
টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে ৭ বছরের শিশু কন্যা মারিয়া আক্তার মিমকে ধর্ষণের পর হত্যার চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। কোনো ক্লু না থাকা এই মামলায় ৪৮ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানে মূল অভিযুক্তসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়,গত ২৬ জানুয়ারি ধনবাড়ী থানার যদুনাথপুর ইউনিয়নের বাড়ইপাড়া গ্রামের উজ্জ্বল হোসেনের মেয়ে মারিয়া আক্তার (০৭) নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের পর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পরিবার। ১ ফেব্রুয়ারি সকালে স্থানীয় একটি পরিত্যক্ত ঘরের স্টিলের ট্রাংকের ভেতর থেকে মারিয়ার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিকভাবে জমিজমা বিরোধের জেরে রাফি ও সুমন নামে দুইজনকে আটক করা হলেও তাদের সম্পৃক্ততার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল না! পরবর্তীতে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকারের নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) ও সহকারী পুলিশ সুপার (মধুপুর সার্কেল) ঘটনাস্থল পুনরায় পরিদর্শন করেন। পরিত্যক্ত অন্য একটি ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া একটি পুঁথির মালা তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
গত ২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে ধনবাড়ী বাসস্ট্যান্ডে আয়োজিত মানববন্ধনে আসামী সাজিবের নাম আসে, মানববন্ধন চলাকালীন সময় সেখান থেকেই কৌশলে সাজিবকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদে সাজিব স্বীকার করে যে, তার পাহারায় আরও দুই কিশোর মৃদুল (১৫) ও রায়হান কবীর (১৬) মারিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। পরে মরদেহটি গুম করার উদ্দেশ্যে পরিত্যক্ত বাড়ির ট্রাংকে লুকিয়ে রাখা হয়। সাজিবের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে মৃদুল ও রায়হানকে গ্রেফতার করে। তারা তিনজনই একই এলাকার বাসিন্দা।
সহকারী পুলিশ সুপার (মধুপুর সার্কেল) মোঃ আরিফুল ইসলাম এবং ধনবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ নূরুস সালাম সিদ্দিক জানান, এটি একটি সম্পূর্ণ ক্লুলেস মামলা ছিল।
কিন্তু উন্নত তদন্ত ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেফতারকৃত তিন আসামীই বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।সহকারী পুলিশ সুপার (মধুপুর সার্কেল) আরিফুল ইসলাম বলেন, অপরাধীরা সবাই কিশোর। তাই সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী আদালতের নির্দেশনা মেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মামলাটি বর্তমানে (ধারা-৩০২/২০১/৩৪ পেনাল কোড) তদন্তাধীন রয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, গত ২৬ জানুয়ারি বিকেল ৩টার দিকে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় মারিয়া। খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে প্রথমে সাধারণ ডায়েরি এবং পরে ১ ফেব্রুয়ারি ধনবাড়ী থানায় মামলা করেন তার বাবা উজ্জ্বল। রোববার ১ ফেব্রুয়ারি ভোরে যদুনাথপুর ইউনিয়নের বাড়ইপাড়া গ্রামে মৃত শাহাদত হোসেনের পরিত্যক্ত ঘর থেকে দুর্গন্ধ পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পরে ওই ঘরের ভেতরে থাকা স্টিলের ট্রাঙ্ক থেকে মারিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত মারিয়া বাড়ইপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র উজ্জ্বলের সন্তান। সে বাবা-মায়ের সঙ্গে নানাবাড়ির একটি ছোট ঘরে বসবাস করত।
এ ঘটনায় শুরুতে সন্দেহভাজন হিসেবে সুমন (২৬) ও রাফিউল (২২) নামের দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তদন্তে প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে জড়িত কিশোরদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
ধনবাড়ী থানার ওসি নুরুস সালাম সিদ্দিক জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই অপরাধীদের আটক করা হয়েছে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
নিহত শিশুর মা জবেদা, নানা ময়নাল হোসেন, স্থানীয় ইউপি সদস্য মিজানুর রহমানসহ এলাকাবাসী দ্রুত বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল রয়েছে ধনবাড়ী উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ।
হ্যাপি আক্তার, টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি। 















