
বর্তমানে ‘আয়কর অডিট শব্দটির সঙ্গে অধিকাংশ করদাতা কমবেশি পরিচিত। তবে বাস্তবে অডিটকে অনেকেই স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে এক ধরণের আতঙ্কের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। কোনো করদাতার ফাইল অডিটে পড়লে তিনি মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা এবং নানা ধরনের জটিলতার আশঙ্কায় ভোগেন। অথচ অডিট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি নিয়মিত কার্যক্রম মাত্র। মূলত এনবিআর প্রতি বছর কিছু আয়কর রিটার্ন যাচাই-বাছাই করে দেখে—করদাতা যথাযথভাবে আয় প্রদর্শন করেছেন কি’না, কর সঠিকভাবে পরিশোধ করেছেন কি না কিংবা কোনো সম্পদ গোপন করা হয়েছে কি না। করদাতা যদি প্রয়োজনীয় দলিলপত্রের মাধ্যমে তাঁর আয় ও সম্পদের উৎস যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন, তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অডিট প্রক্রিয়া ঝামেলামুক্তভাবে সম্পন্ন হয়। তাই অডিটে ফাইল পড়া মানেই কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা একেবারেই সঠিক নয়।
আয়কর অডিট কী?
আয়কর অডিট হলো একটি আইনসম্মত যাচাই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে করদাতার দাখিলকৃত রিটার্ন ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের সঠিকতা পরীক্ষা করা হয়। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৮২ অনুযায়ী এনবিআর এ কার্যক্রম পরিচালনা করে। পূর্বে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ফাইল নির্বাচন করা হলেও, বর্তমানে ব্যক্তিকর রিটার্ন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বয়ংক্রিয় (Automated Random Selection) পদ্ধতিতে অডিটের জন্য নির্বাচন করা হয়। ফলে পুরো যাচাই প্রক্রিয়াটি এখন তুলনামূলক অনেক বেশি স্বচ্ছ।
কোন কোন কারণে ফাইল অডিটে যেতে পারে?
সাধারণত নিম্নোক্ত কারণে কোনো রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচিত হতে পারে—
• আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক সম্পদ বা ব্যাংক জমা প্রদর্শন
• ব্যয় ও আয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য
• কর অব্যাহতি বা কর হ্রাসের সুবিধা দাবি করা
• পূর্ববর্তী রিটার্নের সঙ্গে তথ্যগত গরমিল
• হঠাৎ অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি
সাম্প্রতিক সময়ে অডিট ফাইল বাড়ছে কেন?
বিগত ১৩/০৮/২০২৫ ইং তারিখে প্রকাশিত এনবিআর এর ওয়েবসাইটের তথ্য থেকে দেখা যায় ২৩-২৪ করবর্ষের মাত্র ৫৬২ টি ফাইল অডিটে পড়েছে। কিন্তু সর্বশেষ ২৮/০৪/২০২৬ ইং তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায় একই করবর্ষের আরও ৭২৩৪২ টি ফাইল অডিটের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। অর্থাৎ ১ বছরের ব্যবধানে অডিট ফাইলের সংখ্যা ১২০ গুনের বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রধান কারন দুইটি। প্রথমত- এনবিআর প্রয়োজন মনে করলে টিআইএন দিয়ে করদাতার নিজের নামে কি কি সম্পদ আছে তা যাচাই করতে পারে। উপ-কর কমিশনার, যুগ্ন-কর কমিশনারের অনুমোদনক্রমে করদাতার সকল ব্যাংকের তথ্য জানতে পারে খুব সহজেই। ফলে বাস্তবে জমাকৃত রিটার্নের সাথে প্রাপ্ত তথ্যের মিল না থাকাতে অডিটের পরিমান বাড়ছে। দ্বিতীয়ত- ২৪-২৫ করবর্ষ হতে অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামুলক করার ফলে নতুন করদাতাদের মধ্যে এক ধরনের আগ্রহ তৈরী হয়। অনলাইন রিটার্ন এখন খুব সহজ, মোবাইল দিয়েও তা দিয়ে দেওয়া যায়- এরূপ প্রচারনার ফলে করদাতাগন অনেকেই মনে করেছেন যেনতেন ভাবে রিটার্ন জমা দিলেই কাজ শেষ। ফলে অনেকেই কম্পিউটার দোকান থেকে রিটার্ন জমা দিয়েছেন। সাথে সাথে জমার স্লিপ ও সার্টিফিকেট পেয়ে যাওয়ায় রিটার্ন জমা সঠিক হয়েছে মনে করেছেন। এমনকি অনেক পুরাতন করদাতাও পর্যাপ্ত ধারনা না থাকা সত্তেও নিজে নিজে অথবা কম্পিউটার দোকান থেকে রিটার্ন জমা দিয়েছেন। যার ফলে পুর্ববর্তী বছরে দাখিলকৃত রিটার্নের সাথে পরের বছরের রিটার্নের তথ্যগত অমিল ধরা পড়েছে। অনেকক্ষেত্রে পর্যাপ্ত করফাঁকি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সরকার বেশী রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে অডিটের পরিমান বাড়িয়ে দিয়েছে।
নোটিশ মানেই কি অডিট?
