সিলেট ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
News Title :
‎মুঠোফোনের যুগে বইয়ের আলো ছড়াচ্ছেন কুলাউড়ার খালিক উদ্দিন নীলফামারীতে জমি বিরোধে হত্যা: সিলেট থেকে যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার ৩ ‎বড়লেখায় অসচ্ছল নারীদের বিনামূল্যে সেলাই মেশিন বিতরণ ‎​জৈন্তাপুরে টাস্কফোর্সের যৌথ অভিযান: ৭৩টি বার্কি নৌকা ধ্বংস, ৮,৪৮৬ ঘনফুট বালু জব্দ লাখাইর বুল্লা গ্রামে এক রাতে তিন বাড়িতে চুরি জনমনে আতঙ্ক! তামাক নিয়ন্ত্রণে জামালপুর পৌরসভার উদ্যোগে নীতি নির্ধারণী আলোচনা ও প্রস্তাবনা উপস্থাপন সভা হবিগঞ্জে পাগলা কুকুরের কামড়ে আহত ৮০, হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৫ জন ‎ঝরে পড়া রোধে নবীগঞ্জের চা বাগান বিদ্যালয়ে “মিড ডে মিল চালু” সৌদি আরব ফেরত রেহেনাকে সহায়তা দিলেন মাধবপুরের ইউএনও  পানিতে ডুবে প্রান গেল বাহুবলের জনপ্রিয় ক্ষুদে কনটেন্ট ক্রিয়েটর দ্বীপের
‎ছোট্ট পাঠাগার থেকে বই পড়া আন্দোলন...

‎মুঠোফোনের যুগে বইয়ের আলো ছড়াচ্ছেন কুলাউড়ার খালিক উদ্দিন


‎একটি সমাজ বদলে দিতে সব সময় বড় বাজেট কিংবা বিশাল আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি ছোট্ট ঘর, কয়েকটি বই আর একজন মানুষের অদম্য স্বপ্নই হয়ে উঠতে পারে সমাজ পরিবর্তনের অনুঘটক। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া শহরের কোলাহলমুখর সড়কের পাশে তেমনই এক আলোর ঠিকানা ‘আদর্শ পাঠাগার’।
‎
‎বাহিরে শহরের ব্যস্ততা, আর ভেতরে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা একদল পাঠক। এই নীরব জ্ঞানচর্চার পেছনে রয়েছেন একজন মানুষ; শিক্ষক, লেখক ও সাংবাদিক মো.খালিক উদ্দিন। মুঠোফোনের পর্দায় যখন তরুণ প্রজন্মের অবসর কাটানোর প্রবণতা বাড়ছে, তখন বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
‎
‎সময়টা ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর। পারিবারিক শিক্ষা সহায়তামূলক সংগঠন ‘আহমদ জে.সোহান ফাউন্ডেশন’-এর সহযোগিতায় কুলাউড়া শহরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আদর্শ পাঠাগার’। উদ্দেশ্য ছিল, বই থেকে দূরে সরে যাওয়া মানুষকে আবার বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা।

