
মৌলভীবাজার শহরের পৌর জনমিলন কেন্দ্র ও পৌর কমিউনিটি সেন্টারে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলো গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব সম্পন্ন করে সেনাসদস্যরা ধীরে ধীরে ব্যারাকে ফিরে যাচ্ছেন। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপ হলেও স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো মৌলভীবাজারেও চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং নারী নির্যাতনের অভিযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জনমনে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার হওয়ায় জনমনে শংকা দেখা দিয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব পুলিশ ও অন্যান্য বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরই ন্যস্ত। বিশেষ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করলেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের মোতায়েন রাখা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। নির্ধারিত দায়িত্ব শেষে সেনাসদস্যদের ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ সামরিক কাঠামোর স্বাভাবিক অংশ।
তবে তাত্ত্বিক বাস্তবতা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মৌলভীবাজারের অনেক সচেতন নাগরিক। তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীদের একাংশও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলছেন। ফলে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি অনেকের কাছে মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় কথা বলে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পর স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা কার্যকরভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে?
স্থানীয়দের অভিযোগ, থানাগুলো কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও অপরাধ প্রতিরোধে দৃশ্যমান তৎপরতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। রাতের টহল জোরদার, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি বৃদ্ধি এবং অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে আরও কঠোর উদ্যোগ দেখতে চান তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে প্রশাসনের জোড়ালো প্রস্তুতি নিতে হবে। পাশাপাশি জেলা পুলিশ, র্যাব ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে অতিরিক্ত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মহল্লাভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবিও উঠেছে। স্থানীয় পর্যায়ে নৈশপ্রহরী ব্যবস্থা সক্রিয়করণ, কমিউনিটি পুলিশিং সম্প্রসারণ এবং নাগরিক অংশগ্রহণভিত্তিক নিরাপত্তা উদ্যোগ কার্যকর করা গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণেরও প্রয়োজন রয়েছে।
মৌলভীবাজারের শান্তিপ্রিয় মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা দেখতে চায় না। সেনাবাহিনীর ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে, তবে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এখন সময় এসেছে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণকে আশ্বস্ত করার।
অন্যথায় জনমনে যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে, তা আরও গভীর হতে পারে—যার সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আব্দুস সামাদ আজাদ, মৌলভীবাজার থেকে 


















