
আমাদের সমাজের নৈতিকতার অবক্ষয় আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশের কোথাও শিশুরা নিরাপদ নয়। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো লোমহর্ষক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। খবরের কাগজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতা উল্টালেই ভেসে উঠছে কোমলমতি শিশুদের ওপর নির্মমতার চিত্র। ৪ বছরের অবুঝ শিশুও আজ নরপিশাচদের কামনার বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
নিজের ঘর, বারান্দা কিংবা বাড়ির আঙিনা—কোনোখানেই আজ শিশুরা নিরাপদ নয়। পরিচিত বা আত্মীয়ের বেশে লুকিয়ে থাকা ছদ্মবেশী নরপশুরা ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে অবলীলায় খুন ও নির্যাতন করছে এই পঙ্কিলতাহীন শিশুদের।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই নরপশুদের অধিকাংশই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি। অনেকেই নিজেরা সন্তানের পিতা, যাদের ঘরে হয়তো রামিশা বা ফাহিমার মতোই ছোট্ট শিশু রয়েছে। অথচ তারা কীভাবে অন্য একটি শিশুর সাথে এমন চরম নিষ্ঠুরতা করতে পারে, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় চার বছরের শিশু রামিশার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই নৃশংস ঘটনায় সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নিহত রামিশার বাবা মেয়ে হত্যার বিচার না চেয়ে রাস্ট্রকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। এঘটনায় দেশ বিদেশে তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হয়।
রামিশার ঘটনায় সারাদেশে মানুষের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিচারের দাবীতে মানববন্ধন সহ নানান কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে। ঘাতকে দ্রুত ফাঁশির দাবীতে দেশবাসী এক কাতারে চলে আসেন।
তবে রামিশা হত্যাকারী ঘাতক নরপিশাচকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে রামিশার বাসায় গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং এই জঘন্য অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আগামী ৭ দিনের মধ্যে পুলিশ রিপোর্ট দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। আইনের এই কঠোর অবস্থানকে সাধুবাদ জানাচ্ছে সর্বস্তরের মানুষ।
শুধু ঢাকা নয়, সিলেটেও ঘটেছে একই রকম এক পৈশাচিক ঘটনা। গত ১১ মে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও সোনাতলা এলাকা থেকে চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে তার আপন চাচা জাকির হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঘাতক জাকির শিশুটিকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর ধর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
রামিশা কিংবা ফাহিমা—এরা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। একসময় আমরা শৈশবে পাড়ার মাঠে বা বাড়ির আঙিনায় নির্ভয়ে খেলাধুলা করে বড় হয়েছি। অথচ বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আজ মা-বাবারা তাদের সন্তানদের ঘরের বাইরে একা ছাড়তে চরম ভয় পান। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের যে মানসিক বিকাশ ঘটার কথা, তা আজ এক অজানা আতঙ্কে থমকে গেছে। আপনজনদের কাছেও যেখানে শিশুরা নিরাপদ নয়, সেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) -এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেশের শিশু নির্যাতনের এক শিউরে ওঠার মতো পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, চলতি বছরের প্রথম ৪ মাস (জানুয়ারি – এপ্রিল) কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েচে ১১৮ জন। এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জন শিশুকে। ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ৩ জন কে হত্যা ৩ করা হয়। বিগত ২০ মাস (জানুয়ারি ২০২৫ – এপ্রিল ২০২৬) মোট শিশু নির্যাতনের শিকার ১,৮৯০ জন। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ১,৪০৭ জন। ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত ৬৪৩ জন শিশু।
মানবাধিকার কর্মী এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই এই সামাজিক ব্যাধি দূর করতে পারবে না। অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষার প্রসার এবং পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। আমাদের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই একযোগে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক- সম্পাদক ও প্রকাশক, অনলাইন সিলেট।
আবদুল হক মামুন। 

