তবে এই পথচলার শুরুটা সহজ ছিল না। হাতে গোনা কয়েকটি বই, ছোট্ট একটি ঘর আর বুকভরা স্বপ্ন; এই ছিল সম্বল। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি শুনতে হয়েছে নানা প্রশ্ন, ‘মুঠোফোনের এই যুগে মানুষ কি আর বই পড়বে?’ কিন্তু দমে যাননি খালিক উদ্দিন। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের ভেতরের জ্ঞানের তৃষ্ণা কখনো মরে যায় না; প্রয়োজন শুধু সেই তৃষ্ণাকে জাগিয়ে তোলা।
‎
‎সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি ছুটে গেছেন স্কুল থেকে স্কুলে, কলেজের শ্রেণিকক্ষ ও করিডোরে। শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছেন বই, পাঠ্যবইয়ের বাইরেও জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। বই পড়ার আনন্দ সম্পর্কে সচেতন করতে গিয়ে বলেছেন, একটি বই পড়ে দেখুন, হয়তো জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শিখবেন।
‎
‎ধীরে ধীরে তাঁর এই প্রচেষ্টায় সাড়া দিতে শুরু করেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকেরা। ছোট্ট পরিসরে যাত্রা শুরু করা পাঠাগারটি আজ বইপড়াকে কেন্দ্র করে একটি সামাজিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
‎
‎আদর্শ পাঠাগারকে কেবল বই ধার দেওয়া কিংবা পড়ার জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি খালিক উদ্দিন। বই পড়াকে আনন্দময় ও আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রতি বছর আয়োজন করছেন ‘আদর্শ পাঠাগার বইপড়া উৎসব’। এই উৎসবে একই কাতারে শামিল হন মা-মেয়ে, বাবা-ছেলে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী। বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবটি হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় এক মিলনমেলা। ফলে এটি এখন আর নিছক প্রতিযোগিতার আয়োজন নয়; বরং বইবিমুখ প্রজন্মকে বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনার একটি উদ্যোগ। বই পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি, পারিবারিক পাঠসংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানচর্চার বন্ধন তৈরিতে এই আয়োজন ভূমিকা রাখছে।
‎
‎প্রতিষ্ঠার পর থেকে আটটি বিশেষ ইভেন্টের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৭০০ পাঠককে বই পড়ার কার্যক্রমে যুক্ত করেছেন খালিক উদ্দিন। পাঠকদের উৎসাহিত করতে দেওয়া হয়েছে নগদ অর্থ, বৃত্তি, বই ও শিক্ষা উপকরণ। তাঁর লক্ষ্য, একটি বই পড়ার আনন্দ যেন পাঠককে পরবর্তী বইটি পড়তে উদ্বুদ্ধ করে।
‎
‎বই পড়ানোর পাশাপাশি বই উপহার দেওয়াকেও নিজের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন খালিক উদ্দিন। এ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার কপি বই বিনামূল্যে মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি। তাঁর কাছে বই কেবল কাগজের বাঁধাই নয়, বরং নতুন চিন্তা, উপলব্ধি ও সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার মাধ্যম। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি।
‎
‎খালিক উদ্দিন কুলাউড়ার স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইয়াকুব-তাজুল মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। নিজের কলেজের গ্রন্থাগারে বই দেওয়ার পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন স্কুল-
‎কলেজের গ্রন্থাগারেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বই দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগারমুখী করতে শিক্ষকদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
‎
‎বর্তমানে আদর্শ পাঠাগারের দুটি শাখা রয়েছে। দুই শাখা মিলিয়ে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮০০। তবে পাঠকদের চাহিদার তুলনায় এই সংগ্রহ অপ্রতুল। প্রতিদিন নতুন নতুন পাঠক আসছেন, খুঁজছেন পছন্দের বই। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী বই সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। পাঠাগারের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে এটিই এখন সবচেয়ে বড় বাধা।
‎
‎এ প্রসঙ্গে খালিক উদ্দিন বলেন, ‘এই পাঠাগারের নিজস্ব কোনো আয় নেই। সরকারি-বেসরকারি কোনো নিয়মিত সহযোগিতাও নেই। নিজের সামর্থ্য ও কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীর সহযোগিতা নিয়ে যতটুকু পারি, কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। সরকারি কিংবা বেসরকারি যেকোনো উৎস থেকে সহযোগিতা পাওয়া গেলে বইপড়ার কার্যক্রম আরও গতিশীল ও বিস্তৃত করা সম্ভব হতো। এর মাধ্যমে আরও অনেক পাঠক তৈরি করা যেত।’
‎
‎সমাজের বিত্তবান ও প্রবাসীদের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি পেশায় একজন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের কখনো শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে আটকে রাখতে চাইনি। আমি এমন একটি ঘর তৈরি করতে চেয়েছি, যেখানে বই থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ আবার বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। সেই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একজন পাঠক জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি সুনাগরিক হিসেবেও গড়ে উঠবে।’
‎
‎তিনি আরও বলেন, ‘সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা আদর্শ পাঠাগারের এই অগ্রযাত্রায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন পাঠাগার গড়ে তুলতে পারেন। এতে তরুণ প্রজন্ম বই পড়ায় উৎসাহিত হবে, সমাজ আলোকিত হবে এবং মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।’
‎
‎শিক্ষকতার পাশাপাশি খালিক উদ্দিন সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গেও যুক্ত। তিনি দৈনিক আগামীর সময় ও দৈনিক যুগভেরীর কুলাউড়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সাহিত্য বিষয়ক সংকলন ‘দর্পণ’ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। লেখালেখির জগতেও রয়েছে তাঁর পদচারণা। ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ—‘অনুভব’ ও ‘প্রেরণার গল্প’। এ ছাড়া ইংরেজি ভাষা শিক্ষাবিষয়ক তাঁর একটি বইয়ের নাম ‘The Art of English Language’।
‎
‎শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা—সব পরিচয় ছাপিয়ে খালিক উদ্দিনের কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে আদর্শ পাঠাগারের মাধ্যমে বইয়ের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন। তাঁর এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে এমন একটি সমাজ গড়ার প্রত্যাশা, যেখানে বই হবে মানুষের নিত্যসঙ্গী, জ্ঞানচর্চা হবে জীবনের অংশ এবং নতুন প্রজন্ম আলোকিত হবে মুক্তচিন্তার আলোয়।
‎
‎মুঠোফোনের পর্দায় যখন সময় কাটানোর অভ্যাস ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, তখন কুলাউড়ার এই শিক্ষক নিজের সীমিত সামর্থ্য নিয়ে বইয়ের জগতে মানুষকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর উদ্যোগ হয়তো একদিনে পুরো সমাজ বদলে দেবে না, কিন্তু একটি পাঠক, একটি পরিবার কিংবা একটি প্রজন্মের চিন্তাজগতে পরিবর্তনের বীজ বুনতে পারে। আর সেই ছোট ছোট পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে আলোকিত সমাজের ভিত্তি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‎মুঠোফোনের যুগে বইয়ের আলো ছড়াচ্ছেন কুলাউড়ার খালিক উদ্দিন