অনেকেই আয়কর অফিস থেকে কোনো চিঠি বা নোটিশ পেলেই মনে করেন তাঁর ফাইল অডিটে গেছে। বাস্তবে বিষয়টি সবসময় তা নয়। রিটার্ন দাখিলের নোটিশ অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো রিটার্ন দাখিল না করলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৭২ অনুযায়ী রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য নোটিশ পাঠানো হয়। রিটার্নে গাণিতিক ভুল বা ছোটখাটো অসামঞ্জস্য থাকলে ধারা ১৮১ অনুযায়ী ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিশ আসতে পারে। এসব ক্ষেত্রে করদাতার পক্ষ থেকে যথাযথ জবাব ও প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হলে বিষয়টি সার্কেল অফিসেই নিষ্পত্তি হয়ে যায়।
ফাইল অডিটে পড়লে করদাতার করণীয়
ফাইল অডিটে পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত একজন দক্ষ কর পেশাজীবী বা আয়কর আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। নোটিশে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে জবাব, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ব্যাখ্যা দাখিল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি করদাতা সন্তোষজনকভাবে তথ্য উপস্থাপন করতে পারেন, তবে অনেক ক্ষেত্রেই অডিট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। তবে যথাসময়ে জবাব না দিলে উপ-কর কমিশনার একতরফাভাবে কর নির্ধারণ করতে পারেন, যা করদাতার জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অডিট ঝুঁকি কমানোর উপায়:
অডিটের সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলেও কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকলে এই ঝুঁকি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব। যেমন:
*সব আয়ের উৎস সঠিকভাবে প্রদর্শন করা।
* আয়ের সপক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রমাণাদি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা।
* ব্যাংক বা আর্থিক মাধ্যমে অযৌক্তিক লেনদেন পরিহার করা।
* দান বা উপহার পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত নিয়ম ও নথিপত্র পুরোপুরি অনুসরণ করা।
* রিটার্ন প্রস্তুত ও দাখিলের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কর পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া।
পরিশেষে, অনলাইন রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া সহজ করা হলেও আয়কর আইন অত্যন্ত বিস্তৃত ও জটিল। তাই পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া রিটার্ন দাখিল করলে ভবিষ্যতে অডিটসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। একজন সচেতন করদাতা যদি সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে রিটার্ন দাখিল করেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করেন, তাহলে অডিট প্রক্রিয়া সাধারণত সহজ ও ঝামেলামুক্ত হয়। কর দেশের উন্নয়নের প্রধান উৎস, তাই নিয়মিত ও সঠিকভাবে কর প্রদান এবং কর-সচেতনতা বৃদ্ধি করা আমাদের সবার নাগরিক দায়িত্ব।
এডভোকেট ও আয়কর আইনজীবী
সদস্য, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতি)
মোবাইল: ০১৭১৭৪৯৯১১১,
ই-মেইল: pinakbdn@gmail.com
পিনাক রঞ্জন দেবনাথ 

















