
টানা ভারী বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর একাধিক স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে জেলার চার উপজেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে সদর, রাজনগর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া উপজেলার ২৮টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার প্রায় ১০ হাজার পরিবারের অন্তত ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, আউশ ধানের ক্ষেত, সবজির আবাদ ও শতাধিক মাছের খামার। এতে কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিনের টানা বর্ষণের সঙ্গে উজানের ঢল মিলিত হয়ে মনু ও ধলাই নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর একপর্যায়ে দুই নদীর একাধিক প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজনগর উপজেলা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মনু নদীর বাঁধ ভেঙে রাজনগরের টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর, হরিপাশা, ইব্রাহীমপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। একই সময়ে ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে টেংরা ও কামারচাক ইউনিয়নের প্রায় ২৫টি গ্রাম পানির নিচে চলে যায়। অনেক পরিবার এখনো বাড়িঘরে আটকা রয়েছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নৌকাই অনেক এলাকার একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ও পৌরসভার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের রাজাপুর, শিকড়া, আলিনগর ও ধামুলিসহ কয়েকটি গ্রামও বন্যাকবলিত হয়েছে। লোকালয় থেকে পানি নামতে শুরু করলেও হাকালুকি, কাউয়াদিঘি ও হাইল হাওরের পানি এখনো বাড়ছে।
বন্যার পানিতে আমনের বীজতলা, আউশ ধান, সবজি ও মাছের খামার ডুবে যাওয়ায় কৃষক ও মৎস্যচাষিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেক এলাকায় নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি শুকনো খাবার ও গবাদিপশুর খাদ্যেরও অভাব দেখা দিয়েছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, মনু নদীর চাঁদনীঘাট পয়েন্টে পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও উজানে বৃষ্টিপাত কমে আসায় মনু ও ধলাই নদীর পানি ধীরে ধীরে কমছে। তবে নিম্নাঞ্চলের জলাবদ্ধতা কাটতে আরও সময় লাগতে পারে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ৭৫০ ব্যাগ শুকনো ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলার ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী দুর্গত মানুষকে সেখানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া বলেন, পানিবন্দি মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বিপুল সিকদার বলেন, টেংরা, কামারচাকসহ কয়েকটি ইউনিয়নে এখনো হাজারো মানুষ পানিবন্দি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন,ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের কাজ চলছে। পানি কমে গেলে স্থায়ী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন,বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে মনু ও ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে একই ধরনের দুর্ভোগ সৃষ্টি হলেও স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় ক্ষয়ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তাঁরা দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসন এবং ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন।
আব্দুস সামাদ আজাদ মৌলভীবাজার থেকে। 



















