
১৩ নভেম্বরের লকডাউন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গোটা দেশ যেন এক অদৃশ্য অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা গুজব, ব্যবসা-বাণিজ্যে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে আজকের বাংলাদেশ যেন দাঁড়িয়ে আছে এক অনিশ্চিত মোহনায়।
মানুষের ভয়, উৎকণ্ঠা ও প্রশ্ন—কোথায় যাচ্ছে দেশ? সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ কি তবে আরও ঝুঁকির দিকে? অতীতের মত আবার কি লাগাতার আন্দোলন করবে কিছু রাজনৈতিক দল। আওয়ামীলীগ তো এখন ব্যাকসাইডে, তারা ঘোষণা দিয়ে রাজপথে দাঁড়াতে পারবে?এই প্রশ্ন আজ সাধারণ মানুষের মনে।
এসব আলোচনা এখনবচা দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই একটাই আলোচনা। কেউ বলছে- এটা হয়তো কৌশলগত চাপ তৈরির অংশ, কেউ আবার আশঙ্কা করছে হঠাৎ করে বড় ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে মানুষের ধারণা এগুলো বাস্তবতা ভিন্ন, কারন তাদের অধিকাংশ নেতাকর্মী ঘরছাড়া, আন্দোলন করার মত শক্তি সামর্থ্য তাদের আপাততঃ নেই!
এক দোকানদার জানালেন, রাজনীতি নিয়ে বলবো না, কিন্তু এই কর্মসূচি হলেই আমাদের ব্যবসা থেমে যায়। বেচাকেনা নেই, আয় নেই—চিন্তা করি সংসার কীভাবে চলবে।
একজন রিকশাচালক বললেন,ভাই, লকডাউন হলে তো রাস্তায় বের হতে পারবো না। দিন আনি দিন খাই—আমাদের অবস্থা কী হবে?
লকডাউন কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকেই ফেসবুক, টিকটক ও বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য ‘অনিশ্চিত’ খবর। কোথাও বলা হচ্ছে বড় ধরনের সংঘর্ষ হতে পারে, কোথাও আবার পরিবহন বন্ধ থাকবে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে।
একজন শিক্ষার্থী বললেন, ফেসবুকে এত অদ্ভুত খবর আসছে যে বোঝাই যাচ্ছে না কোনটা আসল, কোনটা গুজব। আতঙ্ক বাড়ছে আরও বেশি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক চাপের মুহূর্তে ভুয়া তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যখনই বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি আসে, প্রথম আঘাতটা পড়ে ছোট ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর।
ব্যবসা থেমে যায়, পরিবহন কমে যায়, শহরের রাস্তায় মানুষের পদচারণা কমে আসে।
হকার, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে শুরু হয়েছে কৃত্রিম অস্থিরতা। অনেকেই বাড়তি কেনাকাটা করছেন—যার ফলে বেড়েছে চাহিদা, আবার কেউ কেউ দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন সুযোগ বুঝে।
একজন কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী বললেন, লকডাউন কি একদিনের জন্য না-কি দীর্ঘদিন চলবে? তবে যদি বেশি দিন লকডাউন দীর্ঘায়িত হয় তা হলে পূর্বের ন্যায় লোকজন জিনিস পত্র
বেশি কিনবে লোকজন, ফলে জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার লকডাউন হলে মালপত্র আসবে কিভাবে—এই চিন্তায় থাকেন ব্যবসয়ীগণ।
১৩ তারিখের বিভিন্ন শ্রেণী–পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বললে দেখা যায়, সবার মনে কিছু সাধারণ প্রশ্ন ঘুরছে:এ লকডাউন রাজনৈতিক কৌশল, নাকি পরিস্থিতি সত্যিই অস্থিতিশীল? ১৩ নভেম্বর কী ঘটতে পারে—নিরাপত্তা ঝুঁকি কতটা?পরিবহন, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সব কি প্রভাবিত হবে? সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা কীভাবে চলবে? দেশ কি আবার রাজনৈতিক অস্থিরতার চক্রে ঢুকছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর কেউ স্পষ্ট করে জানে না, কিন্তু অনিশ্চয়তাই মানুষের মনে ভয় তৈরি করে সবচেয়ে বেশি। ঘর থেকে বের হতে অনেকেই ভয় আশংকা কাজ করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে যেকোনো রাজনৈতিক চাপান–উতোরের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। ব্যবসায় ক্ষতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধাক্কা, বিদেশি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া—সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জাতির ওপর প্রভাব পড়ে।
এক অর্থনীতিবিদের মতে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে যায়। দেশের স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। সাধারণ মানুষ তখন বাঁচে আতঙ্কের সঙ্গে—যা কোনো দেশের জন্যই কাম্য নয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছে।
তারা জনগণকে অনুরোধ করেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে কেবল নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে খবর জানতে।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব সাধারণ—নিরাপদে রাস্তায় বের হতে পারা, স্বাভাবিকভাবে কাজ করা, সন্তানের স্কুল-কলেজ চালু থাকা, বাজার দামের নিয়ন্ত্রণ।
১৩ নভেম্বরের কর্মসূচি কী ঘটাবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সত্য হলো—মানুষ ক্লান্ত, মানুষ উদ্বিগ্ন, মানুষ শান্তি চায়। দেশের একটি সুন্দর পরিবেশ বিরাজ করুক। আগামীতে সময় বেঁধে তারিখ এবং যথাসময়ে নির্বাচন হউক। দেশের ফ্যাসিবাদী সিস্টেম নিপাত যাক।
আব্দুস সামাদ আজাদঃ 


















