে।

‎সোমবার ( ৮ ডিসেম্বর) সকালে শহীদ মিনার ও শাহ মোস্তফা সড়কের গণকবরে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। পরে জেলা প্রশাসকের হলরুমে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, যেখানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হবিগঞ্জে বিয়ের প্রলোভনে কিশোরীকে ধর্ষণ: পলাতক আসামি সিলেট থেকে গ্রেফতার করল র‍্যাব।

‎বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে..

‎৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের লাল-সবুজের পুনর্জন্ম‎

সময় ০৩:৫০:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫





‎৮ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মৌলভীবাজারবাসীর কাছে দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, বরং মুক্তির শ্বাস, বিজয়ের চিৎকার, আর বেদনামাখা গৌরবের আরেক নাম। ১৯৭১ সালের এই দিনের ভোর আলো ফুটতেই মৌলভীবাজারের আকাশে উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। হানাদার বাহিনীর পতনের সঙ্গে সঙ্গে শহর যেমন ফিরে পেয়েছিল স্বাধীন ভূমি, তেমনি মানুষের হৃদয়ে জেগেছিল দীর্ঘদিনের দমিয়ে রাখা উল্লাস।

‎৪ ডিসেম্বর কমলগঞ্জের শত্রুমুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় মানুষের মনে জেগে ওঠে নতুন জেদ। পরদিন ৫ ডিসেম্বর ভোর থেকে মৌলভীবাজারের চারদিকেই শুরু হয় আক্রমণের পর আক্রমণ। রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, মুন্সীবাজার একটির পর একটি এলাকা মুক্ত হতে থাকলে শহরের দিকে অগ্রসর হয় মুক্তিবাহিনীর দল।

‎তখনকার মহকুমা সদর হওয়ায় মৌলভীবাজার ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার। নিরাপত্তা বলয়, পাহারাদার, মাইন সব মিলিয়ে শহরটি ছিল কঠিন দুর্গ। কিন্তু সেই দুর্গ ভাঙার অদম্য সাহস ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে।

‎জেড ফোর্সের ১৭টি ইউনিটের মধ্যে দুইটি কুলাউড়ার দিকে মোতায়েন থাকলেও বাকি ১৫টি ইউনিট শহরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরে।
‎৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় রণক্ষেত্রের মতো যুদ্ধ। গর্জে ওঠে কামানের গোলা, চারদিকে ধোঁয়া আর আগুনের আস্তরণ। মাঝরাতের অন্ধকারে বহু মুক্তিযোদ্ধা শহরে ঢোকার রাস্তায় পড়ে থাকেন আহত অবস্থায়। তবুও তাদের লক্ষ্য একটাই মৌলভীবাজারকে মুক্ত করা।

‎৭ ডিসেম্বরের ভোর নাগাদ যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। শহরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তখন শুধু অপেক্ষা করছেন শেষ সিগন্যালটির।

‎মাইন ও পুঁতে রাখা বিস্ফোরকে ভরা রাস্তাগুলো নিষ্ক্রিয় করতে সময় লাগে। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে তখনও লেগে আছে রাতভর যুদ্ধের ধুলো, আর হৃদয়ে জমে আছে শোকের দাগ। কিন্তু বিজয়ের আবহ ছুঁয়ে যেতেই শহরের মানুষ ছুটে আসে রাস্তায়।

‎কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে। মুহূর্তেই সে চিৎকার ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে গলিঘুপচিতে। মা-বোনেরা দরজা খুলে দৌড়ে আসে, শিশুদের চোখেও লাফাতে থাকে অজানা আনন্দ। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও সেটা ছিল মুক্তির সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।

‎সব ঝুঁকি কাটিয়ে ৮ ডিসেম্বর সকালে মহকুমা হাকিমের কার্যালয় (বর্তমান জর্জ কোর্ট ভবন) প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। নেতৃত্বে ছিলেন গণপরিষদের সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আজিজুর রহমান।

‎সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে যে জল ছিল—তা ছিল বিজয়ের, তৃপ্তির, আর হারানো সাথিদের স্মরণে বেদনার জল।

‎মৌলভীবাজার প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট,যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ছিল, আজও মাটির নিচে লুকিয়ে রাখে রক্তাক্ত বাংকারের স্মৃতি। অনেক গণকবর, বধ্যভূমি, যুদ্ধক্ষেত্র আজও পুরোপুরি সংরক্ষণ পায়নি,এ আক্ষেপ মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে আজও সুর তোলে।

‎সোমবার ( ৮ ডিসেম্বর) সকালে শহীদ মিনার ও শাহ মোস্তফা সড়কের গণকবরে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। পরে জেলা প্রশাসকের হলরুমে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, যেখানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।