
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে এক অদৃশ্য কিন্তু ভয়াবহ মহামারি দিন দিন ডালপালা মেলছে। এটি কোনো নতুন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া নয়, এটি হলো আমাদের জীবন রক্ষাকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের তীব্র মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। যাঁরা অন্যের রোগ নিরাময়ে দিন-রাত লড়ছেন, সেই চিকিৎসকেরা নিজেরাই আজ এক নীরব মানসিক সংকটের মুখোমুখি।
এই সংকটের মূলে রয়েছে তীব্র জনবল-সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নিয়ম অনুযায়ী, একটি দেশে প্রতি ১০,০০০ মানুষের জন্য অন্তত ৪৪.৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী (চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ) থাকা আবশ্যক। অথচ বাংলাদেশে এই সংখ্যা মাত্র ১৩.৪ জন। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে প্রায় তিন গুণ কম।
কর্মক্ষেত্রে সেবাদাতাদের এই বিশাল শূন্যতার সরাসরি ধাক্কা এসে পড়ে কর্মরত চিকিৎসকদের ওপর। একজন কর্মীকে সামলাতে হয় শত শত রোগীর ভিড়। টানা ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার অবিরাম ডিউটি, নিদ্রাহীনতা এবং অতিরিক্ত কাজের চাপ তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখা দিচ্ছে তীব্র পেশাগত ক্লান্তি বা বার্নআউট, বিষণ্নতা এবং মারাত্মক উদ্বেগ।
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন স্বাস্থ্যসেবক কখনোই শতভাগ মনোযোগ দিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে পারেন না। ফলে অবধারিতভাবেই সেবার মান কমে যায়, যা রোগীর জীবনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। চিকিৎসকের মানসিক সুস্থতার সঙ্গে রোগীর সুস্থতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এই সত্যটি সবারই অনুধাবন করা উচিত।
এই চক্রাকার সংকট থেকে মুক্তির পথ একটাই স্বাস্থ্যখাতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে কাজের পরিবেশ উন্নত করতে হবে এবং চিকিৎসকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, কেবল বহুতল হাসপাতাল ভবন বা আধুনিক যন্ত্রপাতি একটি সুস্থ জাতি গড়তে পারে না; তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন একজন সুস্থ, সুরক্ষিত ও মানসিকভাবে প্রাণবন্ত স্বাস্থ্যকর্মী।
লেখক- মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।
ডা. সাঈদ এনাম 







