
বিশ্বের শীর্ষ স্বাস্থ্যখাতের দেশগুলোর জনসংখ্যা অনুপাত ডাক্তার যেখানে সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত, সেখানে বাংলাদেশের চিত্র যেন এক নির্মম হিসাবনিকাশ। ফিনল্যান্ডের প্রতি ২৫০ জনে ১ জন ডাক্তার, ডেনমার্ক ও জাপানে ২৫০-৩০০, ইংল্যান্ডে ৩০০, যুক্তরাষ্ট্রে ৪০০ এই সংখ্যাগুলো যেখানে স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি, সেখানে বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে একজন ডাক্তারকে গুনতে হয় প্রায় ১,৫০০ রোগী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত অনুপাতের চেয়ে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক।
সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সর্বত্রই রোগীর ঢল। বহির্বিভাগে লম্বা সারি, জরুরি বিভাগে পদপিষ্ট হওয়ার উপক্রম, আর সীমিত জনবল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত একদল চিকিৎসক। একজন ডাক্তার একটি শিফটেই যখন শতাধিক রোগী দেখতে বাধ্য হন, তখন প্রতিটি রোগীর জন্য বরাদ্দ সময় নেমে আসে মাত্র কয়েক মিনিটে।
অথচ সঠিক রোগনির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন সময়, ধৈর্য, রোগীর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা শোনার মানসিকতা যা এই চাপের মধ্যে একপ্রকার অসম্ভব।
এমন নয় যে ডাক্তাররা চান না সময় দিতে কিন্তু তাদের হাত-পা বাঁধা এই পরিসংখ্যানের শৃঙ্খলে। টানা ৩৬ ঘণ্টার ডিউটি, রাত জাগরণ, খাবার-ঘুমের অনিয়ম, জরুরি মুহূর্তে বাড়তি দায়িত্ব সব মিলিয়ে তাদের জীবন হয়ে ওঠে এক নিরন্তর দৌড়। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী এই কর্মচাপ ডাক্তারদের মধ্যে গুরুতর মানসিক অবসাদ, বার্নআউট ও শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দুষ্টচক্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উভয় পক্ষই।
করণীয়?
প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স তৈরি, প্রশিক্ষিত কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার বাড়ানো, টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে গ্রামীণ সেবা জোরদার করা এবং চিকিৎসকদের জন্য মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। কারণ ডাক্তার কোনো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র নন তিনি মা-বাবার সন্তান, সংসারের অভিভাবক, আবেগ-ক্লান্তি-স্বপ্নের এক মানবসত্তা।
চিকিৎসকের সুস্থতা নিশ্চিত করাই প্রকৃতপক্ষে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় উপায়। কারণ যে দেশ তার চিকিৎসকদের মানবিক মূল্য দেয় না, সে দেশ কখনোই সুস্থ জাতি গড়তে পারে না।
লেখক- এমবিবিএস (ডিএমসি) এমফিল (সাইকিয়াট্রি)
সহযোগী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি।
ইন্টারন্যাশনাল ফেলো: আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন
ডা. সাঈদ এনাম 
















