আবু সালেহ আহমদ।।

বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ক্যানভাসে ‘ভট্ট সংগীত’ বা ‘ভট্ট কবিতা’ এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল স্থান দখল করে আছে। এটি মূলত এক সুপ্রাচীন, বংশানুক্রমিক ও স্তুতিমূলক লোকশিল্প। ইতিহাসের পাতা ও লোক ঐতিহ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাচীনকালে রাজদরবারে যেমন রাজকীয় কীর্তন বা গুণগান গাওয়ার জন্য ‘বন্দি’ বা ‘স্তুতিপাঠক’ নিয়োজিত থাকতেন (যাদের উপাধি ছিল ‘ভট্ট’), ভট্টরা ছিলেন মূলত সেই ধারারই এক শ্রেণির চারণকবি। তাঁরা সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বংশমর্যাদা, বীরত্ব, মহত্ত্ব এবং চারিত্রিক গুণাবলি ছন্দে ছন্দে বর্ণনা করতেন।
২০১২ সালের দিকে বাংলা একাডেমির ‘লোকসংস্কৃতি আধুনিকায়ন প্রকল্প’-এর অধীনে লোক উপাদান সংগ্রহ করতে গিয়ে আমি বেশ কিছু ভট্ট কবিতা পাঠের সুযোগ পাই এবং পরবর্তীতে তা বাংলা একাডেমিতে জমা দিই। কবিতা গুলোর ভাষা কিছুটা সুকঠিন ও জটিল মনে হলেও কবিদের ভাবভঙ্গি ছিল অত্যন্ত সরল এবং তাঁদের জ্ঞানের পরিধি ছিল কল্পনাতীত। বানিয়াচং অঞ্চলে আজও এই কবিতা ও সংগীতের সুদূরপ্রসারী প্রভাব প্রত্যক্ষ করা যায়।
ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, সপ্তদশ শতকের শেষভাগের দিকে এই প্রতিভাবান ভট্ট কবিদের উদ্ভব ঘটেছিল। অন্যদিকে, লোকসংস্কৃতির আরেকটি ধারা ‘ভাট কবিতা’ বা ‘পথুয়া কবিতা’-র জন্ম হয়েছে আরও অনেক পরে—বিংশ শতকের বিশ বা ত্রিশের দশকে। সমসাময়িক কোনো চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিক ছন্দ মিলিয়ে ভাট কবিতা রচনা করা হতো এবং হাট-বাজারে, আদালত প্রাঙ্গণে কিংবা পথপ্রান্তে ফেরি করে তা বিক্রি করা হতো। মূলত ময়মনসিংহ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ছিল ভাট কবিতার উৎপত্তিস্থল। তবে ভাট কবিতার তুলনায় ‘ভট্ট কবিতা’-র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও গাম্ভীর্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।
ভট্ট কবিতার প্রধান ও আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো—এটি কোনো কাল্পনিক বা রূপকথার কাহিনি নয়; বরং বাস্তব মানুষের জীবন, ইতিহাস ও বংশপরম্পরার এক জীবন্ত ইতিবৃত্ত। কোনো রাজা, জমিদার কিংবা সমাজ-স্বীকৃত অভিজাত ব্যক্তির পূর্বপুরুষদের নাম, সামাজিক মর্যাদা,দানশীলতা এবং গৌরবময় কীর্তিগাথা নিপুণ ছন্দে সাজানো হতো এই কবিতায়। সাধারণত বিবাহ, অন্নপ্রাশন, সামাজিক উৎসব কিংবা ধর্মীয় ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে ভট্টরা গৃহকর্তা ও তাঁর বংশের গুণকীর্তন করে এই কবিতা পাঠ করতেন।
ভট্ট সংগীতের পরিবেশনশৈলী অত্যন্ত গুরুগম্ভীর, রাজকীয় এবং শ্রোতার মনে গভীর প্রভাব বিস্তারকারী। এটি মূলত উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তির মতো পরিবেশন করা হতো, যার মধ্যে থাকত এক বিশেষ সুরের দোলা। ঢোল বা একতারার মতো বাদ্যযন্ত্রের খুব একটা প্রয়োজন হতো না; শিল্পীর কণ্ঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ ও সুরের ওঠানামাই ছিল এর প্রধান শক্তি। একজন দক্ষ ভট্ট কবি শত শত পরিবারের জটিল বংশলতিকা ও পারিবারিক ইতিহাস অনায়াসে স্মৃতিতে ধারণ করতেন। উপরন্তু, আসরের পরিবেশ বুঝে তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা রচনা করার এক অসাধারণ ঐশ্বরিক পারদর্শিতাও তাঁদের ছিল।
বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত লোকসংস্কৃতি সংগ্রহমালা (হবিগঞ্জ খণ্ড) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় একশত এগারো বছর আগে উপমহাদেশের বৃহত্তম ঐতিহ্যবাহী গ্রাম বানিয়াচঙে ভট্ট পদবিধারী এক বিশেষ জনগোষ্ঠী এই সমৃদ্ধ কাব্যধারার সৃষ্টি করেছিলেন। তবে কালের নিষ্ঠুর নিয়মে আজ এই শিল্পটি বিলুপ্তির অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে।
