
চায়ের রাজধানী খ্যাত মৌলভীবাজার যেন দীর্ঘ ১৭ বছর পর আবার নিজের চেনা রূপে ফিরল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ উপলক্ষে জেলার প্রতিটি ভোটকেন্দ্র রূপ নেয় উৎসবমুখর মিলন মেলায়। বহুদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগে মুখর হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষ।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই ভোটারদের দীর্ঘ লাইন—হাতে জাতীয় পরিচয়পত্র, চোখে প্রত্যাশার দীপ্তি। এই দৃশ্য দেখে অনেক প্রবীণ ভোটার আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন,এমন ভোট আমরা বহু বছর দেখিনি জনগণ।
নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু করতে সক্রিয় ছিল সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আনসার, প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন–এর সদস্যরা। কোথাও বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি। বরং ভোটাররা সহজেই খুঁজে পেয়েছেন নিজের ক্রমিক নম্বর ও ভোটকক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে যে আতঙ্ক, শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে ভোট শব্দটি জড়িয়ে ছিল—এবারের নির্বাচন সেই অধ্যায় পেছনে ফেলে নতুন এক আস্থার জন্ম দিয়েছে।
এক সময় দিনের ভোট রাতে হওয়ার অভিযোগ, ভোটারশূন্য কেন্দ্র, ভয় আর নিস্তব্ধতার চিত্র ছিল পরিচিত বাস্তবতা। এবারের নির্বাচনে সেই চিত্র বদলে যায়। প্রবাসীরাও পোস্টাল ভোটের পাশাপাশি নিজ এলাকায় ফিরে এসে ভোট দিয়েছেন। অনেকের চোখেমুখে ছিল স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ।
এই সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ফলাফল হিসেবে মৌলভীবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনেই ভূমিধস বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা তৌহিদুজ্জামান পাভেল কন্ট্রোলরুমে রাত সোয়া ২টায় চারটি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেন। তিনি জানান, জেলার ৫৫৮টি ভোট কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিলেন ১৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৩৬ জন। মোট ভোট পড়েছে ৫১ দশমিক ২৭ শতাংশ। পোস্টাল ভোট নিবন্ধন ছিল ২৩ হাজার ৭৩৬টি, যার মধ্যে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছায় ১৬ হাজার ৮৬২টি। বাতিল হয় ১ হাজার ৪৬৪টি ভোট।
আসনভিত্তিক ফলাফল, মৌলভীবাজার–১ (বড়লেখা ও জুড়ী) বিএনপির মো. নাসির উদ্দিন আহমদ মিঠু ধানের শীষ প্রতীকে ৯৮ হাজার ২৮২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। জামায়াতের মাওলানা আমিনুল ইসলাম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ৮৩ হাজার ১৩ ভোট। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পড়েছে ১ লক্ষ ৪ হাজার ৬৯৬ এবং ‘না’ পড়েছে ৭৯ হাজার ৫২৭ ভোট।
মৌলভীবাজার–২ (কুলাউড়া),
বিএনপির আলহাজ্ব শওকতুল ইসলাম শুকু ধানের শীষে ৬৮ হাজার ৩৮১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জামায়াতের জেলা আমীর ইঞ্জিনিয়ার মো. সাহেদ আলী পান ৫৩ হাজার ৪৫৮ ভোট। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পড়েছে ৮৩ হাজার ৯৩০ এবং ‘না’ পড়েছে ৬৭ হাজার ৯৩৫ ভোট।
মৌলভীবাজার–৩ (সদর ও রাজনগর):
বিএনপির এম নাসের রহমান ধানের শীষ প্রতীকে ১ লক্ষ ৫৬ হাজার ৭৫৭ ভোট পেয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন। জামায়াত প্রার্থী পান ৭৭হাজার ৬৩৬ ভোট। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পড়েছে ১লক্ষ ৩৩ হাজার ৯১৬ এবং ‘না’ পড়েছে ৭৮ হাজার ৬৭১ ভোট।
মৌলভীবাজার–৪ (কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল):
বিএনপির মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী ধানের শীষে ১ লক্ষ ৭০ হাজার৮৭৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী শেখ নূরে আলম হামিদী পান ৫০ হাজার ২০৪ ভোট। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পড়েছে ১ লক্ষ ২৭ হাজার ৪২৮ এবং ‘না’ পড়েছে ১লক্ষ ৭ হাজার ৬৩৩ ভোট।
জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান–এর নিজ জেলা ও উপজেলায় বিএনপির এই ভূমিধস বিজয়কে ভিন্ন মাত্রায় দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়—বরং জেলার রাজনৈতিক ভারসাম্যে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তিনটি আসনে জামায়াতের পরাজয় এবং বিএনপির নিরঙ্কুশ সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শুরু থেকেই হারানো আসন পুনরুদ্ধারে মাঠে সক্রিয় ছিল বিএনপি। দলের ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে তারা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছান। ভোটাররাও এই বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করেছেন বলেই এমন প্রত্যাশিত সাফল্য এসেছে বলে মনে করছেন দলের জেলা, উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
দলীয় সূত্র জানায়, গত ২২ জানুয়ারি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আইনপুরের মাঠে অনুষ্ঠিত দেশের দ্বিতীয় নির্বাচনী জনসভায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জেলার চারটি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভোটের মাধ্যমে বিজয়ী করলে ভবিষ্যতে মৌলভীবাজারে এসে জেলার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত করবেন।
দীর্ঘদিন উন্নয়ন বঞ্চিত জেলার মানুষ তার এই বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ধানের শীষে ভোট দিয়ে সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন—এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।
আব্দুস সামাদ আজাদ, মৌলভীবাজার থেকে। 



















