ডা. সাঈদ এনাম

বেশ আগের কথা। আমার চেম্বারে এলেন এক নববিবাহিত তরুণী। চোখে মুখে নতুন জীবনের দীপ্তি, আর চালচলনে এক অভাবনীয় কর্পোরেট ভাব। চেম্বারে পা রেখেই তিনি এমন এক আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বসলেন, যেন এটি কোনো রোগী দেখার কক্ষ নয়, বরং মাল্টিন্যাশনাল কোনো কোম্পানির ইন্টারভিউ বোর্ড, আর আমি খোদ প্রধান পরীক্ষক!
চেয়ারে বসেই শুরু করলেন তাঁর ভাষাগত কসরত। আধো বাংলা, আধো ইংরেজি, যাকে রম্য ভাষায় ‘বাংলিশ’ বলা হয়।
আমি ছোটবেলা থেকেই ইংরেজিতে কিছুটা কাঁচা। তার উপর বাংলিশ ভাষা।
তবে রোগীর কষ্ট বোঝার জন্য প্রাণপণ কান সজাগ করে রাখলাম। ভাবলাম, উচ্চারণ বা ব্যাকরণ যেমনই হোক, রোগীর বেদনার মর্মার্থ উদ্ধার করাই তো একজন চিকিৎসকের প্রথম ও প্রধান ধর্ম!
কথার একপর্যায়ে তিনি বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে খোপায় হাত দিয়ে বলে উঠলেন,
: ইন মিডনাইট, মাই হেড হট, মাই হেড রাউন্ড অ্যান্ড মাই হেড কিট কিট এট -মিড নাইট!
শুরু থেকেই তাঁর ইউকে-বাংলা ভাষার গোলকধাঁধায় আমি খেই হারাচ্ছিলাম! এবার পড়লাম বিপদে। কি শুনলাম!
কোনোমতে কৌতূহল আর দায়িত্ববোধ থেকে জিজ্ঞেস করলাম,
: প্লিজ! হোয়াট ডু ইউ মিন বাই মাই হেড হট, মাই হেড রাউন্ড অ্যান্ড মাই হেড কিট কিট এট মিড নাইট ?
তরুণী আমার এই ‘ব্যাকডেটেড’ বাংলায় যেন রীতিমতো বিরক্ত হলেন।
চোখ গোল গোল করে বললেন,
: ওহ! বুঝেন নি? মানে রাইতে বেরাইতে আমার মাথা গরম হয়ে যায়, মাথা ঘোরায়, আর মাথার মধ্যে কিট কিট করে কেমন জানি করে!
আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক বাবা, রোগ তাহলে পরমাণু বা পদার্থবিদ্যা নয়, সাধারণ মাইগ্রেন বা এনজাইটি টেনশন হেডেক জাতীয়! মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললাম,
: ওহ! সরি! ফাইন, ফাইন! এই সমস্যা।
তাঁর সমস্যার জন্যে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রেসক্রিপশন লিখে দিলাম।
বিদায়ের মুহূর্তে মানসিক রোগের হালকা কোন উপসর্গ আছে কিনা জানতে বললাম,
: আপনিতো দারুণ ইংরেজি বলেন! কাহিনিটা কী একটু বলবেন?
তরুণী তাঁর ঈষৎ লালচে কালো তরমুজের বিচির মতো দাঁত ক’টা বের করে হাসি দিয়ে বললেন,
: ওহ ডক্টর! ইউ আর ভেরি ফানি এন্ড বিউটিফুল ম্যান! আর বইলেন না। আমার সদ্য বিয়ে হয়েছে। হাজবেন্ড থাকেন লন্ডন। আই মিন, ইউকে! আমিও লন্ডন যাওয়ার ফুল প্রসেসিংয়ে আছি। পাসপোর্ট এম্ব্যাসিতে দিয়ে দিছি দি ডে বিফোর ইয়েস্টারডে। ভিসা জাস্ট অন দ্য লাইন!