কামরূপ শাসনাবলী গ্রন্থের লেখক এবং সিলেট বিভাগের প্রথম ফোকলোরবিদ হিসেবে খ্যাত পণ্ডিত পদ্মনাথ ভট্টাচার্য (বিদ্যাভূষণ) ছিলেন বানিয়াচঙের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাভূষণ পাড়ার অধিবাসী। উচ্চশিক্ষিত ও দূরদর্শী এই পণ্ডিত ১৯০২ সালের দিকে প্রথম অবহেলিত ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভট্ট কবিতাগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মহতী উদ্যোগ নেন এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সংগ্রহশালায় জমা দেন।
পরবর্তীতে অধ্যাপক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় ‘শ্রীহট্ট ভট্টসংগীত’ নামে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ (যতীন্দ্রমোহন সংগ্রহশালা, কলিকাতা) থেকে যে সংকলনটি প্রকাশিত হয়, তার ৩৭টি কবিতার মধ্যে ৩০টি কবিতাই ছিল বানিয়াচঙের ভট্ট কবিদের রচিত।
পদ্মনাথ ভট্টাচার্যের উদ্যোগের পূর্বে এই কবিতাগুলোর কোনো লিখিত রূপ ছিল না। ভট্ট মহাশয়গণ মুখে মুখে ও স্মৃতিতে এগুলো বাঁচিয়ে রাখতেন এবং বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে ঘুরে ঘুরে পরিবেশন করতেন। বিশেষ করে পারলৌকিক, আধ্যাত্মিক ও ধর্মপরায়ণতার বিষয়ে রচিত কবিতাগুলোকে যখন সুর ও তালের মিশ্রণে গীত হিসেবে পরিবেশন করা শুরু হয়, তখন থেকেই এটি ‘ভট্টসংগীত’ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
যে যুগে খবরের কাগজ, রেডিও বা আধুনিক গণমাধ্যম ছিল না, সে যুগে সমাজে ভট্টদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। নানাবিধ নৈতিক শিক্ষা, লোকশিক্ষা ও ঐতিহাসিক উপাখ্যান প্রচারের মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজকে সচেতন করতে তাঁরা বিশেষ ভূমিকা রাখতেন। ভূস্বামীদের বড় সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ভট্ট কবিদের কদর ছিল সবার ওপরে। বানিয়াচঙের প্রখ্যাত ভট্ট কবিদের মধ্যে মকরন্দ ভট্ট, কবি নবনারায়ণ ভট্ট, রামমোহন ভট্ট ও রঘুনাথ ভট্টের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এই গুণী ভট্ট কবিদের অধিকাংশের স্থায়ী নিবাস ছিল বানিয়াচং ২নং ইউনিয়নের ‘ভট্টপাড়া’ এবং ৪নং ইউনিয়নের ‘ভট্টহাটি’ এলাকায়। ধারণা করা যায়, এমন অসাধারণ ও ঐতিহ্যবাহী কবিতা রচনার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা থেকেই তাঁদের বংশগত উপাধি হয়েছিল ‘ভট্ট’ এবং তাঁদের বসতিগুলোর নামকরণ করা হয়েছিল ‘ভট্টপাড়া’ ও ‘ভট্টহাটি’। বানিয়াচং ছাড়াও বৃহত্তর সিলেটের অন্যান্য অঞ্চলেও এই চারণকবিদের বিচরণ ছিল। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সংরক্ষণের অভাবে সেই অমূল্য সৃষ্টিগুলো আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।
পরবর্তী সময়ে ভট্ট সংগীতের সুখ্যাতি সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আভিজাত্য ও পারিবারিক ঐতিহ্যের বিষয়ে সংবেদনশীল থাকায় সিলেটের গ্রামীণ সমাজে ভট্ট কবিদের মর্যাদা ছিল অনন্য।
লব্ধপ্রতিষ্ঠ লোকসংস্কৃতি গবেষক অধ্যাপক শরদিন্দু ভট্টাচার্য এই শিল্প সম্পর্কে অত্যন্ত যথার্থই বলেছেন:”ভট্ট সংগীত কেবল সাধারণ কোনো স্তুতিগান বা প্রশংসাগীতি নয়; এটি মূলত আমাদের লোকসমাজের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমাজতাত্ত্বিক উপাদান। এটি তৎকালীন গ্রামীণ সমাজের অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস ও সামাজিক কাঠামো বুঝতে গবেষকদের গভীরভাবে সাহায্য করে। লিখিত দলিল না থাকা সত্ত্বেও এই মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে ইতিহাসের বহু মূল্যবান তথ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষিত হয়ে এসেছে।”
আধুনিক শিক্ষার প্রসার, অপসংস্কৃতির তোড়জোড় এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের ভিড়ে শতাব্দী প্রাচীন এই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের শিকড় ও লোকসংস্কৃতির স্বার্থেই এই হারিয়ে যাওয়া অমূল্য সম্পদকে নতুন করে চেনা, গবেষণা করা এবং সংরক্ষণ করা আজ সময়ের দাবি।
লেখক- বহু গ্রন্থ প্রণেতা ও লোকসংস্কৃতি গবেষক।
সাহিত্য 

















