
”প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ি, সামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করি” এ প্রতিপাদ্যে বুধবার (৩ ডিসেম্বর) মৌলভীবাজারে বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হলো ৩৪তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস।
১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হচ্ছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে।
সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা, বর্ণাঢ্য র্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা কার্যালয় এবং প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র। অনুষ্ঠানে সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বিদ্যালয়, প্রতিবন্ধী সংগঠন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সদর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার সুমন দেবনাথ।
প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল। বিশেষ অতিথি ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান।
এ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন, নজরুল ইসলাম মুহিব, আহ্বায়ক সদস্য মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব, অভিভাবক প্রতিনিধি ব্রুমিং রোজেস বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের আব্দুর রউফ, সমাজকর্মী স্বপন দাশ, জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা চন্দন কুমার পাল,
বক্তারা বলেন,২০০৬ সালের জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক, মানসিক বা ইন্দ্রিয়গত সমস্যার কারণে সমাজে সমানভাবে অংশগ্রহণে বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিই প্রতিবন্ধী হিসেবে বিবেচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ব্যাখ্যায় প্রতিবন্ধিতার তিনটি মাত্রা তুলে ধরা হয়—১) শরীরের গঠন বা কার্যকারিতার প্রতিবন্ধকতা ২) কার্যকলাপের সীমাবদ্ধতা
৩) সামাজিক অংশগ্রহণে বাধা।
বিশ্বে বর্তমানে ১৩০ কোটি (১৬%) মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী। WHO–এর ২০২৩ সালের তথ্যমতে দেশে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৩৪ লাখ, যা জনসংখ্যার ৯.৭%।দেশে নারী প্রতিবন্ধী বেশি।সর্বাধিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, এরপর বাক-শ্রবণ এবং বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী।শহরের তুলনায় গ্রামে প্রতিবন্ধিতার হার বেশি।বিভাগের হিসেবে চট্টগ্রামে সর্বাধিক, সিলেটে সর্বনিম্ন।কর্মসংস্থানে যুক্ত প্রতিবন্ধীর হার মাত্র ২৭.২১%। অসচ্ছল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকার বর্তমানে মাসিক ৮৫০ টাকা ভাতা প্রদান করে।
বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে এই ভাতা ৫ হাজার টাকায় উন্নীতকরণ দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, বর্তমান ভাতা দিয়ে কোনো প্রতিবন্ধীর ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব নয়।
২০১৩ সালের ৩ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘প্রতিবন্ধী অধিকার ও সুরক্ষা আইন–২০১৩’–এ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, ন্যায়বিচার, তথ্যপ্রাপ্তি, পারিবারিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণসহ ২০টি অগ্রাধিকার সুবিধা নিশ্চিতের কথা রয়েছে।
এ ছাড়াও রয়েছে গণপরিবহণে ৫% আসন সংরক্ষণ,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা অনুযায়ী ভর্তি নিশ্চয়তা,গণমাধ্যমে প্রতিবন্ধী বিষয়ে নেতিবাচক শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—আইন থাকলেও রাষ্ট্র এখনো প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। সরকারি ভবন, গণপরিবহণ, ডিজিটাল সেবা ও তথ্যপ্রবাহে হুইলচেয়ার- বন্ধুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ঘাটতি এখনো প্রকট।
তাদের মতে অধিকার আদায়ে শুধু সরকারের উদ্যোগ নয়,প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও সংগঠিত হওয়া, দাবি উপস্থাপনে ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়,রাষ্ট্র প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সেবা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর, তবে দেশজুড়ে প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
আব্দুস সামাদ আজাদ,মৌলভীবাজার থেকে 


















