সিলেট ০১:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
News Title :
বানিয়াচংয়ে জমকালো আয়োজনে স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট ও ইনোভেশন শোকেসিং প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত‎ ‎ক্লুলেস সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার রহস্য উদঘাটন, দুই আসামি গ্রেফতার ‎নবীগঞ্জের একমাত্র আসামি তুহিন সিলেট থেকে গ্রেফতার ‎লাখাইয়ে কর্মকর্তা সাংবাদিক  মুক্তিযোদ্ধা সহ সুশীল সমাজের সাথে মতবিনিময় করেন জেলা প্রশাসক। ‎জামালপুরের দিগপাইতে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: হত্যা নাকি আত্মহত্যা এ নিয়ে রহস্য!‎ ‎জামালপুরে গ্রাম আদালত সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে  পরিকল্পনা প্রণয়ন বিষয়ক কর্মশালা  ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রামু থেকে নিখোঁজ কলেজছাত্রী টাঙ্গাইলে উদ্ধার চুনারুঘাটে মাদকবিরোধী যৌথ অভিযান: নারীকে ৬ মাসের কারাদণ্ড, জরিমানা ‎সখিপুর পৌরসভায় ৩নং ওয়ার্ডে টানা বিদ্যুৎ বিপর্যয়: চরম ভোগান্তিতে হাজারো মানুষ জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাঠ পর্যায়ের কৃষি উন্নয়নমূলক ও মানবিক কার্যক্রম পরিদর্শন

‎শেরপুরের মাছের মেলা‎ বিলীন হতে বসা দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য




পৌষসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের শেরপুরে বসে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি কেবল একটি বাজার নয়, বরং এক প্রাণের উৎসব। তবে কালের বিবর্তনে আবাসন সংকট, নদী ভরাট, দেশীয় মাছের অভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে ম্লান হতে বসেছে এই বিশাল আয়োজন। এক সময়ের জৌলুস হারিয়ে মেলাটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে টিকে আছে।

‎স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রায় দুই শতাব্দী আগে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ ইউনিয়নের সাধুহাটি এলাকার জমিদার মথুর বাবু প্রথম এই মেলার সূচনা করেন। তখন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ, আর মনু নদের তীরে বিশাল সব দেশীয় মাছে ভরে উঠত মেলা প্রাঙ্গণ। পরবর্তীতে মনু নদের ভাঙনে জায়গা সংকুচিত হলে মেলাটি সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের শেরপুর এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। গত অর্ধশতাধিক বছর ধরে এখানেই নিয়মিত বসছে এই আয়োজন।

‎প্রতি বছর পৌষসংক্রান্তির একদিন আগে মেলা শুরু হয়। এ বছর ১২ জানুয়ারি (রোববার) বিকেল থেকেই কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী বেরি বিল সংলগ্ন মাঠে ভিড় জমাতে শুরু করেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। সারা রাত পাইকারি বেচাকেনার পর সোমবার দিনভর চলে খুচরা বিক্রি।
‎আগে হাকালুকি, কাউয়াদীঘি, হাইল হাওর ও কুশিয়ারা নদী থেকে প্রচুর দেশীয় মাছ আসত। তবে এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে রাজশাহী ও খুলনা থেকে আসা চাষের মাছ। এবার মেলায় মাছের পরিমাণ ছিল তুলনামূলক কম, আর দাম ছিল আকাশচুম্বী।



‎মেলায় প্রায় ৫০ কেজি ওজনের একটি বাঘাড় মাছের দাম চাওয়া হয়েছে ৩ লাখ টাকা। ১০-১৮ কেজি ওজনের বোয়াল মাছ প্রতি কেজি ১,০০০ থেকে ২,২০০ টাকায় এবং ১১-১২ কেজি ওজনের আইড় মাছ ১,৮০০ থেকে ১,৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের ধারণা,এ বছর রাত-দিন মিলিয়ে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়েছে।

‎আফরোজগঞ্জ মৎস্য আড়তদার সোনার বাংলা মৎস্য আড়তের পরিচালক রাজু আহমদ বলেন, লোকাল মাছ কম, দাম বেশি। জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। অনেকে কেবল ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে লোকসান দিয়েও দোকান দেন।
‎খলিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু মিয়া চৌধুরী জানান, ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় মেলা বসার কারণে প্রতি বছরই জায়গা কমছে। নির্দিষ্ট স্থায়ী জায়গা না থাকায় আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না। তিনি মনে করেন, অন্তত ১৫ দিন আগে মেলার ইজারা (লিজ) সম্পন্ন করলে ব্যবসায়ী ও সরকার উভয়ই লাভবান হতো।



