সিলেট ০৭:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
News Title :
লাখাই মুড়িয়াউক ইউনিয়ন নির্বাচনকে সামনে রেখে জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা ‎সিলেটে বাস টমটম সংঘর্ষে মা-মেয়ে নিহতের ঘটনায় ঘাতক বাস চালক গ্রেপ্তার কুলাউড়ায় নতুন আঙ্গিকে গোবিন্দাস রেস্টুরেন্ট, সাশ্রয়ী মূল্যে মিলবে তিন বেলার খাবার নিউইয়র্ক পুলিশ কর্মকর্তা জুয়েল মাহবুবের সঙ্গে স্রোত সাহিত্য পর্ষদের শুভেচ্ছা বিনিময় ‎হবিগঞ্জে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন ‎লাখাইয়ে শান্তিপূর্ণ, নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজাঁ‎ উদযাপনের লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত।    ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অলিপুরে ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী মৃত্যু হবিগঞ্জ কারাগারে মাদক মামলার এক বন্দির মৃত্যু ‎লাখাইয়ে পুলিশের উদ্যোগে মাদক ও অপরাধবিরোধী উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত শান্তিগঞ্জে প্রধান শিক্ষক সমিতির ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতি মানিক,সম্পাদক সুধা রঞ্জন

‎স্বাধীনতার ৫৫ বছর : বংশাই নদীর বাঁশের সাঁকোয় জিম্মি ২০০ পরিবারের স্বপ্ন

‎​



‎স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার গল্প যখন চারদিকে, তখন জামালপুর সদরের দিগপাইত ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড ছোনটিয়া পটল গ্রামের পশ্চিমপাড়ার চিত্র যেন ভিন্ন এক  দুর্গম গ্রামের কথা বলে। মাত্র ১৫০ মিটারের দূরত্বে ঢাকা-জামালপুর মহাসড়ক। চোখের সামনেই ঝকঝকে পিচঢালা রাস্তা আর রাস্তা ঘেষেই ছোনটিয়া মোড় বাজারের আধুনিকতার ছোঁয়া।

‎অথচ গ্রামের ২০০টি পরিবারের ৮০০ মানুষের জীবনে আধুনিকতা কেবলই এক অধরা স্বপ্ন। তাদের প্রতিদিনের যাতায়াতের প্রধান পথ—বংশাই নদীর ওপরের ৫০ মিটারের একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। বছরের পর বছর ধরে এখানে সেতু না থাকায় তারা যেন নিজেদের এলাকাতেই অবরুদ্ধ হয়ে আছেন।

‎শুষ্ক মৌসুমে বাঁশের সাঁকোটি কোনোমতে টিকে থাকলেও, বর্ষায় এটি রূপ নেয় মরণফাঁদে। গ্রামের মানুষের ভাষ্যমতে, সরকার রাস্তা-ঘাট উন্নয়নে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও তাদের এই ৫০ মিটারের সেতুটি আজও উপেক্ষিত। ফলে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন বাজার সদাই—সবকিছুতেই তাদের গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ ও পরিশ্রম।

‎সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয়দের উদ্যোগে বাশ দিয়ে নির্মিত সাঁকোটির অনেকটাই নড়বড়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ । বয়স্ক মানুষ তো বটেই, এমনকি তরুণরাও মাঝেমধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যান।

‎স্থানীয় স্কুলছাত্র রাকিব জানায়, “বই-খাতা মাথায় নিয়ে সাঁকো পার হওয়ার সময় ভয়ে হাত-পা কাঁপে। বর্ষাকালে যদি সাঁকো ডুবে যায়, তবে পড়াশোনাই বন্ধ হয়ে যায়।” শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, প্রতিদিন এই ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন নারী ও শিশুরাও।

‎জানা যায়, গত কয়েকদিন আগে স্কুল পড়ুয়া দুই ছাত্র  সাঁকো থেকে পড়ে মাথায় ও পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে শয্যাসয়ী রয়েছে। 

‎সেতু না থাকার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হয় অসুস্থ রোগীদের। গ্রামে যদি কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে তাকে হাসপাতালে নেওয়া যেন এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। কাঁধে করে বা কোলে করে নদীর কাদাপানি মাড়িয়ে মহাসড়ক পর্যন্ত আসতে আসতে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়ে।

