
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতে ধর্মঘট নতুন কোনো ঘটনা নয়। ভাড়া বৃদ্ধি, রুট সংকট, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা মালিক-শ্রমিক স্বার্থের প্রশ্নে অতীতেও বহুবার চাকা থেমেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। এখন যাত্রীরা শুধু পরিবহন চলুক, সেটাই চান না; তারা চান নিরাপদ, নিয়মতান্ত্রিক এবং মানসম্মত সেবা। আর সেই পরিবর্তিত জনমতের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ‘হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস’কে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কে।
দীর্ঘদিন ধরে সিলেট-হবিগঞ্জ রুটে চলাচলকারী ‘হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস’, স্থানীয়ভাবে পরিচিত, (‘হবিগঞ্জ বিরতিহীন নামে)’, সম্প্রতি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত ১০ মে থেকে মৌলভীবাজার জেলার ওপর দিয়ে বাসটির চলাচল বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, ফিটনেস, রুট পারমিট এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে আগামী ৩ জুন ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, যে জনগণকে সামনে রেখে ধর্মঘটের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হচ্ছে, সেই জনগণের একটি বড় অংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন।
পরিবহনটির পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে ‘৫২ বছরের ঐতিহ্য’-এর বিষয়টি। মালিকপক্ষের দাবি, কয়েক দশকের পুরোনো এই পরিবহন সেবাকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সংকুচিত করা হচ্ছে।
কিন্তু জনমতের বড় একটি অংশ মনে করছে, ঐতিহ্য কোনোভাবেই আইনের বিকল্প হতে পারে না। একটি পরিবহন কত বছর ধরে চলছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি কতটা নিরাপদ, কতটা নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছে এবং যাত্রীদের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য সেবা নিশ্চিত করছে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থায় ফিটনেস, বৈধ কাগজপত্র ও নিরাপদ পরিচালনা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক বিষয়। সেখানে অতীতের ইতিহাস দিয়ে বর্তমানের অনিয়মকে আড়াল করার সুযোগ নেই।
হবিগঞ্জের একটি জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ঘিরে সাধারণ মানুষের মন্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, অনেক যাত্রী দীর্ঘদিন ধরেই পরিবহনটির সেবার মান নিয়ে অসন্তুষ্ট।
কেউ বিকল্প পরিবহনের কথা উল্লেখ করেছেন, কেউ সরকারি বাসসেবা সম্প্রসারণের দাবি তুলেছেন, আবার কেউ চালক-স্টাফদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অনেক মন্তব্যেই দেখা গেছে, ধর্মঘটের চেয়ে সেবার মান উন্নয়নের দাবি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
জনমতের এই প্রবণতা ইঙ্গিত করে যে, বর্তমান সময়ে যাত্রীরা আর কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল নন। তারা বিকল্প খুঁজে নিতে প্রস্তুত, যদি সেই বিকল্প নিরাপদ ও সেবামুখী হয়।
একসময় পরিবহন ধর্মঘট মানেই ছিল জনজীবন অচল হয়ে পড়া। কিন্তু বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্তার, বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এবং মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে।
যাত্রীদের একটি অংশ মনে করেন, কোনো পরিবহন প্রতিষ্ঠান যদি জনআস্থা হারায়, তাহলে শুধুমাত্র ধর্মঘটের মাধ্যমে সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন সেবার মানোন্নয়ন, জবাবদিহিতা এবং আইন মেনে পরিচালনার সংস্কৃতি।
এই রুটে সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির বাসসেবা পুনরায় জোরদার করার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। পাশাপাশি অন্যান্য বেসরকারি পরিবহন কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোর পক্ষেও মতামত দিয়েছেন অনেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি পাবে এবং একক আধিপত্যের সুযোগও কমে আসবে। এতে যাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
‘হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস’কে ঘিরে চলমান বিতর্ক একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে—সাধারণ মানুষ এখন আর শুধু পরিবহন চলাচল চায় না, তারা চায় নিরাপদ সড়ক, ভদ্র আচরণ এবং মানসম্মত সেবা।
ধর্মঘট সাময়িক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু জনআস্থা অর্জন করতে পারে না। সেই আস্থা অর্জনের একমাত্র পথ হলো আইন মেনে চলা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যাত্রীকে সম্মান দেওয়া। সড়ক পরিবহন খাতের জন্য এটাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
আব্দুস সামাদ আজাদ,মৌলভীবাজার থেকে। 



