একটু দম নিয়ে কেশে গলার ভলিউম বাড়িয়ে দিলেন,
: বাই দা ওয়ে, অ্যান্ড ইউ নো, সেখানে থাকতে গেলে ফ্লুয়েন্ট ইংলিশ বলা মাস্ট! তাই তো আমি ‘ধানসিঁড়ি’ IELTS & SPOKEN সেন্টারে ভর্তি হয়েছি। স্যার আমাকে কড়া ওয়ার্নিং দিয়ে দিছেন, নো বাংলা! নেভার বাংলা! বাংলায় টকিং করলে জিহ্বা জড়তা নাকি সহজে খুলবে না, ফ্লো নষ্ট হয়ে যাবে! সেজন্যে ইংলিশ প্রেক্টিসের পাশাপাশি জড়তা কাড়াতে পান সুপারি খাচ্ছি।
কথাটা শেষ করেই তিনি তাঁর জিহ্বাটা সামান্য বের করে আমাকে রীতিমতো প্রদর্শন করে বললেন,
: আন্ডারস্ট্যান্ড?
দেখলাম, জিহ্বাটা ঈষৎ লম্বাই নয়, তার রংও খানিকটা আষাঢ় মাসের পাকা জামের মতো লালচে-কালো! বুঝতে বাকি রইল না এর কারণ। ইংরেজি শেখার এই মহাঅভিযানের পাশাপাশি জিহ্বা বেচারার জড়তা কাটাতে ‘হাকিমপুরী জর্দা-পান-সুপারির লাল মিশ্রণ’ তৈরি করতে তাকে সারা দিনমান গ্রামবাংলার ‘ঢেঁকির’ মতো বিরামহীন টানা ডিউটি করতে হয়!
বললাম,
: জ্বি, আন্ডারস্ট্যান্ড! চমৎকার কৌশল! ভেরী ফাইন। প্রশংসা শুনে তরুণী যেনো আরও উজ্জীবিত হয়ে গেলেন,
: ডক্টর, ইউ নো, জিহ্বা ইজি না হলে ইংলিশ স্পোকেন ইজি হয় না! টেলিফোনে আমার হাজবেন্ড আমার সঙ্গে অলওয়েজ ইংরেজিতেই টক করেন। আই অলসো টক ভেরি গুড ইংলিশ। মাই হাজবেন্ড টু মাচ অ্যাপ্রিশিয়েট মি! বাই দ্য বাই, বাংলায় টকিং করলে মাই হাজবেন্ড ভীষণ রাগ করেন, টু মাচ মাইন্ড ও করে! দ্যাটস হোয়াই…., সারাদিন ইংলিশ প্র্যাকটিস করি!
এতোক্ষণে বাংলিশ ভাষায় নির্যাতনে আমার কপালে শিশিরের মতো ঘাম জমতে শুরু করেছে। মনে মনে ভাবলাম, রোগীর মাথার ‘কিট কিট’ তো ওষুধের নিয়মে ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু আমার মাথায় যে টিক টিক শুরু হলো তার কি হবে।
প্রেসক্রিপশনটা তাঁর হাতে দিয়ে রুমের দরজার দিকে মৃদু ইশারা করে বললাম, : গুড! ভেরি গুড! গুড স্পিকিং! হোপ ইউর ড্রিমস কাম ট্রু সুন। নাও, ইট দিস মেডিসিন। শিওর থাকুন, আপনার হেড আর কখনোই কিট কিট করবে না! রাত বিরাতে হট হবে না, রাউন্ড ও করবেনা। তবে হ্যাঁ, আজ থেকেই পান-সুপারিটা চিরতরে বন্ধ। ইট ইজ ডেঞ্জারাস, ক্যান্সার!
তরুণী হাত উঁচিয়ে হাই বলে একটা বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, : ডক্টর! ইউ আর সো বিউটিফুল! ইউ অলসো স্পিক ইংলিশ ভেরি ভেরি নাইস! ওকে, ফিউচার থেকে আই উইল নট ইট পান সুপারি। আই নো, ইট মেক টিথ অ্যান্ড টাং রেড!
অত:পর গ্রাম বাংলায় যত্রতত্র দেখা পাওয়া নির্বিষ হলুদ কালো ডোরা কাটা ঢোঁড়া সাপের ( Checkered Keelback) মতো হেলে দুলে ‘ক্যাট-ওয়াক’ করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আমার মাথার ভেতর তখনো সেই ” মাই হেড কিট কিট, মাই হেড হট এন্ড মাই হেড রাউন্ড রাউন্ড” বাক্য ক’টা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। অ্যাসিস্ট্যান্টকে ডেকে বললাম, জলদি এক গ্লাস বরফ ঠান্ডা পানি লাগবে।
লেখক- এমবিবিএস (ডিএমসি, কে-৫২), এমফিল (সাইকিয়াট্রি) বিসিএস হেলথ ২৪) সহযোগী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি।
(রম্যরচনা) 

















