সিলেট ০৬:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
News Title :
যুক্তরাজ্যে পাঠানোর নামে কোটি টাকা আত্মসাৎ: গোলাপগঞ্জে র‍্যাবের জালে প্রতারক চক্রের মূলহোতা কয়েছ সিলেটে র‍্যাবের পৃথক অভিযান: ১.৭ কেজি গাঁজা ও ১৭ পিস ইয়াবাসহ ২ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার ‎গোয়াইনঘাটে মাধ্যমিক স্কুল ভিত্তিক বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত গোয়াইনঘাটে উৎসবমুখর পরিবেশে ‘পুসাগ গণিত অলিম্পিয়াড ২০২৬’ উদ্বোধিত ‎আয়না দেখা: এক বিরল কেইস হিস্ট্রি‎ ‎সিলেটে র‍্যাব ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযান: ৫ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা‎ মাও. ফয়জুল হাসান (র.)এর রুহের মাগফেরাত কামনায় আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল ‎তারেক রহমানের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ নিরাপদ: এমপি কয়ছর আহমেদ। ‎গোয়াইনঘাটে ধর্ষণ মামলার আসামি গ্রেপ্তার, তদন্তে গিয়ে ভাই নিহতের ঘটনায় নতুন মোড়! ‎গোয়াইনঘাটে জাতীয় মৎস্য পক্ষ উদযাপিত: সফল মৎস্য চাষীদের পুরস্কার প্রদান‎

‎আয়না দেখা: এক বিরল কেইস হিস্ট্রি‎

‎ডা. সাঈদ এনাম

‎ডা. সাঈদ এনাম


‎দর্পনী (ছদ্মনাম) ২৪ বছর বয়সী, গত প্রায় দুই বছর ধরে এক অদ্ভুত ও কষ্টদায়ক সমস্যায় ভুগছেন। তাঁর স্বামী বিদেশে থাকেন। তিনি বারবার আয়নায় নিজের মুখ দেখেন। কিছুক্ষণ পরপরই যেন অদৃশ্য এক তাগিদে আবার আয়নার সামনে ফিরে আসেন। দিনে ৫০ থেকে ৮০ বার তিনি নিজের মুখ আয়নায় দেখেন, পরীক্ষা করেন।

‎দর্পনীর মনে হয়, তাঁর মুখে দাগ হয়েছে, দাগগুলো দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, মুখ বেঁকে যাচ্ছে, তাঁর লুক ও আকর্ষণ কমে যাচ্ছে, চেহারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কিংবা তাঁকে দেখতে খারাপ লাগছে। এই আশঙ্কা থেকেই তিনি বারবার আয়নায় নিজের মুখ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন কখনো নির্দিষ্ট কোনো দাগ খুঁজতে, কখনো মুখের আকৃতি পরীক্ষা করতে।

‎কিন্তু বিষয়টি আরও অদ্ভুত। বাস্তবে তাঁর মুখে এমন কোনো দৃশ্যমান দাগ বা বিকৃতি নেই, যা তিনি বারবার আয়নায় খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এমনকি সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছেও তিনি তাঁর কথিত মুখের দাগটি স্পষ্টভাবে দেখাতে পারেননি।

‎আয়না সামনে না থাকলে তাঁর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ, অস্বস্তি ও অস্থিরতা তৈরি হয়। তাই ঘরের প্রায় সর্বত্রই তিনি আয়না রেখেছেন শোবার ঘর, বাথরুম, রান্নাঘর, বারান্দা, সিঁড়ি, এমনকি নামাজের ঘরেও। বাইরে বের হলে ভ্যানিটি ব্যাগে আয়না সঙ্গে রাখেন। আয়না যেন তাঁর কাছে এক ধরনের “নিরাপত্তার আশ্রয়” হয়ে উঠেছে।

‎এই আচরণে পরিবারের সদস্যরাও অতিষ্ঠ। বিশেষ করে তাঁর শাশুড়ি সারাক্ষণ আয়না দেখার বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত বিরক্ত। পরিবারের লোকজন বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেন“তোমার চেহারায় তো কোনো সমস্যা নেই।” তার ননদ ও তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা বিফল। কিন্তু দর্পনী সহজে তা মেনে নিতে পারেন না। বরং আশ্বস্ত হওয়ার কিছুক্ষণ পরই আবার মনে হয় “নিশ্চয়ই কোথাও কোনো দাগ হয়েছে আরেকবার আয়নায় দেখে নিই।”

‎বিরল এ রোগের নাম: বডি ডিসমরফিক ডিসঅর্ডার (Body Dysmorphic Disorder—BDD)

