
সবুজে ঘেরা সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার এক মনোরম গ্রাম পৃত্থিমপাশা। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষ প্রাচীন এক ইতিহাস-পৃত্থিমপাশা জমিদারবাড়ি। জমিদার আমলের আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের এই অনন্য নিদর্শন আজও দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
একসময় এ এলাকা ছিল ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। তখন পাহাড়ি অঞ্চলে নওগা কুকি উপজাতিদের প্রভাব ছিল প্রবল। ১৭৯২ সালে শ্রীহট্ট সদরের (বর্তমান সিলেট) কাজী মোহাম্মদ আলী ইংরেজদের পক্ষে কুকিদের বিদ্রোহ দমন করেন। তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁর পুত্র নবাব আলী আমজাদ খাঁনকে প্রায় ১৪,৪০০ বিঘা জমি দান করেন। সেই থেকেই গড়ে ওঠে এই জমিদারবাড়ির ঐশ্বর্যময় ইতিহাস।
নবাব আলী আমজাদ খাঁন ছিলেন বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদারদের একজন। সমাজসেবায় তাঁর অবদান এখনো শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। সিলেট শহরের বিখ্যাত আলী আমজাদের ঘড়ি ও সুরমা নদীর চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি তাঁরই সৃষ্ট নিদর্শন।
পৃত্থিমপাশা জমিদারবাড়িতে রয়েছে দুটি বৃহৎ প্রাসাদ, জমিদার নির্মিত একটি শিয়া সম্প্রদায়ের ইমামবাড়া, শানবাঁধানো ঘাট এবং একটি সুবিশাল দীঘি। বাড়ির প্রতিটি দেয়াল, দরজা-জানালা, কারুকাজে ফুটে ওঠে প্রাচীন আভিজাত্যের ছাপ। আশপাশের গাছপালা ও খোলা প্রাকৃতিক পরিবেশ এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে করে তুলেছে আরও মনোমুগ্ধকর।

জমিদার বাড়ির ভেতর এখনো দেখা যায় পুরোনো আসবাব, লণ্ঠন, আয়না ও ব্যবহৃত সামগ্রী। আশ্চর্যের বিষয়—সবকিছুই আজও ঝকঝকে ও পরিচ্ছন্ন। জমিদার পরিবারের উত্তরসূরিরাই এখনো এর দেখভাল করেন।
ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বাড়িতে একসময় সফর করেছেন ত্রিপুরার মহারাজা রাধা কিশোর মানিক্য বাহাদুর, বহু ইংরেজ অভিজাত এবং এমনকি ইরানের রাজাও।
পৃত্থিমপাশা জমিদারবাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার পৃত্থিমপাশা ইউনিয়নে অবস্থিত। কুলাউড়া শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটি। সড়কপথে মৌলভীবাজার বা সিলেট থেকে সহজেই যাওয়া যায়। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এটি এক নিভৃত, শান্ত ও ইতিহাসঘেরা গন্তব্য।
যদি ইতিহাস, স্থাপত্য আর পুরনো ঐতিহ্য ভালোবাসো, তবে পৃত্থিমপাশা জমিদারবাড়ি তোমাকে নিয়ে যাবে জমিদার আমলের রঙিন রাজপ্রাসাদের গল্পে—যেখানে প্রতিটি ইট, প্রতিটি দেয়াল আজও যেন ফিসফিস করে বলে,“আমি ইতিহাসের সাক্ষী।”
আব্দুস সামাদ আজাদ,মৌলভীবাজার 


















