
বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম হিসেবে পরিচিত হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘গড়ের খাল’। মোগল আমলে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে জনপদকে রক্ষা করতে গ্রামের চারদিকে যে প্রতিরক্ষা পরিখা খনন করা হয়েছিল, তা-ই আজ গড়ের খাল নামে পরিচিত।
১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ঐতিহাসিক খালটি বর্তমানে দখল, দূষণ ও সংস্কারের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ফলে একদিকে যেমন ঐতিহ্যের অপমৃত্যু ঘটছে, অন্যদিকে তীব্র সেচ ও পানি সংকটে পড়ছেন স্থানীয় কৃষকরা।
এক সময় এই ১৯ কিলোমিটার খাল দিয়ে নৌকাযোগে পুরো বানিয়াচং গ্রাম প্রদক্ষিণ করা যেত। বিগত সরকারের আমলে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক কিছু খনন কাজ ও পর্যটন কেন্দ্রিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে পুনরায় খাল ভরাটের মহোৎসব শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের দখলদারিত্বের কারণে খালের নাব্যতা হারিয়ে এখন মরণদশায় পরিণত হয়েছে।
বানিয়াচংয়ের কৃষি অর্থনীতির বড় একটি অংশ বোরো চাষের ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে গড়ের খাল হতে পারতো পানির প্রধান উৎস। কিন্তু খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় বোরো মৌসুমে কৃষকরা প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছেন না। ফলে ব্যাহত হচ্ছে আবাদ, হুমকির মুখে পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা।
যদি গড়ের খাল পরিকল্পিত ভাবে খনন করা হয় তা হলে আধুনিক প্রদ্ধতিতে মাছ চাষ ও পর্যটনের বিকাশ ঘটবে। একদিকে স্থানীয় সাধারণ অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি পর্যটনের অপার সম্ভাবনা দেখা দিবে।
বানিয়াচংয়ের পরিবেশগত পরিস্থিতি এখন চরম উদ্বেগজনক। মাঘ মাসের শেষ থেকে বৈশাখ পর্যন্ত এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ গভীর ও অগভীর নলকূপে পানি পাওয়া যায় না। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। পরিবেশবিদদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে পুকুর, ডোবা ও খাল ভরাট করার ফলে প্রাকৃতিক জলাধার কমে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপর।
বর্তমান সরকারের ৩১ দফার মধ্যে অন্যতম ছিল খাল খনন ও জলাশয় রক্ষা। বানিয়াচংবাসীর প্রত্যাশা, স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
এলাকাবাসীর প্রধান দাবিগুলো হলো,গড়ের খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা। আধুনিক ও পরিকল্পিত খনন কাজের মাধ্যমে পানির নাব্যতা ফিরিয়ে আনা। খালটিকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো বলে বানিয়াচংবাসীর দাবী।
অনুমতি ছাড়া পুকুর বা প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক আইন প্রয়োগ করার দাবী জানান পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বানিয়াচংয়ের ঐতিহ্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে ‘গড়ের খাল’ সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, পরিবেশের ক্ষতি করে কোন ক্ষমেই জলাশয় খাল-নানা, ডোবা ও পুকুর ভরাট করার সুযোগ নেই। গড়ের খাল একটি ইতিহাসের অংশ। কোন ক্রমেই খাল ভরাট বা দখল করা উচিৎ নয়। তিনি বলেন, বিগত দিনে গড়ের খাল খনন নিয়ে অনিয়মের খবর আমরা পেয়েছি। নতুন সরকার কাছে প্রত্যাশা নিয়মতান্ত্রিক ভাবে খাল-নালা-বিল ডোবাসহ বিভিন্ন জলাশয় খনন করে পানির উৎস ধরে রাখা। জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতিক ঠিক রাখতে এসবের বিকল্প নেই। অবৈধ ভাবে ভরাট ও দখলরোধে প্রশাসনের আরো কঠোর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
আবদুল হক মামুন। 

















