সিলেট ১০:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
News Title :
‎সিলেটে কোতোয়ালী থানা পুলিশের অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত ও সুইচ গিয়ারসহ গ্রেফতার ২ ‎কোম্পানীগঞ্জে ৬৮ বোতল বিদেশী মদ ও এসকাফ সিরাপ সহ গ্রেফতার ২ ‎টাঙ্গাইলের মধুপুরে বসতঘর থেকে প্রায় ৪ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার ‎সুন্দর, মানবিক ও আলোকিত সমাজ গঠনে সাহিত্যের কোনো বিকল্প নেইঃ ভিসি প্রফেসর ড. জহিরুল হক‎ মাধবপুরে বাস-পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৫‎ ‘বীরাঙ্গনা মা’ ও ‘যুদ্ধ শিশু’ মেয়ের বাড়িঘর দখল চেষ্টার অভিযোগ চুনারুঘাটে মদ্যপান করে মাকে মারধর করার অভিযোগ যুবকের ৬ মাসের কারাদণ্ড ‎ড. মুমিনুল হক অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ প্রদান উপলক্ষে আলোচনা সভা‎ সিলেটে উদ্ধার হওয়া ৫২টি হারানো মোবাইল গ্রাহকদের বুঝিয়ে দিল এসএমপি ‎সাতছড়ি চাকলাপুঞ্জিতে সিএনজি দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল ব্যবসায়ীর

‎শেরপুরের মাছের মেলা‎ বিলীন হতে বসা দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য




পৌষসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের শেরপুরে বসে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি কেবল একটি বাজার নয়, বরং এক প্রাণের উৎসব। তবে কালের বিবর্তনে আবাসন সংকট, নদী ভরাট, দেশীয় মাছের অভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে ম্লান হতে বসেছে এই বিশাল আয়োজন। এক সময়ের জৌলুস হারিয়ে মেলাটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে টিকে আছে।

‎স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রায় দুই শতাব্দী আগে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ ইউনিয়নের সাধুহাটি এলাকার জমিদার মথুর বাবু প্রথম এই মেলার সূচনা করেন। তখন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ, আর মনু নদের তীরে বিশাল সব দেশীয় মাছে ভরে উঠত মেলা প্রাঙ্গণ। পরবর্তীতে মনু নদের ভাঙনে জায়গা সংকুচিত হলে মেলাটি সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের শেরপুর এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। গত অর্ধশতাধিক বছর ধরে এখানেই নিয়মিত বসছে এই আয়োজন।

‎প্রতি বছর পৌষসংক্রান্তির একদিন আগে মেলা শুরু হয়। এ বছর ১২ জানুয়ারি (রোববার) বিকেল থেকেই কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী বেরি বিল সংলগ্ন মাঠে ভিড় জমাতে শুরু করেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। সারা রাত পাইকারি বেচাকেনার পর সোমবার দিনভর চলে খুচরা বিক্রি।
‎আগে হাকালুকি, কাউয়াদীঘি, হাইল হাওর ও কুশিয়ারা নদী থেকে প্রচুর দেশীয় মাছ আসত। তবে এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে রাজশাহী ও খুলনা থেকে আসা চাষের মাছ। এবার মেলায় মাছের পরিমাণ ছিল তুলনামূলক কম, আর দাম ছিল আকাশচুম্বী।



‎মেলায় প্রায় ৫০ কেজি ওজনের একটি বাঘাড় মাছের দাম চাওয়া হয়েছে ৩ লাখ টাকা। ১০-১৮ কেজি ওজনের বোয়াল মাছ প্রতি কেজি ১,০০০ থেকে ২,২০০ টাকায় এবং ১১-১২ কেজি ওজনের আইড় মাছ ১,৮০০ থেকে ১,৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের ধারণা,এ বছর রাত-দিন মিলিয়ে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়েছে।

‎আফরোজগঞ্জ মৎস্য আড়তদার সোনার বাংলা মৎস্য আড়তের পরিচালক রাজু আহমদ বলেন, লোকাল মাছ কম, দাম বেশি। জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। অনেকে কেবল ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে লোকসান দিয়েও দোকান দেন।
‎খলিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু মিয়া চৌধুরী জানান, ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় মেলা বসার কারণে প্রতি বছরই জায়গা কমছে। নির্দিষ্ট স্থায়ী জায়গা না থাকায় আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না। তিনি মনে করেন, অন্তত ১৫ দিন আগে মেলার ইজারা (লিজ) সম্পন্ন করলে ব্যবসায়ী ও সরকার উভয়ই লাভবান হতো।



