
“সোনা বন্ধু গান শুনিয়া দিলের সুতায় লাগলো টান, আজ আমারে আনিয়া দেওরে আসমানের ও চাঁন।”— যাঁর লেখনীতে উঠে আসত বিরহ আর প্রেমের এমন অমর সব পঙক্তি, সেই মানুষটি নিজেই আজ হয়ে গেলেন আকাশের তারা। তিনি আমাদের প্রিয় প্রিন্স মির্জা এনামুল হক (ডমিএ), সবার প্রিয় এনাম স্যার। আজ তিনি না ফেরার দেশে।
এনাম স্যার কেবল একজন মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন আস্ত একটি প্রতিষ্ঠান। শিক্ষকতা ছিল তাঁর পেশা, কিন্তু শিল্প ছিল তাঁর রক্তে। তিনি একাধারে শিক্ষক, লেখক, গীতিকার, সাংবাদিক, চিত্রশিল্পী, নাট্যশিল্পী এবং কণ্ঠশিল্পী। গুণী এই মানুষটির সান্নিধ্যে আসা মানেই ছিল শিল্পের এক নতুন জগতের খোঁজ পাওয়া।
বড় বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর সরাসরি ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেই স্কুলজীবন থেকেই স্যারের সাথে আমার গড়ে ওঠে এক আত্মিক সম্পর্ক। পরবর্তীতে যখন আমি নিজে সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হলাম, আমাদের ঘনিষ্ঠতা আরও বেড়ে যায়।
তিনি ছিলেন সম্পর্কের কারিগর। আমাদের আড্ডাগুলোতে যোগ হতো এক কাপ গরম চা আর জীবনমুখী গল্প। চলার পথে বাজারে বা রাস্তায় দেখা হলে তিনি নিজ থেকে ডেকে কুশলাদি জানতেন। সিলেটের প্রতি তাঁর ছিল অন্যরকম টান। যখনই সিলেট আসতেন, আমাকে ফোন দিয়ে ডেকে নিতেন। সম্পর্কের গভীরতায় তিনি যেমন ছিলেন শিক্ষক, তেমনি ছিলেন প্রাণের বন্ধু।
এনাম স্যারের চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর নিয়মনিষ্ঠা। আড্ডা হোক বা গভীর কোনো আলোচনা— আজানের ধ্বনি কানে পৌঁছামাত্র তিনি সব কাজ ফেলে নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন। দুনিয়াবি ব্যস্ততা তাঁকে কখনো স্রষ্টার স্মরণ থেকে দূরে সরাতে পারেনি।
বিগত বেশ কিছুদিন ধরে মানুষটি ভীষণ অসুস্থ ছিলেন। যে মানুষটি চিরকাল চঞ্চল পায়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, শেষ সময়ে তিনি ছিলেন বিছানাগত। হাঁটাচলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন।
গত ঈদের সময়ও আমরা কয়েকজন— এডভোকেট সেতু ভাই ও বখতিয়ার ভাই মিলে স্যারের স্মৃতিগুলো নিয়ে কত গল্প করলাম! সেই স্মৃতি রোমন্থন করতে করতেই আজ দুঃসংবাদটি এল।
একজন অসাধারণ মনের মানুষের বিদায় হলো। হয়তো এখন আর একসাথে বসে চা খাওয়া হবে না, ফোনের ওপার থেকে শোনা হবে না সেই চিরচেনা কণ্ঠ। কিন্তু এনাম স্যার বেঁচে থাকবেন তাঁর অগণিত ছাত্রের হৃদয়ে, তাঁর কালজয়ী গান আর সৃজনশীল কর্মের মাঝে।
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। পরপারে ভালো থাকুন প্রিয় এনাম স্যার। আপনার অভাব কোনোদিন পূরণ হবার নয়।
লেখক:-
সম্পাদক ও প্রকাশক
অনলাইন সিলেট ডটকম।
আব্দুল হক মামুন 