‎ছোট্ট পাঠাগার থেকে বই পড়া আন্দোলন...

‎মুঠোফোনের যুগে বইয়ের আলো ছড়াচ্ছেন কুলাউড়ার খালিক উদ্দিন

সময় ১২:২২:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


‎একটি সমাজ বদলে দিতে সব সময় বড় বাজেট কিংবা বিশাল আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি ছোট্ট ঘর, কয়েকটি বই আর একজন মানুষের অদম্য স্বপ্নই হয়ে উঠতে পারে সমাজ পরিবর্তনের অনুঘটক। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া শহরের কোলাহলমুখর সড়কের পাশে তেমনই এক আলোর ঠিকানা ‘আদর্শ পাঠাগার’।
‎
‎বাহিরে শহরের ব্যস্ততা, আর ভেতরে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা একদল পাঠক। এই নীরব জ্ঞানচর্চার পেছনে রয়েছেন একজন মানুষ; শিক্ষক, লেখক ও সাংবাদিক মো.খালিক উদ্দিন। মুঠোফোনের পর্দায় যখন তরুণ প্রজন্মের অবসর কাটানোর প্রবণতা বাড়ছে, তখন বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
‎
‎সময়টা ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর। পারিবারিক শিক্ষা সহায়তামূলক সংগঠন ‘আহমদ জে.সোহান ফাউন্ডেশন’-এর সহযোগিতায় কুলাউড়া শহরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আদর্শ পাঠাগার’। উদ্দেশ্য ছিল, বই থেকে দূরে সরে যাওয়া মানুষকে আবার বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা।