‎গ্রামের বাসিন্দাদের অধিকাংশই দরিদ্র কৃষক ও দিনমজুর। কৃষিপ্রধান এলাকা হওয়ায় তাদের উৎপাদিত পণ্য মহাসড়কে নিতে প্রচুর সময় ও অর্থ অপচয় হয়। ভ্যানগাড়ি বা রিকশা গ্রামে ঢুকতে পারে না। ফলে এক বস্তা চাল বা সার কিনতে গেলেও তা কাঁধে করে দীর্ঘ পথ হেঁটে আনতে হয়। পরিবহন সংকটের কারণে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন

‎ভুক্তভোগী সজল মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “আমি ছোনটিয়া মোড় বাজারে এক সময় ব্যবসা করতাম, এই সাকো দিয়ে যাতায়াতে আমি বিভিন্ন সময় পড়ে গিয়ে আহত হয়েছি। আমার দোকানের মালামাল নষ্ট হয়েছে যার কারণে এখানে ব্যবসা বাদ দিয়ে আমি অনেক দূরের একটি বাজারে ব্যবসা করছি। কষ্ট আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী দেশ অনেকটা উন্নয়ন হলেও আমাদের ভাগ্য আর উন্নয়ন হলো না

‎​ভুক্তভোগী মজনু মিয়া বলেন, “আমরা গরিব মানুষ—আমাদের মধ্যে কেউ ভ্যানচালক, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, আবার কেউ দিনমজুর। আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা এতটাই করুণ যে, ভ্যান গাড়িটিও বাড়িতে রাখা সম্ভব হয় না, অন্যের বাড়িতে রেখে আসতে হয়। এক বস্তা চাল কেনা থেকে শুরু করে নিত্যপণ্য আনা—সবক্ষেত্রেই আমাদের অবর্ণনীয় কষ্ট পোহাতে হয়।” তিনি আরো বলেন, ছেলে মেয়ে যোগ্য হলেও যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় এই বাড়িতে বিয়ে আসেনা।

‎স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এটি একটি দীর্ঘদিনের অবহেলার ফসল। গ্রামবাসী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদ—সবখানেই বহুবার যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাদের কপালে জুটেছে কেবল মিথ্যে আশ্বাস। বর্তমান সরকারের গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়নের যে মহাপরিকল্পনা, সেখানে এই গ্রামের অবহেলিত বাড়িগুলো যেন বঞ্চিত না হয় এটাই আমাদের প্রত্যাশা ।

‎বংশাই নদী এই গ্রামের মানুষের জন্য কেবল একটি জলাধার নয়, এটি তাদের উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও এলজিইডি (LGED) যদি অতি দ্রুত এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ যদি  না নেয়, তবে এই গ্রামের মানুষ আরও কয়েক দশক পিছিয়ে থাকবে। ৮০০ মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার এবং যাতায়াতের নিশ্চয়তা দিতে একটি সেতু এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লাখাই মুড়িয়াউক ইউনিয়ন নির্বাচনকে সামনে রেখে জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা

‎স্বাধীনতার ৫৫ বছর : বংশাই নদীর বাঁশের সাঁকোয় জিম্মি ২০০ পরিবারের স্বপ্ন

সময় ০৪:০৮:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

‎​



‎স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার গল্প যখন চারদিকে, তখন জামালপুর সদরের দিগপাইত ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড ছোনটিয়া পটল গ্রামের পশ্চিমপাড়ার চিত্র যেন ভিন্ন এক  দুর্গম গ্রামের কথা বলে। মাত্র ১৫০ মিটারের দূরত্বে ঢাকা-জামালপুর মহাসড়ক। চোখের সামনেই ঝকঝকে পিচঢালা রাস্তা আর রাস্তা ঘেষেই ছোনটিয়া মোড় বাজারের আধুনিকতার ছোঁয়া।

‎অথচ গ্রামের ২০০টি পরিবারের ৮০০ মানুষের জীবনে আধুনিকতা কেবলই এক অধরা স্বপ্ন। তাদের প্রতিদিনের যাতায়াতের প্রধান পথ—বংশাই নদীর ওপরের ৫০ মিটারের একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। বছরের পর বছর ধরে এখানে সেতু না থাকায় তারা যেন নিজেদের এলাকাতেই অবরুদ্ধ হয়ে আছেন।

