
হবিগঞ্জের মাধবপুরে এলাকার একমাত্র গেজেটেড বীরাঙ্গনা মাজেদা বেগম ও তার যুদ্ধশিশু কন্যা শামসুন্নাহারকে বাড়িঘর দখলের চেষ্টা, হয়রানি ও নির্যাতন এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) মাধবপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বীরাঙ্গনা মাজেদা বেগম।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার আদাঐর ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের বাসিন্দা মাজেদা বেগম ও তার যুদ্ধশিশু শামসুন্নাহার দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের সামাজিক হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন। তাদের অভিযোগ, একটি চক্র বিভিন্ন সময় তাদের হয়রানি করে আসছে। এমনকি বাড়িঘর ও ভিটেমাটি দখলেরও চেষ্টা করা হচ্ছে।
মাজেদা বেগমের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী তাকে একটি বীর নিবাস নির্মাণ করে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তার আত্মীয় আমির হোসেন ও জামাল মিয়া একটি চক্রের সহযোগিতায় তাদের ভিটেমাটি দখলের চেষ্টা করছেন।
সর্বশেষ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে স্থানীয় আমিন নজরুল ইসলাম তাদের না জানিয়ে বাড়িঘর মাপতে শুরু করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় বাড়িঘর ছেড়ে দেওয়ার জন্যও চাপ দেওয়া হয় বলে দাবি করেন মাজেদা বেগম।
এর আগেও নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগে তারা মাধবপুর থানায় দুইবার অভিযোগ করেছিলেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে আমির হোসেন ও জামাল মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এগুলো আমাদের মালিকানাধীন জায়গা। নির্যাতনের অভিযোগ অতিরঞ্জিত।
এদিকে যুদ্ধশিশু শামসুন্নাহার দীর্ঘদিন ধরে গলার একটি জটিল রোগে ভুগছেন বলে জানা গেছে। তার চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তার বিষয়ে গত মার্চে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ তার পরিবারের।
তাদের আরও অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির পক্ষ থেকে একাধিকবার সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মসূচিতেও তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় না বলে অভিযোগ করেন তারা।
বীরাঙ্গনা মাজেদা বেগম বলেন, আমার মেয়েকে নিয়ে একটি স্বাধীন দেশে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি। মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো কর্মসূচিতে আমাদের ডাকা হয় না। বিভিন্ন সময় টিটকারি-মশকরা করা হয়। আমাদের বীর নিবাস দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়নি। এখন ন্যায়বিচারের জন্য থানায় থানায় ঘুরছি।
যুদ্ধশিশু শামসুন্নাহার বলেন, রাষ্ট্র যদি আমাদের বিচার না করে, তাহলে একদিন সৃষ্টিকর্তার কাছে চলে যাব।
তিনি বলেন, আমাদের নিয়ে নিউজ হলেও সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য করবে—বড় কথা হলো, আমাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হচ্ছে না। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুবিচার চাই।
মাধবপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক ইদ্রিস আলী ওরফে দুলা মিয়া বলেন, বীরাঙ্গনা মাজেদা বেগম ও তার কন্যা আমাদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। তাদের ওপর এত নির্যাতনের বিষয়টি আমি জানতাম না। আগামী মিটিংয়ে বিষয়টি আমি তুলে ধরব।
মাধবপুরের ইউএনও মেহেদী হাসান বলেন, আমি তাদের খোঁজখবর নিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। আমার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বিষয়টিও আগের ইউএনওর সময়ের। বিষয়টি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাধবপুর থানার ওসি সোহেল রানা বলেন, অভিযোগের বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে বিষয়টি লিখিতভাবে অভিযোগ করা হয়ে থাকলে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাধবপুর মডেল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরাসউদ্দিন বলেন, বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের কাছে সম্মানের। উপজেলার কোনো অনুষ্ঠানে তাদের দাওয়াত দিতে দেখিনি। যুদ্ধশিশু শামসুন্নাহারও জটিল রোগে আক্রান্ত। রাষ্ট্রের নীরবতা তাদের প্রতি এক ধরনের বৈষম্য। তাদের ওপর চলমান নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও স্থানীয় রাজাকাররা মাজেদা বেগমকে অপহরণ করে ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায় বলে জানা যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি সামাজিকভাবে নানা বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার শিকার হন। পরবর্তীতে সরকারিভাবে গেজেটেড বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান মাজেদা বেগম। মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতনের সময় তার গর্ভে জন্ম নেয় শামসুন্নাহার, যিনি যুদ্ধশিশু হিসেবে পরিচিত।
ফরাস উদ্দিন, মাধবপুর। 

















