
প্রেম কি কেবল হৃদয়েই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি মনের গহীনে এমন গভীর ছাপ ফেলে যা শারীরিক দূরত্বকেও হার মানায়? সিলেটের এক অনন্য ও বিরল ক্লিনিক্যাল ঘটনা মনোরোগবিদ্যায় তুলে ধরেছে এমনই এক রোমাঞ্চকর প্রশ্ন।
বিচ্ছেদের দুই বছর পর মোবাইল ফোনের ইথারে ছড়িয়ে পড়া আবেগের মাধ্যমেই সাবেক প্রেমিকের মস্তিষ্কে স্থান করে নিয়েছে প্রেমিকার মানসিক বিভ্রম। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বিরল এই ‘ফলি আ দ্যু’ (Folie à Deux) বা যৌথ মনোদৈহিক বিভ্রমের সফল চিকিৎসা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা কুড়িয়েছেন সিলেটের সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. মোহাম্মদ সাঈদ এনাম।
ঘটনার পেছনের ইতিহাস
ঘটনার সূত্রপাত ২০২২ সালে। পরিবারের তীব্র আপত্তিতে চার বছরের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী চরম মানসিক আঘাতে ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি তীব্র মানসিক বিভ্রমে (হ্যালুসিনেশন) ভুগতে শুরু করেন—বাস্তবে কেউ না থাকলেও তিনি প্রতিনিয়ত সাবেক প্রেমিকের ফিসফিসানি শুনতে পেতেন এবং তাঁর অবয়ব দেখতে পেতেন।
পরবর্তীতে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাঈদ এনামের নিবিড় চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান।
দুই বছর পর বিস্ময়কর মোড়
ঘটনার প্রায় দুই বছর পর চিকিৎসকের চেম্বারে হাজির হন ২৪ বছর বয়সী এক তরুণ। তাঁর সমস্যাও হুবহু এক—তিনি ঘরের ভেতর এক তরুণীর ফিসফিসানি শুনছেন এবং স্পষ্ট তাঁর চলাফেরা দেখতে পাচ্ছেন। চিকিৎসকের সূক্ষ্ম ও নিখুঁত হিস্ট্রি টেকিংয়ে বেরিয়ে আসে এক অভাবনীয় সত্য; এই তরুণই ছিলেন দুই বছর আগে চিকিৎসা নেওয়া সেই তরুণীর সাবেক প্রেমিক!
যেভাবে ছড়ালো বিভ্রম!
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক রোগ সাধারণ ছোঁয়াচে রোগের মতো সরাসরি সংক্রমিত হয় না। তবে এই কেসে দেখা যায়, পারিবারিকভাবে বিচ্ছেদ হলেও তাঁদের মধ্যে গোপনে টেলিফোন যোগাযোগ সচল ছিল। তরুণী সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ার সময়েও নিয়মিত তাঁর মানসিক কষ্ট ও হ্যালুসিনেশনের অভিজ্ঞতা সাবেক প্রেমিকের সঙ্গে শেয়ার করতেন।
শারীরিক সহাবস্থান না থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘস্থায়ী গভীর আবেগীয় টান এবং ফোনের মাধ্যমে অনবরত মানসিকভাবে একই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে তরুণীর সেই বিশ্বাস ও দৃষ্টিভ্রম শেষ পর্যন্ত তরুণের মস্তিষ্কেও গেঁথে যায়।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকীতে স্বীকৃতি
সাধারণত, Folie a deux “ফলি এ ডক্স” একই ছাদের নিচে বসবাসকারী ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়। কিন্তু কোনো প্রকার শারীরিক সান্নিধ্য ছাড়া কেবল টেলিফোন যোগাযোগের ওপর ভর করে এই ধরনের Shared Psychotic Phenomenon তৈরি হওয়া মনোরোগবিদ্যায় অত্যন্ত বিরল।
সিলেটের ডা. সাঈদ এনামের এই অনন্য ক্লিনিক্যাল সাফল্য ও কেস স্টাডি যুক্তরাজ্যের মর্যাদাপূর্ণ Royal College of Psychiatrists-এর Transcultural Psychiatry Special Interest Group (TSIG)-এর ‘Summer 2024’ নিউজলেটারে স্থান করে নিয়েছে।
নিউজলেটারের সম্পাদক ডা. এমেলিন লাগুনেস-করডোবা (MSc, PhD)—মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সাইকোথেরাপিস্ট ও ট্রান্সকালচারাল সাইকিয়াট্রি বিশেষজ্ঞ এবং Institute of Psychiatry, Psychology & Neuroscience, King’s College London-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—এই কেস হিস্ট্রির সম্ভাব্য গুরুত্ব তুলে ধরে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেন:
“We have a very interesting discussion of a case of Folie a Deux, in which Dr Muhammad Sayed Inam, describes how two young patients, who were engaged at some point in their lives, developed similar psychotic symptoms, associated with the end of their relationship.”
ডা. সাঈদ এনাম দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে নিয়মিত গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশের পাশাপাশি বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সেমিনার ও সম্মেলনে বিরল কেস হিস্ট্রি এবং গবেষণার বিষয় নিয়ে বক্তা হিসেবে উপস্থাপনা করে থাকেন। তাঁর এ ধরনের ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা ও গবেষণাধর্মী কাজ বাংলাদেশের সাইকিয়াট্রি বা মনোরোগবিদ্যার আন্তর্জাতিক পরিচিতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
২০২১ সালে তিনি American Psychiatric Association (APA)-এর International Fellow হিসেবে APA Board of Trustees কর্তৃক নির্বাচিত হন।
তিনি বর্তমানে Sylhet MAG Osmani Medical College-এর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তাঁর এমন গবেষণাধর্মী ক্লিনিক্যাল কাজের জন্য ‘অনলাইন সিলেট’ নিউজ পোর্টাল পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
আবদুল হক মামুন। 

















