
মৌলভীবাজারের রাজনগরে যেন এক টুকরো রূপকথা নেমে এসেছিল। আকাশে ভেসে আসা হেলিকপ্টার, গ্রামজুড়ে কৌতূহলী মানুষের ঢল, আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে ভিনদেশি এক কনে—সব মিলিয়ে এক ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন। কামারচাক ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বিষ্ণুপদ ধাম মন্দির-এ হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রবাসী যুবক সুকান্ত কুমার সেন ও চীনের সাংহাইয়ের বাসিন্দা ক্রিস হুই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাতে শতাধিক অতিথি ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। তবে তার আগেই গ্রামজুড়ে তৈরি হয় অন্যরকম উন্মাদনা। বিদেশী কনেকে নিয়ে হেলিকপ্টারে করে নিজ গ্রাম টিকরপাড়ায় ফেরেন সুকান্ত। আকাশপথে কনের আগমন ঘিরে সৃষ্টি হয় ব্যাপক কৌতূহল। আশপাশের গ্রাম থেকেও মানুষ ছুটে আসেন এক নজর দেখার জন্য।
গ্রামের মেঠোপথ, বাড়ির আঙিনা আর খোলা মাঠ—সবখানেই ছিল মানুষের ভিড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে খবরটি।
সুকান্ত সেন ২০১৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য চীনে পাড়ি জমান। সেখানে মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর ব্যবসায়িক সূত্রে পরিচয় হয় ক্রিস হুইয়ের সঙ্গে। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, আর বন্ধুত্ব থেকে গভীর সম্পর্কে রূপ নেয় তাদের পথচলা।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে চীনে তাদের বিয়ের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়। পরে পারিবারিক ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য বাংলাদেশে আয়োজন করা হয় বিয়ের অনুষ্ঠান। কনের মা-বাবা ও স্বজনরাও চীন থেকে উপস্থিত ছিলেন এ আয়োজনে।
বিয়ের আগের দিন অনুষ্ঠিত হয় গায়ে হলুদ। লাল বেনারসি শাড়িতে সজ্জিত কনে আর ঐতিহ্যবাহী পোশাকে বর—দুই সংস্কৃতির মেলবন্ধনে যেন নতুন এক সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে সাত পাকে আবদ্ধ হন নবদম্পতি; বর সিঁদুর পরিয়ে দেন কনের সিঁথিতে।
মন্দিরের পুরোহিত কিশোর কান্তি ভট্টাচার্য জানান, বহু বাঙালি দম্পতির বিয়ে সম্পন্ন করলেও এই প্রথম কোনো চীনা নাগরিকের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা হলো তার।
সুকান্তের মা শিল্পী রানী সেন বলেন, পরিবারের নতুন সদস্যকে পেয়ে তিনি আনন্দিত ও গর্বিত। ছোট ভাই-বোনের ভাষ্য—ক্রিস অল্প সময়েই সবার আপন হয়ে উঠেছেন।
অন্যদিকে কনে ক্রিস হুই জানান, একজন বাংলাদেশিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়াই তাদের সম্পর্কের ভিত্তি।
স্থানীয়দের মতে, এই বিয়ে শুধু দুই তরুণ-তরুণীর মিলন নয়; এটি দুই দেশের সংস্কৃতির মিলনও। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে চীনা পরিবারের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
রাজনগরের টিকরপাড়া গ্রামে এই আয়োজন প্রমাণ করেছে—ভালোবাসার ভাষা আলাদা নয়, হৃদয়ের বন্ধনই শেষ কথা। আন্তর্জাতিক এ সম্পর্ক এখন স্থানীয়দের কাছে গর্বের এক গল্প, যা স্মরণীয় হয়ে থাকবে বহুদিন।
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি 

















