
শীতের নরম সন্ধ্যা।মৌলভীবাজার সদরের শেরপুর বাজারস্থ হাজী তোতা মিয়া মার্কেট প্রাঙ্গণে হাঁটতে হাঁটতে প্রথম যে শব্দটি কানে আসে—তা হলো কুরআনের পাখিদের মধুর তিলাওয়াত। সারি সারি দর্শক, শিশুর হাত ধরে বাবা, চাদর কাঁধে জড়ানো প্রবীণ মানুষ; সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ এক মঞ্চে। ঝলমলে আলো নয়, বরং কুরআনের সুরে উদ্ভাসিত হয়েছিল পুরো পরিবেশ। মনে হচ্ছিল এটি কোনো উৎসব নয়, বরং আধ্যাত্মিক মিলনমেলা—যেখানে তরুণেরা হাতে তুলে নিয়েছে নূরের পতাকা।
এ আয়োজন হামরকোনা বয়েজ ক্লাব শেরপুরের ৪র্থ বার্ষিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা ও নাশিদ সন্ধ্যা—২০২৫। তরুণদের উদ্যোগে টানা চার বছর ধরে এমন আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে—তারুণ্য শুধু প্রযুক্তিমুখী নয়, ধর্ম, নৈতিকতা ও মানবতার আলোয় সমাজকে আলোকিত করতেও সক্ষম।
৪১ মাদ্রাসা থেকে ৮১ হাফিজ—অপরাজেয় কণ্ঠের সমাবেশ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ৪১টি মাদ্রাসার ৮১ জন হাফিজ অংশ নেন প্রাথমিক পর্বে। কারও বয়স মাত্র ১১ বা ১২ বছর—তবুও কণ্ঠে ছিল পরিপক্বতা, আবেগ আর আয়াতের সৌন্দর্যপূর্ণ তিলাওয়াত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিচার চলছে। তাজবিদ,মখারিজ, সুরের ওঠানামা,সব মিলিয়ে পুরো প্রাঙ্গণ ভরে ওঠেছিল কুরআনের নূরানী সুরে।
কঠিন প্রতিযোগিতা শেষে ১২ জন প্রতিযোগী ফাইনালে উত্তীর্ণ হন।
ফাইনালের মুহূর্ত,যেখানে নিস্তব্ধতা শুধু কুরআনের সুরে ভাঙে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পরিবেশ আরও গম্ভীর, আরও মনোমুগ্ধকর হয়। মাইকের ভলিউম নিচু, দর্শকদের নিস্তব্ধতা গভীর—একজন প্রতিযোগী তিলাওয়াত শুরু করতেই বাতাস যেন বদলে যায়। মনে হয় প্রতিটি শব্দ হৃদয়ে কড়া নাড়ে—এটাই তো জীবনের আসল সৌন্দর্য, এটাই আত্মার প্রশান্তি। প্রবীণদের চোখে জল, আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোটদের মুখে বিস্ময়ের আলো—জীবন্ত হয়ে ওঠে ধর্মীয় সৌন্দর্য।
তারুণ্যের হাত ধরেই সমাজে আলো ছড়ানো সম্ভব
হামরকোনা বয়েজ ক্লাবের বেশিরভাগ সদস্যই তরুণ—কেউ কলেজে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবুও নিজেদের শ্রম, ভালোবাসা ও ঐক্য দিয়ে টানা চার বছর ধরে আয়োজন করে যাচ্ছেন হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা। স্পনসর কখনো কম, কখনো বেশি,তবুও থেমে যায়নি যাত্রা। তাদের বিশ্বাস ভালো কাজে মানুষ এক হলে অসম্ভব কিছু থাকে না। নাশিদ সন্ধ্যা,কাব্যময় আধ্যাত্মিক আবেশে মোহাচ্ছন্ন রাত, ফাইনাল শেষে শুরু হয় নাশিদ পরিবেশনা। তাল ও তর্জনীর ছন্দে গাওয়া ইসলামি গান ভেসে যায় শেরপুরের আকাশে। দর্শক গেয়ে ওঠে সাথে, কেউ আবেগে চোখ মুছে, কেউ নিঃশ্বাস ফেলে বলে, এমন আয়োজন আরও হওয়া উচিত।
আলো-শব্দের কোলাহলের যুগে ইমানি সুরে মোড়ানো এক রাত মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, মানুষের হৃদয় এখনও ভালো কিছুর প্রতীক্ষায় থাকে। অতিথিদের বক্তব্য,তরুণদের উদ্যোগের প্রশংসা অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন হাফিজ হুসাইন আহমদ শাহাবাজ, এবং সঞ্চালনা করেন মামুন মুজাহিদ। অতিথিরা আয়োজকদের এমন মহৎ উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
দৈনিক সমকাল মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি নূরুল ইসলাম বলেন,তরুণদের হাতে এমন সুন্দর ও নান্দনিক আয়োজন সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। কুরআনের চর্চা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
আজাদ বখ্ত উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিহাবুর রহমান বলেন,
এ আয়োজন শুধুই প্রতিযোগিতা নয়—চরিত্রগঠন, নৈতিক শিক্ষা ও সৎপথের আহ্বান।
এম এস আলম বলেন, যে সমাজে তরুণেরা ধর্ম ও মানবতার কাজে এগিয়ে আসে, সে সমাজ কখনো অগ্রগতির পথ হারায় না।
হামরকোনা বয়েজ ক্লাবের সাবেক সভাপতি উজ্জ্বল আহমেদ স্মৃতিমাখা অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, চার বছর ধরে এই আয়োজন বেড়ে উঠতে দেখেছি। আগামী প্রজন্ম এ পথকে আরও উজ্জ্বল করবে—এই বিশ্বাস আমার আছে।

ফলাফল ঘোষণা করা হয়, ১ম হাফিজ ইসমাঈল আবিদ জামিয়া রাহমানিয়া তাহফজুল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল, ২য় হাফিজ মোস্তাফিজুর রহমান
সিলেট মাদ্রাসাতুল হুফফাজ ইন্টারন্যাশনাল,
৩য় হাফিজ মোঃ ছাইফ উদ্দিন জালালপুর কাসিমুল উলুম মাদ্রাসা, ৪র্থ হাফিজ আদনান হুসাইন মাহিদ জামেয়া ইসলামিয়া ফরিদাবাদ সিলেট, ৫ম হাফিজ মুজাহিদুল ইসলাম জামেয়া মাসুমিয়া মাছিমপুর মাদ্রাসা।
রাত যখন গভীর হয়, আকাশে তারার ঝিকিমিকি। মঞ্চের আলো ম্লান, কিন্তু মানুষের চোখে সন্তুষ্টির আলো উজ্জ্বল। কেউ ট্রফি হাতে, কেউ নতুন স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফেরে। হয়তো কোনো শিশু মনে বলেই ফেলেছে, একদিন আমিও হবো হাফিজ, উঠবো এই মঞ্চে।
হামরকোনা বয়েজ ক্লাবের আয়োজনটি শুধু প্রতিযোগিতা নয়,এটি তরুণদের বিশ্বাস, মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতার জয়ধ্বনি।
ধর্মের আলোয় সমাজ আলোকিত হওয়াই এই আয়োজনের সুন্দরতম সফলতা।
আব্দুস সামাদ আজাদ মৌলভীবাজার প্রতিনিধি 



