‎দর্পনীর (ছদ্মনাম) উপসর্গগুলো বডি ডিসমরফিক ডিসওর্ডার (Body Dysmorphic Disorder -BDD)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ রোগে শরীরের কোনো ত্রুটি বা সৌন্দর্যগত খুঁত নিয়ে অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক চিন্তা তৈরি হয়, যদিও বাস্তবে ত্রুটিটি সামান্য বা একেবারেই থাকে না। রোগী বারবার আয়নায় নিজেকে পরীক্ষা করা, অন্যের কাছে আশ্বস্ত হওয়া, সাজগোজ করা বা ত্রুটি আড়াল করার মতো আচরণ করেন। এটিকে মিরর চেকিং (Mirror Checking) বলা হয়। আবার কখনো কখনো আয়না এড়িয়ে চলাও দেখা যায়। ফলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে উল্লেখযোগ্য ব্যাঘাত ঘটে।

‎চিকিৎসায় প্রথম সারির পদ্ধতি হলো বিহেভিয়ার থেরাপি  (Cognitive Behavioural Therapy -CBT), বিশেষ করে BDD-কেন্দ্রিক CBT ও এক্সপোজার ও রেসপন্স প্রিভেনশন (Exposure and Response Prevention -ERP)। এতে চেহারা নিয়ে বিকৃত চিন্তা শনাক্ত ও সংশোধন করা এবং বারবার আয়না পরীক্ষা করার মতো কমপ্লাসিভ বিহেভিয়ার  (Compulsive Behaviour) কমানো হয়।

‎প্রয়োজন হলে SSRI যেমন ফ্লুক্সেটিন (Fluoxetine), সারটালিন (Sertraline), এসসিটালোপ্রাম (Escitalopram) বা ফ্লুভক্সামিন (Fluvoxamine) ব্যবহার করা যেতে পারে। সাধারণত পর্যাপ্ত মাত্রায় কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। এতে মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যক্রমের ভারসাম্য উন্নত হয় এবং রোগীর কমপালসিভ মিরর চেকিং (Compulsive Mirror Checking)  ধীরে ধীরে কমে আসে।

‎এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত প্রয়োজন। বিষণ্নতা, সামাজিক উদ্বেগ ও আত্মহানির চিন্তা আছে কি না, সেটিও নিয়মিত মূল্যায়ন করা উচিত। অসচেতনতার কারণে অনেক সময় পরিবারে বারবার কলহ সৃষ্টি হয়, এমনকি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

‎বাংলাদেশে অনেক সময় পরিবার ভেঙে যাওয়ার পেছনে মানসিক রোগ সম্পর্কে অসচেতনতা, ভয়, অজ্ঞতা, রোগীকে হেয় প্রতিপন্ন করা, অবহেলা, ভুল ধারণা, অপ্রশিক্ষিত বা গ্রামীণ চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা এবং যথাযথ চিকিৎসা না করানো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই মানসিক রোগকে লুকিয়ে না রেখে দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আনা এবং পরিবারের সদস্যদের সহানুভূতিশীল ও সচেতন হওয়া জরুরি।


‎সহযোগী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি
‎সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাজ্যে পাঠানোর নামে কোটি টাকা আত্মসাৎ: গোলাপগঞ্জে র‍্যাবের জালে প্রতারক চক্রের মূলহোতা কয়েছ

‎আয়না দেখা: এক বিরল কেইস হিস্ট্রি‎

সময় ১০:১৬:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

‎ডা. সাঈদ এনাম

‎ডা. সাঈদ এনাম


‎দর্পনী (ছদ্মনাম) ২৪ বছর বয়সী, গত প্রায় দুই বছর ধরে এক অদ্ভুত ও কষ্টদায়ক সমস্যায় ভুগছেন। তাঁর স্বামী বিদেশে থাকেন। তিনি বারবার আয়নায় নিজের মুখ দেখেন। কিছুক্ষণ পরপরই যেন অদৃশ্য এক তাগিদে আবার আয়নার সামনে ফিরে আসেন। দিনে ৫০ থেকে ৮০ বার তিনি নিজের মুখ আয়নায় দেখেন, পরীক্ষা করেন।

‎দর্পনীর মনে হয়, তাঁর মুখে দাগ হয়েছে, দাগগুলো দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, মুখ বেঁকে যাচ্ছে, তাঁর লুক ও আকর্ষণ কমে যাচ্ছে, চেহারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কিংবা তাঁকে দেখতে খারাপ লাগছে। এই আশঙ্কা থেকেই তিনি বারবার আয়নায় নিজের মুখ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন কখনো নির্দিষ্ট কোনো দাগ খুঁজতে, কখনো মুখের আকৃতি পরীক্ষা করতে।