‎মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজিব হোসেন জানান, এ বছর মেলাটি প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে, যা থেকে সরকারের ১ লক্ষ ৮১ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। তিনি আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে অন্তত ১৫ দিন আগেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

‎একসময়ের নদী ও হাওরকেন্দ্রিক জীবনের প্রতিচ্ছবি এই মেলা এখন সংকুচিত বাস্তবতায় ধুঁকছে। শেরপুরের মাছের মেলা আজ কেবল কেনাবেচার স্থান নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই অনন্য ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‎সিলেটে কোতোয়ালী থানা পুলিশের অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত ও সুইচ গিয়ারসহ গ্রেফতার ২

‎শেরপুরের মাছের মেলা‎ বিলীন হতে বসা দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য

সময় ১১:৩৫:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬




পৌষসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের শেরপুরে বসে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি কেবল একটি বাজার নয়, বরং এক প্রাণের উৎসব। তবে কালের বিবর্তনে আবাসন সংকট, নদী ভরাট, দেশীয় মাছের অভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে ম্লান হতে বসেছে এই বিশাল আয়োজন। এক সময়ের জৌলুস হারিয়ে মেলাটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে টিকে আছে।

‎স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রায় দুই শতাব্দী আগে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ ইউনিয়নের সাধুহাটি এলাকার জমিদার মথুর বাবু প্রথম এই মেলার সূচনা করেন। তখন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ, আর মনু নদের তীরে বিশাল সব দেশীয় মাছে ভরে উঠত মেলা প্রাঙ্গণ। পরবর্তীতে মনু নদের ভাঙনে জায়গা সংকুচিত হলে মেলাটি সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের শেরপুর এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। গত অর্ধশতাধিক বছর ধরে এখানেই নিয়মিত বসছে এই আয়োজন।

‎প্রতি বছর পৌষসংক্রান্তির একদিন আগে মেলা শুরু হয়। এ বছর ১২ জানুয়ারি (রোববার) বিকেল থেকেই কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী বেরি বিল সংলগ্ন মাঠে ভিড় জমাতে শুরু করেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। সারা রাত পাইকারি বেচাকেনার পর সোমবার দিনভর চলে খুচরা বিক্রি।
‎আগে হাকালুকি, কাউয়াদীঘি, হাইল হাওর ও কুশিয়ারা নদী থেকে প্রচুর দেশীয় মাছ আসত। তবে এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে রাজশাহী ও খুলনা থেকে আসা চাষের মাছ। এবার মেলায় মাছের পরিমাণ ছিল তুলনামূলক কম, আর দাম ছিল আকাশচুম্বী।



‎মেলায় প্রায় ৫০ কেজি ওজনের একটি বাঘাড় মাছের দাম চাওয়া হয়েছে ৩ লাখ টাকা। ১০-১৮ কেজি ওজনের বোয়াল মাছ প্রতি কেজি ১,০০০ থেকে ২,২০০ টাকায় এবং ১১-১২ কেজি ওজনের আইড় মাছ ১,৮০০ থেকে ১,৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের ধারণা,এ বছর রাত-দিন মিলিয়ে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়েছে।

‎আফরোজগঞ্জ মৎস্য আড়তদার সোনার বাংলা মৎস্য আড়তের পরিচালক রাজু আহমদ বলেন, লোকাল মাছ কম, দাম বেশি। জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। অনেকে কেবল ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে লোকসান দিয়েও দোকান দেন।
‎খলিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু মিয়া চৌধুরী জানান, ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় মেলা বসার কারণে প্রতি বছরই জায়গা কমছে। নির্দিষ্ট স্থায়ী জায়গা না থাকায় আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না। তিনি মনে করেন, অন্তত ১৫ দিন আগে মেলার ইজারা (লিজ) সম্পন্ন করলে ব্যবসায়ী ও সরকার উভয়ই লাভবান হতো।



‎মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজিব হোসেন জানান, এ বছর মেলাটি প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে, যা থেকে সরকারের ১ লক্ষ ৮১ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। তিনি আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে অন্তত ১৫ দিন আগেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

‎একসময়ের নদী ও হাওরকেন্দ্রিক জীবনের প্রতিচ্ছবি এই মেলা এখন সংকুচিত বাস্তবতায় ধুঁকছে। শেরপুরের মাছের মেলা আজ কেবল কেনাবেচার স্থান নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই অনন্য ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।