ডা. সাঈদ এনাম

স্কুলের শেষ পরীক্ষা মানেই যেন মুক্তির সায়ন। গরমের ছুটিতে শহরের কোলাহল আর কংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে যখন গ্রামের বাড়ির পথ ধরি, মনে হতো যেন এক অন্য গ্রহে পা রেখেছি। আর সেই আগমনের পথেই অপেক্ষায় থাকত আমাদের ছোট্ট প্রিয়তম বন্ধু সেই পুরোনো ইটের ব্রীজটা।
ব্রীজের দুপাশের দেয়াল আমাদের নিরাপত্তার দেয়াল হলেও, আমরা জানতাম সেটা আসলে রোমাঞ্চের মঞ্চ। বিকেল গড়ালেই মাঠের ধুলো মেখে আমরা ছুটে আসতাম ওই ব্রীজের ওপর। নিচে বয়ে যাওয়া পানির স্রোত একেবারে স্বচ্ছ, যেন চোখ ধাঁধানো কাঁচের টুকরো। পানি যেমন কলকল করে গান গাইত, তেমনি মনও হারিয়ে যেত তার অনন্ত যাত্রায়।
আমাদের খেলা ছিল সরল, কিন্তু রোমাঞ্চ অফুরন্ত। একপাশ থেকে আমরা ফেলে দিতাম শুকনো পাতা ভাসতে ভাসতে সেই পাতা হয়ে উঠত একেকটি জাহাজ। কার জাহাজ আগে অন্যপ্রান্তে পৌঁছায়, সেটা নিয়ে হতো চিৎকার চেঁচামেচি, খুশির ফোয়ারা। আর যদি কারও কোনো পাতা আটকে যেত ব্রীজের পিলারের গা ঘেঁষে কিংবা লাতা পাতায়, সঙ্গে সঙ্গেই তার ভাগ্য গণনা শুরু! হয়তো আগামীকাল তাকে স্কুলে দাঁড়াতে হবে বেঞ্চের উপর, নয়তো দুষ্টুমির শাস্তি পেতে হবে বাবা বা মা’র কাছ থেকে।
খেলা শেষে আমরা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখতাম সেই পাতাগুলোকে। একটা একটা করে হারিয়ে যাচ্ছে দৃষ্টির ওপারে, খালের বাঁক পথ ধরে দূর গাঁয়ের দিকে। মনে হতো, বুঝি তারা কোনো রূপকথার দেশে যাত্রা করল, যেখানে নেই কোনো স্কুল, পরীক্ষা, নেই কোনো শাসন। আর এই ভাবনার মধ্যেই সন্ধ্যার আঁধার নামত, ঘরের ডাক পৌঁছাত কানে আর আমাদের ছোটাছুটি শুরু হত বাড়ির দিকে।
ব্রীজের ওপরে ভূতের গল্প ছিল আমাদের রোমাঞ্চের আরেক অধ্যায়। সন্ধ্যা নামলেই পুরোনো জনশ্রুতি ছিল, ভূতেরা নাকি ব্রীজের নিচে গোসল করতে নামে! সুযোগ পেলে ভুত ধাক্কা দিতে পারে। আমরা এগুলো বিশ্বাস করতাম নিষ্ঠার সঙ্গে। তাই সন্ধ্যার আগেই দল বেঁধে ছুটতাম পেছনে যেনো ভুত আমাদের তাড়া করছে! সেই দৌড়ে পেছনে পড়লে বুক দুরুদুরু করত, কিন্তু আজ সেটাই এক মধুর স্মৃতি।
কত বছর কেটে গেল! ব্রিজের ইট হয়তো নুয়ে পড়েছে, নিচের খাল শুকিয়ে গেছে, কিংবা বদলে গেছে পথঘাট। আমাদের জীবনগুলোও যেন কলকল করে বয়ে চলা জীবন-নদীর স্রোতে ভেসে চলা পাতার মতো কোনো পাতা থেমে গেছে, কোনো পাতা এগিয়ে গেছে দৃষ্টির সীমানা হারিয়ে, দূর বহু দূরে। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস, স্রোতের কলকল ধ্বনি, পাখির কিচিরমিচির, দুষ্টু বন্ধুদের হৈ-হুল্লোড় এসব আজও বেঁচে আছে হৃদয়ের সবচেয়ে উষ্ণ কোণে।
লেখক- বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
গল্প-আড্ডা 



