‎কিন্তু বিষয়টি আরও অদ্ভুত। বাস্তবে তাঁর মুখে এমন কোনো দৃশ্যমান দাগ বা বিকৃতি নেই, যা তিনি বারবার আয়নায় খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এমনকি সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছেও তিনি তাঁর কথিত মুখের দাগটি স্পষ্টভাবে দেখাতে পারেননি।

‎আয়না সামনে না থাকলে তাঁর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ, অস্বস্তি ও অস্থিরতা তৈরি হয়। তাই ঘরের প্রায় সর্বত্রই তিনি আয়না রেখেছেন শোবার ঘর, বাথরুম, রান্নাঘর, বারান্দা, সিঁড়ি, এমনকি নামাজের ঘরেও। বাইরে বের হলে ভ্যানিটি ব্যাগে আয়না সঙ্গে রাখেন। আয়না যেন তাঁর কাছে এক ধরনের “নিরাপত্তার আশ্রয়” হয়ে উঠেছে।

‎এই আচরণে পরিবারের সদস্যরাও অতিষ্ঠ। বিশেষ করে তাঁর শাশুড়ি সারাক্ষণ আয়না দেখার বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত বিরক্ত। পরিবারের লোকজন বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেন“তোমার চেহারায় তো কোনো সমস্যা নেই।” তার ননদ ও তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা বিফল। কিন্তু দর্পনী সহজে তা মেনে নিতে পারেন না। বরং আশ্বস্ত হওয়ার কিছুক্ষণ পরই আবার মনে হয় “নিশ্চয়ই কোথাও কোনো দাগ হয়েছে আরেকবার আয়নায় দেখে নিই।”

‎বিরল এ রোগের নাম: বডি ডিসমরফিক ডিসঅর্ডার (Body Dysmorphic Disorder—BDD)

‎দর্পনীর (ছদ্মনাম) উপসর্গগুলো বডি ডিসমরফিক ডিসওর্ডার (Body Dysmorphic Disorder -BDD)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ রোগে শরীরের কোনো ত্রুটি বা সৌন্দর্যগত খুঁত নিয়ে অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক চিন্তা তৈরি হয়, যদিও বাস্তবে ত্রুটিটি সামান্য বা একেবারেই থাকে না। রোগী বারবার আয়নায় নিজেকে পরীক্ষা করা, অন্যের কাছে আশ্বস্ত হওয়া, সাজগোজ করা বা ত্রুটি আড়াল করার মতো আচরণ করেন। এটিকে মিরর চেকিং (Mirror Checking) বলা হয়। আবার কখনো কখনো আয়না এড়িয়ে চলাও দেখা যায়। ফলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে উল্লেখযোগ্য ব্যাঘাত ঘটে।

‎চিকিৎসায় প্রথম সারির পদ্ধতি হলো বিহেভিয়ার থেরাপি  (Cognitive Behavioural Therapy -CBT), বিশেষ করে BDD-কেন্দ্রিক CBT ও এক্সপোজার ও রেসপন্স প্রিভেনশন (Exposure and Response Prevention -ERP)। এতে চেহারা নিয়ে বিকৃত চিন্তা শনাক্ত ও সংশোধন করা এবং বারবার আয়না পরীক্ষা করার মতো কমপ্লাসিভ বিহেভিয়ার  (Compulsive Behaviour) কমানো হয়।

‎প্রয়োজন হলে SSRI যেমন ফ্লুক্সেটিন (Fluoxetine), সারটালিন (Sertraline), এসসিটালোপ্রাম (Escitalopram) বা ফ্লুভক্সামিন (Fluvoxamine) ব্যবহার করা যেতে পারে। সাধারণত পর্যাপ্ত মাত্রায় কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। এতে মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যক্রমের ভারসাম্য উন্নত হয় এবং রোগীর কমপালসিভ মিরর চেকিং (Compulsive Mirror Checking)  ধীরে ধীরে কমে আসে।

‎এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত প্রয়োজন। বিষণ্নতা, সামাজিক উদ্বেগ ও আত্মহানির চিন্তা আছে কি না, সেটিও নিয়মিত মূল্যায়ন করা উচিত। অসচেতনতার কারণে অনেক সময় পরিবারে বারবার কলহ সৃষ্টি হয়, এমনকি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

‎বাংলাদেশে অনেক সময় পরিবার ভেঙে যাওয়ার পেছনে মানসিক রোগ সম্পর্কে অসচেতনতা, ভয়, অজ্ঞতা, রোগীকে হেয় প্রতিপন্ন করা, অবহেলা, ভুল ধারণা, অপ্রশিক্ষিত বা গ্রামীণ চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা এবং যথাযথ চিকিৎসা না করানো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই মানসিক রোগকে লুকিয়ে না রেখে দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আনা এবং পরিবারের সদস্যদের সহানুভূতিশীল ও সচেতন হওয়া জরুরি।


‎সহযোগী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি
‎সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।