‎মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজিব হোসেন জানান, এ বছর মেলাটি প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে, যা থেকে সরকারের ১ লক্ষ ৮১ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। তিনি আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে অন্তত ১৫ দিন আগেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

‎একসময়ের নদী ও হাওরকেন্দ্রিক জীবনের প্রতিচ্ছবি এই মেলা এখন সংকুচিত বাস্তবতায় ধুঁকছে। শেরপুরের মাছের মেলা আজ কেবল কেনাবেচার স্থান নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই অনন্য ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বানিয়াচংয়ে জমকালো আয়োজনে স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট ও ইনোভেশন শোকেসিং প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত‎

‎শেরপুরের মাছের মেলা‎ বিলীন হতে বসা দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য

সময় ১১:৩৫:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬




পৌষসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের শেরপুরে বসে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি কেবল একটি বাজার নয়, বরং এক প্রাণের উৎসব। তবে কালের বিবর্তনে আবাসন সংকট, নদী ভরাট, দেশীয় মাছের অভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে ম্লান হতে বসেছে এই বিশাল আয়োজন। এক সময়ের জৌলুস হারিয়ে মেলাটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে টিকে আছে।

‎স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রায় দুই শতাব্দী আগে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ ইউনিয়নের সাধুহাটি এলাকার জমিদার মথুর বাবু প্রথম এই মেলার সূচনা করেন। তখন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ, আর মনু নদের তীরে বিশাল সব দেশীয় মাছে ভরে উঠত মেলা প্রাঙ্গণ। পরবর্তীতে মনু নদের ভাঙনে জায়গা সংকুচিত হলে মেলাটি সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের শেরপুর এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। গত অর্ধশতাধিক বছর ধরে এখানেই নিয়মিত বসছে এই আয়োজন।

‎প্রতি বছর পৌষসংক্রান্তির একদিন আগে মেলা শুরু হয়। এ বছর ১২ জানুয়ারি (রোববার) বিকেল থেকেই কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী বেরি বিল সংলগ্ন মাঠে ভিড় জমাতে শুরু করেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। সারা রাত পাইকারি বেচাকেনার পর সোমবার দিনভর চলে খুচরা বিক্রি।
‎আগে হাকালুকি, কাউয়াদীঘি, হাইল হাওর ও কুশিয়ারা নদী থেকে প্রচুর দেশীয় মাছ আসত। তবে এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে রাজশাহী ও খুলনা থেকে আসা চাষের মাছ। এবার মেলায় মাছের পরিমাণ ছিল তুলনামূলক কম, আর দাম ছিল আকাশচুম্বী।



‎মেলায় প্রায় ৫০ কেজি ওজনের একটি বাঘাড় মাছের দাম চাওয়া হয়েছে ৩ লাখ টাকা। ১০-১৮ কেজি ওজনের বোয়াল মাছ প্রতি কেজি ১,০০০ থেকে ২,২০০ টাকায় এবং ১১-১২ কেজি ওজনের আইড় মাছ ১,৮০০ থেকে ১,৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের ধারণা,এ বছর রাত-দিন মিলিয়ে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়েছে।

‎আফরোজগঞ্জ মৎস্য আড়তদার সোনার বাংলা মৎস্য আড়তের পরিচালক রাজু আহমদ বলেন, লোকাল মাছ কম, দাম বেশি। জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। অনেকে কেবল ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে লোকসান দিয়েও দোকান দেন।
‎খলিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু মিয়া চৌধুরী জানান, ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় মেলা বসার কারণে প্রতি বছরই জায়গা কমছে। নির্দিষ্ট স্থায়ী জায়গা না থাকায় আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না। তিনি মনে করেন, অন্তত ১৫ দিন আগে মেলার ইজারা (লিজ) সম্পন্ন করলে ব্যবসায়ী ও সরকার উভয়ই লাভবান হতো।



‎মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজিব হোসেন জানান, এ বছর মেলাটি প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে, যা থেকে সরকারের ১ লক্ষ ৮১ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। তিনি আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে অন্তত ১৫ দিন আগেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

‎একসময়ের নদী ও হাওরকেন্দ্রিক জীবনের প্রতিচ্ছবি এই মেলা এখন সংকুচিত বাস্তবতায় ধুঁকছে। শেরপুরের মাছের মেলা আজ কেবল কেনাবেচার স্থান নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই অনন্য ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।