
মৌলভীবাজার তথা কুলাউড়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। কুলাউড়ার প্রথম নির্বাচিত সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট আইনজীবী, ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ব্যারিস্টার আব্দুল মুন্তাকিম চৌধুরী আর নেই।
গত ৯ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এবং সপরিবারে মেলবোর্নেই বসবাস করছিলেন।
ব্যারিস্টার আব্দুল মুন্তাকিম চৌধুরীর জন্ম মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পিতা তজম্মল আলী চৌধুরী। জন্মসূত্রে কুলাউড়ার সন্তান হলেও কর্ম ও প্রজ্ঞায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন জাতীয় ব্যক্তিত্ব।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন এ দেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনসহ তৎকালীন প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে পাকিস্তানের তৃতীয় জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন অন্যতম সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর তিনি গণপরিষদের সদস্য এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান খসড়া প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখেন। সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে তাঁর সময়োপযোগী যুক্তি ও চিন্তাধারা আজও রাজনৈতিক অঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে আছে।
তিনি ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন সিলেট-১৩ (বর্তমান কুলাউড়া) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কুলাউড়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম এমপি হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে তিনি অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে জাপান ও জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও পালন করেছেন। পাশাপাশি একজন ব্যারিস্টার হিসেবে আইন অঙ্গনেও তাঁর ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল পদচারণা।
ব্যারিস্টার আব্দুল মুন্তাকিম চৌধুরীর প্রয়াণে কুলাউড়াবাসী হারাল তাদের ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত অভিভাবককে। আর জাতি হারাল এক সংবিধান প্রণেতা, ভাষা সৈনিক ও সত্যিকারের দেশপ্রেমিক জননেতাকে। তাঁর মৃত্যুতে কুলাউড়া তথা পুরো মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সঞ্জয় দেবনাথ, কুলাউড়া থেকে। 

