‎শুষ্ক মৌসুমে বাঁশের সাঁকোটি কোনোমতে টিকে থাকলেও, বর্ষায় এটি রূপ নেয় মরণফাঁদে। গ্রামের মানুষের ভাষ্যমতে, সরকার রাস্তা-ঘাট উন্নয়নে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও তাদের এই ৫০ মিটারের সেতুটি আজও উপেক্ষিত। ফলে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন বাজার সদাই—সবকিছুতেই তাদের গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ ও পরিশ্রম।

‎সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয়দের উদ্যোগে বাশ দিয়ে নির্মিত সাঁকোটির অনেকটাই নড়বড়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ । বয়স্ক মানুষ তো বটেই, এমনকি তরুণরাও মাঝেমধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যান।

‎স্থানীয় স্কুলছাত্র রাকিব জানায়, “বই-খাতা মাথায় নিয়ে সাঁকো পার হওয়ার সময় ভয়ে হাত-পা কাঁপে। বর্ষাকালে যদি সাঁকো ডুবে যায়, তবে পড়াশোনাই বন্ধ হয়ে যায়।” শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, প্রতিদিন এই ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন নারী ও শিশুরাও।

‎জানা যায়, গত কয়েকদিন আগে স্কুল পড়ুয়া দুই ছাত্র  সাঁকো থেকে পড়ে মাথায় ও পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে শয্যাসয়ী রয়েছে। 

‎সেতু না থাকার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হয় অসুস্থ রোগীদের। গ্রামে যদি কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে তাকে হাসপাতালে নেওয়া যেন এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। কাঁধে করে বা কোলে করে নদীর কাদাপানি মাড়িয়ে মহাসড়ক পর্যন্ত আসতে আসতে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়ে।

‎গ্রামের বাসিন্দাদের অধিকাংশই দরিদ্র কৃষক ও দিনমজুর। কৃষিপ্রধান এলাকা হওয়ায় তাদের উৎপাদিত পণ্য মহাসড়কে নিতে প্রচুর সময় ও অর্থ অপচয় হয়। ভ্যানগাড়ি বা রিকশা গ্রামে ঢুকতে পারে না। ফলে এক বস্তা চাল বা সার কিনতে গেলেও তা কাঁধে করে দীর্ঘ পথ হেঁটে আনতে হয়। পরিবহন সংকটের কারণে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন

‎ভুক্তভোগী সজল মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “আমি ছোনটিয়া মোড় বাজারে এক সময় ব্যবসা করতাম, এই সাকো দিয়ে যাতায়াতে আমি বিভিন্ন সময় পড়ে গিয়ে আহত হয়েছি। আমার দোকানের মালামাল নষ্ট হয়েছে যার কারণে এখানে ব্যবসা বাদ দিয়ে আমি অনেক দূরের একটি বাজারে ব্যবসা করছি। কষ্ট আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী দেশ অনেকটা উন্নয়ন হলেও আমাদের ভাগ্য আর উন্নয়ন হলো না

‎​ভুক্তভোগী মজনু মিয়া বলেন, “আমরা গরিব মানুষ—আমাদের মধ্যে কেউ ভ্যানচালক, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, আবার কেউ দিনমজুর। আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা এতটাই করুণ যে, ভ্যান গাড়িটিও বাড়িতে রাখা সম্ভব হয় না, অন্যের বাড়িতে রেখে আসতে হয়। এক বস্তা চাল কেনা থেকে শুরু করে নিত্যপণ্য আনা—সবক্ষেত্রেই আমাদের অবর্ণনীয় কষ্ট পোহাতে হয়।” তিনি আরো বলেন, ছেলে মেয়ে যোগ্য হলেও যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় এই বাড়িতে বিয়ে আসেনা।

‎স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এটি একটি দীর্ঘদিনের অবহেলার ফসল। গ্রামবাসী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদ—সবখানেই বহুবার যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাদের কপালে জুটেছে কেবল মিথ্যে আশ্বাস। বর্তমান সরকারের গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়নের যে মহাপরিকল্পনা, সেখানে এই গ্রামের অবহেলিত বাড়িগুলো যেন বঞ্চিত না হয় এটাই আমাদের প্রত্যাশা ।

‎বংশাই নদী এই গ্রামের মানুষের জন্য কেবল একটি জলাধার নয়, এটি তাদের উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও এলজিইডি (LGED) যদি অতি দ্রুত এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ যদি  না নেয়, তবে এই গ্রামের মানুষ আরও কয়েক দশক পিছিয়ে থাকবে। ৮০০ মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার এবং যাতায়াতের নিশ্চয়তা দিতে একটি সেতু এখন সময়ের দাবি।