তবে এই পথচলার শুরুটা সহজ ছিল না। হাতে গোনা কয়েকটি বই, ছোট্ট একটি ঘর আর বুকভরা স্বপ্ন; এই ছিল সম্বল। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি শুনতে হয়েছে নানা প্রশ্ন, ‘মুঠোফোনের এই যুগে মানুষ কি আর বই পড়বে?’ কিন্তু দমে যাননি খালিক উদ্দিন। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের ভেতরের জ্ঞানের তৃষ্ণা কখনো মরে যায় না; প্রয়োজন শুধু সেই তৃষ্ণাকে জাগিয়ে তোলা।
‎
‎সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি ছুটে গেছেন স্কুল থেকে স্কুলে, কলেজের শ্রেণিকক্ষ ও করিডোরে। শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছেন বই, পাঠ্যবইয়ের বাইরেও জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। বই পড়ার আনন্দ সম্পর্কে সচেতন করতে গিয়ে বলেছেন, একটি বই পড়ে দেখুন, হয়তো জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শিখবেন।
‎
‎ধীরে ধীরে তাঁর এই প্রচেষ্টায় সাড়া দিতে শুরু করেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকেরা। ছোট্ট পরিসরে যাত্রা শুরু করা পাঠাগারটি আজ বইপড়াকে কেন্দ্র করে একটি সামাজিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
‎
‎আদর্শ পাঠাগারকে কেবল বই ধার দেওয়া কিংবা পড়ার জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি খালিক উদ্দিন। বই পড়াকে আনন্দময় ও আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রতি বছর আয়োজন করছেন ‘আদর্শ পাঠাগার বইপড়া উৎসব’। এই উৎসবে একই কাতারে শামিল হন মা-মেয়ে, বাবা-ছেলে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী। বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবটি হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় এক মিলনমেলা। ফলে এটি এখন আর নিছক প্রতিযোগিতার আয়োজন নয়; বরং বইবিমুখ প্রজন্মকে বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনার একটি উদ্যোগ। বই পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি, পারিবারিক পাঠসংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানচর্চার বন্ধন তৈরিতে এই আয়োজন ভূমিকা রাখছে।
‎
‎প্রতিষ্ঠার পর থেকে আটটি বিশেষ ইভেন্টের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৭০০ পাঠককে বই পড়ার কার্যক্রমে যুক্ত করেছেন খালিক উদ্দিন। পাঠকদের উৎসাহিত করতে দেওয়া হয়েছে নগদ অর্থ, বৃত্তি, বই ও শিক্ষা উপকরণ। তাঁর লক্ষ্য, একটি বই পড়ার আনন্দ যেন পাঠককে পরবর্তী বইটি পড়তে উদ্বুদ্ধ করে।
‎
‎বই পড়ানোর পাশাপাশি বই উপহার দেওয়াকেও নিজের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন খালিক উদ্দিন। এ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার কপি বই বিনামূল্যে মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি। তাঁর কাছে বই কেবল কাগজের বাঁধাই নয়, বরং নতুন চিন্তা, উপলব্ধি ও সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার মাধ্যম। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি।
‎
‎খালিক উদ্দিন কুলাউড়ার স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইয়াকুব-তাজুল মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। নিজের কলেজের গ্রন্থাগারে বই দেওয়ার পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন স্কুল-
‎কলেজের গ্রন্থাগারেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বই দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগারমুখী করতে শিক্ষকদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
‎
‎বর্তমানে আদর্শ পাঠাগারের দুটি শাখা রয়েছে। দুই শাখা মিলিয়ে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮০০। তবে পাঠকদের চাহিদার তুলনায় এই সংগ্রহ অপ্রতুল। প্রতিদিন নতুন নতুন পাঠক আসছেন, খুঁজছেন পছন্দের বই। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী বই সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। পাঠাগারের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে এটিই এখন সবচেয়ে বড় বাধা।
‎
‎এ প্রসঙ্গে খালিক উদ্দিন বলেন, ‘এই পাঠাগারের নিজস্ব কোনো আয় নেই। সরকারি-বেসরকারি কোনো নিয়মিত সহযোগিতাও নেই। নিজের সামর্থ্য ও কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীর সহযোগিতা নিয়ে যতটুকু পারি, কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। সরকারি কিংবা বেসরকারি যেকোনো উৎস থেকে সহযোগিতা পাওয়া গেলে বইপড়ার কার্যক্রম আরও গতিশীল ও বিস্তৃত করা সম্ভব হতো। এর মাধ্যমে আরও অনেক পাঠক তৈরি করা যেত।’
‎
‎সমাজের বিত্তবান ও প্রবাসীদের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি পেশায় একজন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের কখনো শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে আটকে রাখতে চাইনি। আমি এমন একটি ঘর তৈরি করতে চেয়েছি, যেখানে বই থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ আবার বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। সেই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একজন পাঠক জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি সুনাগরিক হিসেবেও গড়ে উঠবে।’
‎
‎তিনি আরও বলেন, ‘সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা আদর্শ পাঠাগারের এই অগ্রযাত্রায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন পাঠাগার গড়ে তুলতে পারেন। এতে তরুণ প্রজন্ম বই পড়ায় উৎসাহিত হবে, সমাজ আলোকিত হবে এবং মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।’
‎
‎শিক্ষকতার পাশাপাশি খালিক উদ্দিন সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গেও যুক্ত। তিনি দৈনিক আগামীর সময় ও দৈনিক যুগভেরীর কুলাউড়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সাহিত্য বিষয়ক সংকলন ‘দর্পণ’ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। লেখালেখির জগতেও রয়েছে তাঁর পদচারণা। ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ—‘অনুভব’ ও ‘প্রেরণার গল্প’। এ ছাড়া ইংরেজি ভাষা শিক্ষাবিষয়ক তাঁর একটি বইয়ের নাম ‘The Art of English Language’।
‎
‎শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা—সব পরিচয় ছাপিয়ে খালিক উদ্দিনের কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে আদর্শ পাঠাগারের মাধ্যমে বইয়ের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন। তাঁর এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে এমন একটি সমাজ গড়ার প্রত্যাশা, যেখানে বই হবে মানুষের নিত্যসঙ্গী, জ্ঞানচর্চা হবে জীবনের অংশ এবং নতুন প্রজন্ম আলোকিত হবে মুক্তচিন্তার আলোয়।
‎
‎মুঠোফোনের পর্দায় যখন সময় কাটানোর অভ্যাস ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, তখন কুলাউড়ার এই শিক্ষক নিজের সীমিত সামর্থ্য নিয়ে বইয়ের জগতে মানুষকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর উদ্যোগ হয়তো একদিনে পুরো সমাজ বদলে দেবে না, কিন্তু একটি পাঠক, একটি পরিবার কিংবা একটি প্রজন্মের চিন্তাজগতে পরিবর্তনের বীজ বুনতে পারে। আর সেই ছোট ছোট পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে আলোকিত সমাজের ভিত্তি।