হৃদয় খান

আদর্শ জাতি গঠনের প্রকৃত কারিগর একজন শিক্ষক। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা দেন না, তিনি মানুষকে মানুষ হতে শেখান। উনাদের মাধ্যমেই আমরা নিজের জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পাই, স্বপ্ন দেখতে শিখি।
আমাদের জীবনে মা-বাবার পরেই উনাদের স্থান। সন্তান জন্মদানে পিতা-মাতার ভূমিকার পাশাপাশি একজন সন্তানের মানসিক বিকাশে, চরিত্র গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তাঁরা। একজন মা যেমন সন্তানকে হাঁটতে শেখান, একজন শিক্ষক তেমনি সেই সন্তানকে জীবনের কঠিন পথে চলতে শেখান।
শিক্ষকদের কোন জাত হয় না। উনারা সকল ধর্ম, বর্ণের ঊর্ধ্বে। তাঁদের কাছে সব ছাত্রই সমান, সবাই নিজের সন্তানের মতো। ক্লাসের সবচেয়ে খারাপ ছাত্রটাকেও তাঁরা কখনো ফেলে দেন না, বরং আরও বেশি যত্ন নিয়ে তাকে ভালো করার চেষ্টা করেন। তাঁদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আজকের এই স্বার্থপর যুগে সত্যিই বিরল।
আজ হয়তো আমি অনেক বড় হয়েছি, অনেক দূরে চলে গেছি, কিন্তু ব্ল্যাকবোর্ডে সাদা চক দিয়ে লেখা সেই অক্ষর গুলো, শাসনের পেছনে লুকিয়ে থাকা সেই স্নেহ, পরীক্ষার আগে বলা “ভালো করে পড়ো” এই কথাগুলো আজও মনে পড়ে।
২০১৬ সালে বানিয়াচং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের আঙিনা থেকে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে তখন আমি এক নতুন পথের যাত্রী। স্বপ্ন ছিল হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বৃন্দাবন সরকারি কলেজে ভর্তি হবো। কিন্তু আব্বার ইচ্ছার কাছে হার মেনে নিলাম। ভর্তি হলাম আমাদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান, সদ্য প্রতিষ্ঠিত বানিয়াচং আইডিয়াল কলেজে-৫ম ব্যাচের মানবিকের প্রথম সারির একজন ছাত্র হিসেবে।
সেই প্রদীপের আলোতেই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার জীবনের সেরা মানুষগুলোকে। যাঁদের অনুপ্রেরণায় জীবনের আসল মানে খুঁজে পেয়েছিলাম।
আজ বুঝি, আব্বার সেই সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল না, বরং সেটাই ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।
ভর্তির প্রথম দিনেই দেখা হয়েছিলো ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রভাষক শ্রদ্ধেয় আমিরুল ইসলাম স্যারের সাথে। উনার মুখের এক চিলতে হাসি আর আন্তরিক সাধুবাদে মুহূর্তেই তিনি আমার মন জয় করে নিয়েছিলেন।
তখন কলেজের আকাশে বাতাসে শুধু একটি নাম- “বাংলা ম্যাডাম”। কে এই বাংলা ম্যাডাম? দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। উদ্বোধনী ক্লাসে তিনি এলেন। উনার কণ্ঠে ছিল না শুধু বক্তব্য, ছিল যেন শিষ্যকে আলোর পথ দেখানোর এক অমোঘ মন্ত্র। উনার সুরের মাধুর্যে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম।
আমি দেখেছি, অনেক শিক্ষক প্রথম বেঞ্চের কয়েকজনকে নিয়েই তাঁদের দায়িত্ব শেষ করেন।
কিন্তু আমার বাংলা ম্যাডাম ছিলেন ব্যতিক্রম। উনার চোখে সবাই সমান। তিনি কখনো রেজাল্ট দিয়ে মানুষ মাপেননি। তিনি মেপেছেন বিনয় দিয়ে, সত্যবাদিতা দিয়ে, ন্যায়বোধ দিয়ে। তিনি শিখিয়েছেন, ভালো রেজাল্টের চেয়ে ভালো মানুষ হওয়াটা অনেক বেশি জরুরি। এই প্রদীপের আলোয় আমি পেয়েছি এক ঝাঁক নক্ষত্রের মতো শিক্ষক। অর্থনীতির জটিল অঙ্ককে যিনি গল্পের মতো সহজ করে দিতেন, তিনি আমাদের শ্রদ্ধেয় রনজিৎ কুমার দাস স্যার।
ইংরেজির জসিম উদ্দিন স্যার ছিলেন আমার সাহসের বাতিঘর। তিনি শুধু Grammar শেখাননি, শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, কীভাবে ভালো ব্যবহার দিয়ে পৃথিবী জয় করতে হয়।
তিনি ছাত্রদের সঙ্গে সর্বদা বন্ধু সুলভ আচরনের মধ্যে দিয়ে শিখিয়েছিলেন বেঁচে থাকার আসল মানে। স্যারের কাছে সর্বদা একটাই কথা ছিলো যা এখনো আমার কানে বাজে। স্যার বলতেন কখনোই কেউ কোন কাজে অবহেলা করবা না। সকল পেশার মানুষকে সম্মান করবা।
পূর্ণিমা ভট্টাচার্য ম্যাডাম ছিলেন বন্ধুর মতো। উনার ক্লাস মানেই ছিল একরাশ মুগ্ধতা।
আর মিতালী রানী হুড় ম্যাডাম উনার শাসনের মাঝেও ছিল মায়ের মতো মমতা। সমাজবিজ্ঞানের কঠিন তত্ত্বগুলো তিনি জলের মতো সহজ করে দিতেন।
উনারা কী পান এই নিঃস্বার্থ পরিশ্রমে? কিছুই না। শুধু আমাদের সফলতাই উনাদের প্রাপ্তি। আজ যখন আমি নিজে ছাত্র পড়াই, তখন বুঝি নিজের সন্তানের সাফল্যে একজন বাবা যতটা খুশি হন, তার চেয়েও বেশি খুশি হন একজন শিক্ষক, তাঁর ছাত্রের সাফল্যে।
এই ঋণ কীভাবে শোধ করবো? এই ঋণ তো টাকায় মেটে না, উপহারে শোধ হয় না।
এই ঋণ বেঁচে থাকে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, চোখের জলে। হে আমার শিক্ষাগুরুরা, আপনাদের এই ঋণ যে… এক জনমে শোধ হবার নয়।আপনারা বেঁচে থাকুন আমার হৃদয়ের মণিকোঠায়, যুগ যুগ ধরে।
৫ম ব্যাচ,বানিয়াচং আইডিয়েল কলেজ।
স্মৃতি 













